অনুশীলন সমিতির ইতিহাস

অনুশীলন সমিতির ইতিহাস

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

চরিত্রের অনুশীলন , দেশ ভক্তির অনুশীলন এবং বৈদিক আদর্শের অনুশীলন

অনুশীলন সমিতির ইতিহাস ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০২ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন মূলত একটি যুব ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, কিন্তু দ্রুতই এটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এটি ছিল বাংলা কেন্দ্রিক এবং বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্রিক। সমস্ত রাজনৈতিক ধারণা ছিল নেটিভ বাংলা, যা বাঙালি হিন্দু উৎস থেকে উদ্ভূত, যার মধ্যে চৈতন্যের বিপ্লবী প্রেম-ভক্তি থেকে আনন্দমঠের কেন্দু ঠাকুরের চারিত্রিক মহাপৌরোহিত্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নুশীলন সমিতি পরিবর্তনশীল ইতিহাস ও সমাজের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের নতুন পথে পরিচালিত করতে দ্বিধা করেনি। পুরোনো, অচল ও অপ্রাসঙ্গিক ধারণা, নেতৃত্ব ও কৌশলকে তারা সাহসের সঙ্গে পরিত্যাগ করেছে এবং সময়ের দাবিতে নতুন আদর্শ গ্রহণ করেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের বিপ্লবী আন্দোলন, বিশেষ করে নুশীলন সমিতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রবল পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। একদিকে গান্ধীর নেতৃত্বে মহাত্মক গণআন্দোলনের ঢেউ, অন্যদিকে রাশিয়ান বিপ্লবের অভিঘাত এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের উদ্ভব—দুটি ধাক্কাই নুশীলনের ভাবনায় গভীর ছাপ ফেলে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নুশীলন কখনো কমিন্টার্নে যোগ দেয়নি, ১৯২২ সাল থেকেই তাদের যোগাযোগ শুরু হয়। এসময়ে বহু ভারতীয় বিপ্লবী ইউরোপে অবস্থান করছিলেন এবং রাশিয়ার আমন্ত্রণে মস্কো গিয়ে কমিন্টার্নের নেতাদের সঙ্গে যোগ দেন।

এম.এন. রায়অবনী মুখার্জি, যাঁরা পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের মূল উদ্যোক্তা, তাঁদের প্রারম্ভিক রাজনৈতিক জীবনে ছিলেন নুশীলনের সদস্য। এঁরা চেয়েছিলেন ভারতের বিপ্লবীদের আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে। অবনী মুখার্জিনলিনী দাসগুপ্ত ঢাকার নুশীলন সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন, যদিও তাঁদের উদ্দেশ্য আলাদা ছিল। নুশীলন নেতারা তখনও মার্কসবাদে বিশ্বাসী হননি, কালী পূজা করতেন এবং নিয়মিত ভগবদগীতা পাঠ করতেন, বঙ্কিমের আনন্দমঠ ছিল তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা, তাঁদের লক্ষ্য ছিল সোভিয়েতের কাছ থেকে অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ করে আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।

নুশীলনের সদস্য গোপেন চক্রবর্তী ১৯২৩ সালে রাশিয়ায় যান। এদিকে নুশীলনের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোহন সেন, স্পষ্টভাবে অনুভব করেছিলেন যে সংগঠনের কাজের ধরণকে নতুনভাবে সাজানো অত্যাবশ্যক। তাঁদের মতে বিপ্লবী সংগ্রামকে শুধু গোপন ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে—বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে সংগঠনকে যুক্ত করতে হবে।

এই নতুন দিশায় কিছু প্রাথমিক উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু তেমন সাফল্য পাওয়া গেল না, কারণ সরকার “বিপ্লবী অপরাধের পুনরুজ্জীবন”–এর অজুহাতে আবার কঠোর দমননীতি চালু করে। এই দমননীতির আওতায় একে একে বহু বিপ্লবী নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি সুভাষচন্দ্র বসুকেও ১৮১৮ সালের রেগুলেশন III অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয়, কারণ ব্রিটিশ পুলিশ বিশ্বাস করত যে কলকাতার পুলিশ কমিশনার স্যার চার্লস টেগার্টকে হত্যার ষড়যন্ত্রের পেছনে তিনি ছিলেন।

১৯২৩ সালে নুশীলন সমিতি উত্তর ভারতের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেন যোগেশ চট্টোপাধ্যায়কে। তিনি পরে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে নুশীলনের একটি শাখা সংগঠন হিসেবে নতুন এক দল গঠিত হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার ভোলাচং গ্রামে। সেই ঐতিহাসিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতুল গাঙ্গুলি, নরেন্দ্র মোহন সেন এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যাকে ময়মনসিংহ থেকে অমুল্য মুখার্জি গোপনে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানেই গঠিত হয় হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (Hindustan Republican Association বা HRA)।

১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকারী দমননীতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ১৯২৪ সালের বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট আইনের মাধ্যমে অসংখ্য নুশীলন ও যুগান্তর সদস্যকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘ কারাবাসে রাখা হয়। এই দমননীতির ফলে তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে প্রবল অস্থিরতা দেখা দেয়—তাঁরা “তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ” বা ‘ইমিডিয়েট অ্যাকশন’-এর জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এসময় চট্টগ্রামের সূর্য সেনের (১৮৯৪ – ১৯৩৪) দল, হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (পরে হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন) ইত্যাদি সংগঠনের সঙ্গে নুশীলনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির কাহিনী তাঁদের প্রভাবিত করেছিল।

কিন্তু ক্রমাগত গ্রেপ্তার, ষড়যন্ত্র মামলা ও পুলিশি দমননীতির ফলে বিপ্লবী কার্যক্রম প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষত চট্টগ্রাম অভ্যুত্থানের (১৯৩০) পরে অধিকাংশ নুশীলন নেতা ১৯৩৮ পর্যন্ত জেলবন্দি ছিলেন। এই দীর্ঘ কারাবাসের মধ্যেই বিপ্লবীরা উপলব্ধি করেন যে ব্যক্তিগত সন্ত্রাস ও সীমিত সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে স্বাধীনতা সম্ভব নয়। অনুশীলন সমিতির সাথে সংযোগের জন্য অরবিন্দ ঘোষকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, মুক্তি পাওয়ার পর তিনি হিন্দু আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেন এবং পান্ডিচেরিতে বসবাস শুরু করেন।

এখানে এক বিশেষ দিক উল্লেখযোগ্য—ব্রিটিশ কারাগার প্রশাসন নুশীলন বিপ্লবীদের ওপর ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। “ব্রেইনওয়াশিং” বা মানসিক ভাঙন ঘটানো ছিল ব্রিটিশদের মূল কৌশল। নুশীলনের অনেক সদস্য প্রথম দিকে ধর্মীয় আবেগ, বিশেষত কালীপূজা ও আধ্যাত্মিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। কারাগারে তাঁদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে ব্রিটিশরা চেষ্টা করেছিল এই ধর্মীয় উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে নাস্তিক মার্কসবাদে ঠেলে দিতে। বন্দিদের বলা হতো যে তাঁদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে—একটি হলো রামকৃষ্ণ মিশনে যোগ দিয়ে ধর্মীয় সমন্বয় জীবনে প্রবেশ করা, আর অন্যটি হলো কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র” গ্রহণ করা। এই দুই বিকল্পই ছিল ব্রিটিশ কারাগার প্রশাসনের কৌশল, যাতে বিপ্লবী চাপ ভিন্ন দিকে সরিয়ে দেওয়া যায়। বহু নুশীলন কর্মী অমানবিক কারা-অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ধর্মচর্চা থেকে সরে গিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেন।

১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যে নুশীলনের এক বড় অংশ মার্কসবাদী হয়ে ওঠেন। তাঁরা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের নীতি, বিশেষ করে সপ্তম বিশ্ব কংগ্রেসের লাইন ও ডাট-ব্রাডলি থিসিসকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের মতে, কমিন্টার্ন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের চরিত্র হারিয়েছে এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আবার, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীন বিশ্লেষণের বদলে কমিন্টার্নের নির্দেশ অন্ধভাবে অনুসরণ করছে। নুশীলন মার্কসবাদীরা মনে করতেন, কংগ্রেসের ভেতরের জনগণকে কাজে লাগিয়েই আসল অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট ফ্রন্ট গঠন সম্ভব, তবে এজন্য দরকার নেতৃত্বকে পরিবর্তন করে গণমানুষের হাতে আনা।

কারাগারে বসেই ১৯৩৬ সালে তাঁরা একটি খসড়া নথি প্রণয়ন করেন, যেখানে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, অবিলম্বে কর্মসূচি ও জাতীয় সংগ্রামে অংশগ্রহণের নীতি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এসময়ে তাঁদের অনেকেই কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি (CSP)-তে যোগ দেন, যা ১৯৩৪ সালে গঠিত হয়েছিল। যদিও সব নুশীলন সদস্য মার্কসবাদী হননি, অনেকেই পুরোনো সহযোদ্ধাদের প্রতি আনুগত্যবশত এই সংযুক্তিকে মেনে নেন।

তবে শিগগিরই মতভেদ প্রকাশ পায়। ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশনে যখন সিপিএসপি গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী নিরপেক্ষ থাকে, নুশীলন সদস্যরা সুভাষচন্দ্র বসুর পাশে দাঁড়ান। বসুর অবিলম্বে স্বাধীনতার দাবির প্রতি তাঁরা সমর্থন জানান। বসুর স্লোগান—“সকল ক্ষমতা জনগণের হাতে”—নুশীলন মার্কসবাদীদের কাছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতিফলন মনে হয়েছিল। কিন্তু সিপিএসপির ভেতরে গান্ধীবাদী প্রভাব মেনে নেওয়া তাঁদের কাছে অসম্ভব হয়ে ওঠে। তাই তাঁরা সিপিএসপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

অবশেষে জোগেশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৯৫ – ১৯৬০) ও তাঁর সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন যে নিজেদের স্বতন্ত্র সংগঠন গঠন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এ নতুন সংগঠন গড়ে উঠবে কার্ল মার্কস ও লেনিনের দর্শনের ভিত্তিতে। এভাবেই নুশীলন সমিতির দীর্ঘ যাত্রাপথ—একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে শুরু করে সশস্ত্র বিপ্লব, তারপর কারাবন্দি অবস্থায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের গ্রহণ এবং অবশেষে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত হওয়া—ভারতের ইতিহাসে এক অসাধারণ রাজনৈতিক রূপান্তরের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।


প্রসঙ্গসূত্র —

  • কালীচরণ ঘোষের জাগরণ ও বিস্ফোরণ (২য় খণ্ড, কলকাতা, ১৩৮০ বঙ্গাব্দ),
  • ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত-রায়ের ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব,
  • ব্রজেন্দ্রচন্দ্র দে’র আনুশীলন সমিতির বিপ্লব প্রচেষ্টা,
  • যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ইন সার্চ অফ ফ্রিডম,
  • মনমথনাথ গুপ্তের হিস্ট্রি অফ দ্য ইন্ডিয়ান রেভলিউশনারি মুভমেন্ট,
  • জে. এন. বাজপেয়ীর দি এক্সট্রিমিস্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া,

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল