বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
কমলাক্ষ ভট্টাচার্য (১৪৩৪–১৫৫৮), যিনি অদ্বৈতাচার্য (ভরদ্বাজ গোত্র) নামে পরিচিত ছিলেন, ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের লৌর অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তাঁর পিতা কুবের পণ্ডিত (তর্কপঞ্চানন) ছিলেন লৌরের (লাউর) রাজার মন্ত্রী। আশ্চর্যের বিষয়, যাঁর অধীনে তিনি রাজসেবা করতেন, সেই রাজাই একসময় অদ্বৈতর ভক্ত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃষ্ণদাস নামে পরিচিত হন। পরে তিনি অদ্বৈতর জীবনী রচনাও করেন।
শ্রীহট্টে লাউর দেশে নবগ্রাম হয়।
যথি দিব্যসিংহ রাজা বসতি করয় ॥
তাঁর সভাপণ্ডিত ভরদ্বাজ মুনি বংশ্য।
কুবের আচার্য্য নাম সদ্গুণে প্রশংস্থ্য ॥
অগ্নিহোত্রী যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ শুদ্ধমতি।
নরসিংহ নাড়িয়াল বংশেতে উৎপত্তি ॥
………….
বিদ্যাধরের পুত্র ছকড়ি পণ্ডিত মতিমান্।
তাঁর পুত্র কুবের, আর নীলাম্বর আচার্য্য।
কুবের পুত্র কমলাক্ষ অদ্বৈত আচার্য্য ॥
কমলাক্ষ অদ্বৈত প্রভুর ছয় পুত্র হন।
অচ্যুতানন্দ, কৃষ্ণদাস, গোপাল, বলরাম।
স্বরূপ, জগদীশ, এই ছয় জন।
সর্ব্ব শাস্ত্রে সুপণ্ডিত বড় গুণবান্ ॥ (প্রেম-বিলাস)
দ্বাদশ বর্ষ বয়ঃক্রমে অদ্বৈত লৌর ত্যাগ করে শান্তিপুরে এসে বসবাস শুরু করেন, যেখানে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা ক্রমে সমগ্র বাংলার বৈষ্ণবসমাজকে আলোড়িত করে।
তবে কুবের তর্কপঞ্চানন জ্ঞানবান।
শুভদিনে পুত্রে কৈলা যজ্ঞসূত্র দান।।
পৌগণ্ড বয়সে হৈল দ্বি জাতি সংস্কার।
প্রভুর শ্রীমূৰ্ত্তি হৈল অতি চমৎকার।।
শ্রীঅদ্বৈত পড়ে তবে সাহিত্যাভিধান।
অলঙ্কার জ্যোতিষাদি কৈল সমাধান।। (ইশান নগর )
দ্বাদশ বর্ষ বয়ঃক্রমে শান্তিপুরে গেলা।
ষড়দর্শন শাস্ত্র ক্রমে পড়িতে লাগিলা।।
কুবের কহে বাছা কিবা করিলা পঠন।
প্রভু কহে ষড়দর্শন সমাপ্তোপক্ৰম।।
কুবের কহে পড় এবে বেদ চারিখান।
অবশ্য পাইবা তাহে ব্ৰহ্মানুসন্ধান।।
প্রভু কহে পড়িতে যাইব পূর্ণবাটী।
বেদান্ত বাগীশ শান্ত দ্বিজবরের বাটী।। (ইশান নগর)
ইশান নগর ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে অদ্বৈতর জীবনী অদ্বৈত প্রকাশ রচনা করেন। তবে এই গ্রন্থকে ঘিরে প্রামাণ্যতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে চৈতন্যদেবের জন্মের আগে (১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রি), অদ্বৈতর পরামর্শে, বসুদেব সর্বভৌম তাঁর বৃদ্ধ পিতা মহেশ্বর বিষারদ ও ভাই বাচস্পতিকে নিয়ে গৌড়ের মুসলিম সন্ত্রাস থেকে পালিয়ে নদীয়া (বিদ্যানগর, নবদ্বীপ) ছেড়ে পুরীতে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। রাজা প্রতাপরুদ্র (১৪৯৭ থেকে ১৫৪০) পরে বসুদেবকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদান করেন। সর্বভৌম ভট্টাচার্য ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে অদ্বৈতর প্রতি ভক্তি নিবেদন করে রচনা করেছিলেন অদ্বৈত মঞ্জরী। তখন ওড়িশার সিংহাসনে রাজা প্রতাপরুদ্র। অদ্বৈত মঞ্জরীর শ্লোকগুলোতে তিনি শান্তিপুরনাথ সীতানাথ অদ্বৈতাচার্যের চরণে ভক্তি নিবেদন করেন এবং তাঁকে চৈতন্যের সঙ্গী, প্রেমভক্তির দাতা ও কর্মযোগের বন্ধন থেকে মুক্তিদাতা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শ্লোকের মূল পাঠ হলো—
श्री अद्वैतप्रार्थनार्थ जगन्नाथालयं
शचीमातुर्गर्भजात चैतन्यकरुणामयम् ।
श्री अद्वैतसङ्गरङ्गकीर्तनविलासनं
सीतानाथाद्वैतचरणारविन्दभावनम् ॥
दीनहीननिन्दकादि प्रेमभक्तिदायकं
सर्वदातः सीतानाथ शान्तिपुरनायकम् ।
रागरङ्गसङ्गदोषकर्मयोगमोक्षणं
सीतानाथाद्वैतचरणारविन्दभावनम् ॥
এর ভাবার্থ বাংলায় করলে দাঁড়ায়—
শ্রীঅদ্বৈত প্রার্থনার্থে যিনি জগন্নাথালয়ে অবস্থান করেন, শচীমাতার গর্ভজাত করুণাময় চৈতন্যপ্রভুর সহচর হয়ে কীর্তনের আস্বাদন করেন—তাঁরই সীতানাথ অদ্বৈতচরণকমল ভজনীয়। যিনি দীন-হীন-নিন্দিত সকলকে প্রেমভক্তি প্রদান করেন, সর্বপ্রদাতা, শান্তিপুরের নায়ক সীতানাথ অদ্বৈতচরণ; যিনি রাগ, আসক্তি, দোষ ও কর্মযোগের বন্ধন মোচন করেন—তাঁরই পাদপদ্মে ধ্যান নিবদ্ধ হোক।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) প্রশাসনে দুইজন খ্যাতিমান হিন্দু কর্মকর্তা—দবিরে খাস নামে পরিচিত ব্যক্তিগত সচিব রূপ গোস্বামী এবং সগির মালিক নামে পরিচিত ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী সনাতন গোস্বামী ছিলেন। এঁরা দুজনেই পরবর্তীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বৈষ্ণব ভক্তির ধারায় নিজেদের সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেন। এই কারণে হুসেন শাহী বংশ (১৪৯৪–১৫৩৮) রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে যায় এবং আফগান শের সাহা সুরির কাছে পরাজিত হয় । বাংলার বাইরের জগৎও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল এই সময়ে।
১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা সমুদ্রপথে প্রথম ভারতে এসে পৌঁছান, যার ফলে ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য সম্পর্কের সূচনা ঘটে। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষভাগে একটি পর্তুগিজ প্রতিনিধি দল বাংলায় আগমন করে সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা চালায়। হোসেন শাহের শাসনকাল শান্ত ছিল না। পুরো সময়জুড়েই বাংলা ও উড়িষ্যার মধ্যে সীমান্ত নিয়ে সংঘর্ষ লেগে ছিল, এবং যে কোনো ছুতোতে মুসলিমরা হিন্দুদের উপর অত্যাচার চলতো। তবে ধীরে ধীরে এই অত্যাচার শ্রীচৈতন্য ও অদ্বৈত শিষ্যদের গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনে ক্রমশ অস্তমিত হয়ে পারে, সহস্র সহস্র সুন্নি মুসলিম গৌড়িয়া বৈষ্ণব ধৰ্ম গ্রহণ করেন।
নিত্যানন্দ প্রভুর জীবনযাত্রা নিয়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজে একসময় প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অদ্বৈতাচার্য এক চিঠিতে (১৫৩১) শ্রীক্ষেত্রে চৈতন্যদেবকে সরাসরি লিখে জানান যে, কেউই আর মহাপ্রভুর প্রেমভক্তি গ্রহণে প্রস্তুত নয়:
তরজা প্রহেলী প্রভু কহিলা ইঙ্গিতে।
গৌর বিনু অন্যে তাহা না পারে বুঝিতে।।
প্রভু কহে শ্রীগৌরাঙ্গ মোর প্রাণধন।
তার রাঙ্গা শ্রীচরণে এই নিবেদন।।
বাউলকে কহিও লোক হইল আউল।
বাউলকে কহিও হাটে না বিকায় চাউল।।
বাউলকে কহিও কাজে নাহিক আউল।
বাউলকে কহিও ইহা কহিছে বাউল।।
শুনি শ্রীজগদানন্দ ঈষৎ হাসিয়া।
নীলাচলে যাত্রা কৈলা প্রভু সম্ভাষিয়া।।
“তরজা শুনিয়া হাসি কহে শ্রীচৈতন্য। তাঁর যেই অনুমতি সেই মোর মান্য।। এত কহি শ্রীগৌরাঙ্গ স্তম্ভিত হইলা। স্বরূপাদি ভক্তগণ তাহানে পুছিলা।।”
চৈতন্যদেব অদ্বৈত আচার্যের পরামর্শে নিত্যানন্দকে প্রত্যাখ্যান করেন (১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে) এবং তাকে জগন্নাথ পুরীতে না আসার নির্দেশ দেন।
চৈতন্য ভাগবতে অদ্বৈতাচার্য নিত্যানন্দ সম্পর্কে একখানি উক্তি করেছেন, যা বৈষ্ণব সমাজে অনেক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মধ্যখণ্ড, অধ্যায় ২৪-এ অদ্বৈতের বক্তব্য এভাবে লিপিবদ্ধ আছে:
“মৎস্য খায়, মাংশ খায়, কেমতে সন্ন্যাসী।
তারে বলি সন্ন্যাসী, যাহা কিছু নাহি ছায়।
বলায় সন্ন্যাসী, দিনে তিনবার খায়॥”
অর্থাৎ, “যে মাছ খায়, মাংস খায়, তাকে কেমন করে সন্ন্যাসী বলা যায়? অথচ সমাজ তাকে সন্ন্যাসী বলেই স্বীকার করে, এবং শোনা যায় সে দিনে তিনবার আহারও করে।”
এই উক্তির প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়, অদ্বৈত নিত্যানন্দ প্রভুর আচার-আচরণ নিয়ে একধরনের শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছিলেন।
অদ্বৈতাচার্য দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন। তিনি ১২৪/১২৫ বছর বয়সে শান্তিপুরের বাবলা মন্দিরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তার নির্দেশ ছিল:
প্রভু কহে তোরা সভে মোর প্রিয়তম।
মোর এক বাক্য সত্য করিহ পালন।।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গুণ আর ধৰ্ম্ম।
যথাসাধ্য প্রচারিবা এই মোর মর্ম্ম।।
শ্রীগৌরাঙ্গ-দ্বেষী যত পাষণ্ডী অসভ্য।
তা সভার সঙ্গ ত্যাগ অবশ্য কৰ্ত্তব্য।। (অদ্বৈতপ্রকাশ)
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মের সময় অদ্বৈতাচার্যর বয়স ছিল বাহান্ন। চৈতন্যের পিতা-মাতা হরিনাম মন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন তাঁর কাছ থেকেই। চৈতন্যের জ্যেষ্ঠভ্রাতা বিশ্বরূপ মিশ্র ভগবদ্গীতা অধ্যয়ন করতেন অদ্বৈতের নিকট, যদিও তিনি তাঁর নিয়মিত শিষ্য ছিলেন না। তখন শান্তিপুর থেকে নবদ্বীপ (পোড়ামাতলা), কুলিয়া এবং ভালুকা হয়ে হেঁটে যাওয়ার দূরত্ব ছিল ৫ ঘন্টা।
দিন কত পরে শচীর হৈল গর্ভাধান।
তাহে প্রকটিল বিশ্বরূপ গুণ ধাম।।
মহাসঙ্কর্ষণ বলি প্রভু যাঁরে কয়।
তাহান মহিমা চতুর্মুখ না জানয়।।
আজন্ম বৈরাগ্য তান লোকে চমৎকার।
আচার্য্যের সঙ্গে কৈলা ধর্ম্মের প্রচার।।
হরিদাস ঠাকুর—যিনি পূর্বে হাসম আলি নামে এক শিয়া মুসলমান ছিলেন—অদ্বৈতের হাতেই সনাতন ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি ভগবদ্গীতা অধ্যয়ন করতেন অদ্বৈতাচার্যের কাছ থেকে। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে বিশ্বরূপ মিশ্রের এক আন্তরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ব্রহ্ম হরিদাস কহে মুঞি ম্লেচ্ছাধম।
আসিআছো তুয়া পদ করিতে দর্শন।।
প্রভু করে ইহা রহি করহ বিশ্রাম।
ধৰ্ম্ম শাস্ত্র পড় সিদ্ধ হৈব মনস্কাম।।
হরিদাস কহে ভাগ্যে দয়াসিন্ধু পাইনু।
ইহার হিল্লোলে মন প্রাণ জুড়াইমু।।
তবে হরিদাস প্রভু অদ্বৈতের স্থানে।
ব্যাকরণ সাহিত্যাদি পড়িলা যতনে।।
এত কহি তার মস্তকাদি মুণ্ডাইয়া।
তিলক তুলসী মালা দিল পরাইয়া।।
কটিতে কৌপীন ডোর দিলেন বান্ধিয়া।
নাম দিলা প্রভু শক্তি সঞ্চারিয়া।।
গঙ্গার গহ্বরে পাঞা নাম চিন্তামণি।
প্রেমেতে মাতিলা শ্রীবৈষ্ণব চূড়ামণি।।
সংজ্ঞা পাঞা অষ্টঅঙ্গে দন্ডবৎ কৈলা।
কৃষ্ণ প্রাপ্তিরস্তু বলি প্রভু বর দিলা।।
প্রভু কহে তোর নাম ব্রহ্মহরিদাস।
হরিদাস কহে মুঞি হঙ তব দাস।।
তবে তিহোঁ দৈন্য বেশ করিয়া ধারণ।
তিন লক্ষ নাম জপের করিলা নিয়ম।
নাম সমাপিয়া করে ধর্ম্মের প্রচার।
অলৌকিক কার্য্য তাঁর লোকে চমৎকার।।
ইশান নাগরের অদ্বৈত প্রকাশ–এ আলাউদ্দিন হোসেন শাহের (১৪৯৩–১৫১৯) আমলে সমকালীন হিন্দু সমাজের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। সেখানে এক তীব্র আর্তি ধ্বনিত হয়েছে:
“দুষ্ট ম্লেচ্ছরা প্রতিদিন হিন্দুধর্ম কলুষিত করছে। দেবতাদের প্রতিমা ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিচ্ছে, পূজার সামগ্রী নষ্ট করছে। ভগবতপুরাণ ও অন্যান্য পবিত্র ধর্মগ্রন্থে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তারা ব্রাহ্মণদের শঙ্খ ও ঘণ্টা ছিনিয়ে নিচ্ছে, এমনকি তাঁদের দেহে থাকা চন্দনের প্রলেপও চেটে নিচ্ছে। তারা পবিত্র তুলসী গাছে কুকুরের মতো প্রস্রাব করছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মল ত্যাগ করছে মন্দিরের ভেতরে। হিন্দুরা যখন পূজায় নিযুক্ত থাকেন, তখন তারা মুখ থেকে জল ছিটিয়ে অপমান করছে, আর সাধুজনদের উন্মাদ বলে উপহাস করছে।”
কমলাক্ষ ভট্টাচার্য ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বা শ্রীহট্টের এক বৈদিক ব্রাহ্মণ। পিতার সঙ্গে তিনি শান্তিপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন বাবলা গ্রামে, যেখানে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত একটি চতুষ্পাঠী ছিল। পিতার মৃত্যুর পর কমলাক্ষ নিজেই সেই চতুষ্পাঠীর আচার্য হন। চতুষ্পাঠীতে মূলত পড়ানো হতো বেদ, শংকর বেদান্ত, ব্যাকরণ ও স্মৃতি, যেগুলি উপাধি অর্জনের জন্য আবশ্যক ছিল। এর সঙ্গে পুরাণ ও জ্যোতিষ বিদ্যাও পড়ানো হতো অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে।
গয়ার পিতৃপিন্ডদান যাত্রায় কমলাক্ষের সাক্ষাৎ হয় মাধবেন্দ্রপুরীর (১৪২০-১৪৯০ খ্রি.) সঙ্গে—মাধবেন্দ্র (বাঙলি) ছিলেন মধ্যাচার্য সম্প্রদায়ের এক দণ্ডী স্বামী। মাধবেন্দ্রপুরীর ভক্তিমূলক শিক্ষার প্রভাবে কমলাক্ষের দৃষ্টি ফেরে ভগবান কৃষ্ণের দিকে। যদিও পূর্বপুরুষগতভাবে তাঁর পরিবার বৈদিক বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন—যা প্রায় সকল সিলেটি ব্রাহ্মণের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। মাধবেন্দ্রপুরীর প্রভাবে তিনি কৃষ্ণভক্তির এক নতুন রূপের সঙ্গে পরিচিত হন। মাধবেন্দ্র পরিষ্কার গদ্য বাংলায় শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করতেন:
শ্রীমদ্ভাগবত মাধ্বাচার্য্য-ভাষ্য আর।
প্রভুকে শুনায় পুরী করিয়া বিস্তার।।
শুনিমাত্র প্রভু সব কণ্ঠস্থ করিলা।
তাহা দেখি সাধুগণ বিস্ময় মানিলা।।
একদিন প্রভু কহে পুরীরাজ স্থানে।
কলিকাল শক্ত্যে জীব ধৰ্ম্ম নাহি মানে।
যাঁহা যাঁহা যাঙ তাঁহা দেখোঁ ম্লেচ্ছাচার।
হরেকৃষ্ণ নাম নাহি শুন একবার।।
কৈছে জীবোদ্ধার হৈব নাপাঙ সন্ধান।
সদুপায় কহি জীবের করহ কল্যাণ।।
পুরী করে কমলাক্ষ তুমি দয়ানিধি।
জগতের হিত লাগি ভাব নিরবধি।।
হেন বুদ্ধি সাধারণ জীবে না হয় স্ফুর্ত্তি।
তাহে প্রকটিত হয় যাহে ঐশী শক্তি।।
এবে সাক্ষাৎ পরব্রহ্মের আবির্ভাব বিনে।
অন্যদ্বারে জীবোদ্ধার নাহিক সুগমে।।
ধর্ম সংস্থাপন হৈতু এই কলিযুগে।
স্বয়ং ভগবান প্রকট হইবেন অগ্রে।।
অনন্ত সংহিতা তার সাক্ষী শ্রেষ্ঠতম।
মধ্যস্থ শ্রীভাগবত ভারত আগম।।
প্রভু কহে অনন্তসংহিতা কাঁহা রয়।
তাহা দেখিবারে মোর গাঢ় ইচ্ছা হয়।।
শুনি পুরী অনন্তসংহিতা দেখাইলা।
তাহা পড়ি প্রভু মহা আনন্দিত হৈলা।।
প্রভু কহে নন্দসুত ষড়ৈশ্বর্য পূর্ণ।
গৌররূপে নবদ্বীপে হৈব অবতীর্ণ।।
হরিনাম প্রেম দিয়া জগত তারিবে।
মো অধমের বাঞ্চা তবে অবশ্য পুরিবে।। (ইশান নগর )
মাধবেন্দ্রপুরীর কাছ থেকে কমলাক্ষ প্রথম ভগবতপুরাণের পরিচয় পান। মহাপন্ডিত ব্যাকরণবিদ বোপদেব (১৩শ শতাব্দী) শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেছিলেন। শংকরাচার্য বা রামানুজাচার্যের (১০১৭-১১৩৭ খ্রি.) গ্রন্থসমূহে ভগবতপুরাণের উল্লেখ পাওয়া যায় না, কারণ এটি রামানুজের মৃত্যুর পর রচিত। তবে এর কাব্যশৈলী ও কৃষ্ণভক্তি মাধ্যাচার্যকে (১২৩৮-১৩১৭ খ্রি) আকৃষ্ট করেছিল, এবং তিনি এই গ্রন্থকে জনপ্রিয় করে তোলেন। কমলাক্ষ ভট্টাচার্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও ভগবতপুরাণকে গ্রহণ করেন এবং কৃষ্ণের “সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ” ভাবকে মান্য করেন। মাধবেন্দ্রপুরী তাঁকে আদর করে নতুন নাম দেন—“অদ্বৈত”।
অদ্বৈতই পরবর্তীতে সিলেট থেকে উত্কল, পুরী থেকে বৃন্দাবন পর্যন্ত এক বিস্তৃত ভক্তি-সংযোগের জাল বিস্তার করেন, যা চৈতন্য আন্দোলনের পক্ষে এক অনন্য ভিত্তি গড়ে দেয়।
ভাগ্যোদয়ে ম্লেচ্ছ যদি বিষ্ণু ভক্তি পায়-
ব্রাহ্মণত্ব লভে সেই বেদে ইহা গায়।
হেথা শ্রীঅদ্বৈতাচাৰ্য্য মনে বিচারিয়া।
নবদ্বীপে টোল কৈলা গৌরাঙ্গ লাগিয়া।।
সেই নদীয়ায় যত পন্ডিত সজ্জন।
প্রভুরে প্রধান বলি করিলা গমন।।
পন্ডিত শ্রীবাসঠাকুর নারদাবতার।
প্রভু সঙ্গে হৈল তান আনন্দ অপার।।
দিনে প্রভু ছাত্র পড়ায় গীতা ভাগবত।
কভু বেদ স্মৃতি পড়ায় ছাত্রের ইচ্ছামত।।
রাত্রে হরিদাস সঙ্গে করিয়া মিলন।
উচ্চস্বরে করে হরির নাম সংকীর্ত্তন।।
অদ্বৈতাচার্যের ব্যক্তিজীবনও তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার মতোই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি নৃসিংহ ভাদুরীর দুই কন্যাকে বিবাহ করেন। সম্ভবত সেই সময় তিনি নিজের নাম স্বাক্ষর করতেন কবিদ্যাধরের পুত্র ছকড়ি পণ্ডিত মতিমান্।
তাঁর পুত্র কুবের, আর নীলাম্বর আচার্য্য।
কুবের পুত্র কমলাক্ষ অদ্বৈত আচার্য্য ॥
কমলাক্ষ অদ্বৈত প্রভুর ছয় পুত্র হন।
অচ্যুতানন্দ, কৃষ্ণদাস, গোপাল, বলরাম।
স্বরূপ, জগদীশ, এই ছয় জন।
সর্ব্ব শাস্ত্রে সুপণ্ডিত বড় গুণবান্ ॥
প্রেম-বিলাস।
অদ্বৈতের বংশাবলী করিল বর্ণন।
মলাক্ষ মিশ্র হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীকালে “মিশ্র” পদবি বাদ দিয়ে “ভট্টাচার্য” নাম গ্রহণ করেন। তাঁর বিবাহে উপস্থিত ছিলেন নবান্নদ্বীপের শ্রীবাস পণ্ডিত, যা প্রমাণ করে যে অদ্বৈতের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সম্মান তখনই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
তাঁর দুই সহধর্মিণীর নাম ছিল শ্রীদেবী ও সীতাদেবী। এই দুই দেবীর গর্ভে অদ্বৈতাচার্যের ছয় পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। অদ্বৈতের নাতিরা পরবর্তীকালে শান্তিপুরে দুর্গাপূজার (দক্ষিণাচারী) সূচনা করেন, এবং বাংলায় প্রথমবারের মতো বিজয়া দশমী উদযাপন হয়। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র (১৭১০-১৭৮৩) অদ্বৈত পরিবারকে একটি পঞ্চচূড় রথ এবং আশি বিঘা ব্রহ্মোত্তর জমি দান করেন। আজও শান্তিপুরে শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের বংশধর বড় গোস্বামী বাড়িতে দুর্গোৎসব পালিত হয়।
অদ্বৈতের সমসাময়িক নিত্যানন্দ প্রভুও দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৫২২ খ্রিস্টাব্দে খারদহে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তিনি বামাচারী দুর্গাপূজা প্রবর্তন করেন এবং মানুষকে এই পূজা পালনের আহ্বান জানান। নিত্যানন্দের মৃত্যু ঘটে ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর পুত্র বিরচন্দ্র প্রভুর আন্তরিক অনুরোধ সত্ত্বেও অদ্বৈতাচার্য কিংবা নবদ্বীপের কোনো বৈষ্ণবই তাঁর শ্রাদ্ধক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেননি।

Read more
