বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ফ
রামকমল সেন তাঁর ১৮৩৪ সালের ইংরেজি–বাংলা অভিধানের ভূমিকায় উল্লেখ করেছিলেন যে ১৭৭৪ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইংরেজি ভাষাজ্ঞান বাঙালিদের কাছে একান্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সে সময় ইংরেজি শেখানোর গুরু ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের ইউরোপীয় অ্যাটর্নি ও অ্যাডভোকেটদের বাঙালি কেরানিরা। তাঁরা ইংরেজিতে নালিশনামা বা দরখাস্ত লিখতে পারতেন এবং অফিসের কাজ চালানোর মতো কিছু শব্দ যেমন yes, no, very well ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। নিজেদের নোটখাতায় শব্দ লিখে রেখে একধরনের ভাণ্ডার তৈরি করতেন। যার কাছে যত বেশি শব্দের ভাণ্ডার থাকত, তাকেই তত বড় ইংরেজি পণ্ডিত বলে গণ্য করা হতো। রামকমল সেন ভূমিকায় কয়েকজনের নামও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে যতদূর জানা যায়, রামরাম মিশ্র নামক এক ব্রাহ্মণই প্রথম ইংরেজি ভাষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিলেন। বহু বাঙালি বাবু তখন তাঁর ছাত্র ছিলেন। এরপর রামনারায়ণ মিশ্র, আনন্দীরাম দাস, রামলোচন নাপিত, কৃষ্ণমোহন বসু প্রমুখ এবং পরে ভবানী দত্ত, শিবু দত্ত ও আরও কয়েকজনকে তিনি complete English scholar বলে উল্লেখ করেন। তবে তাঁদের বিদ্যা সীমিত ছিল কেবল Spelling Book ও Word Book-এর মধ্যেই। তাঁরা নিজেরাই স্কুল খুলে বাঙালি ছাত্রদের ইংরেজি শেখাতেন এবং মাসে চার টাকা থেকে ষোলো টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন।
১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট অনুযায়ী ১৭৭৪ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে প্রতিষ্ঠিত হয় Supreme Court of Judicature at Fort William। এর ফলে কোম্পানির পূর্ববর্তী ছড়ানো-ছিটানো ও অগোছালো বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে প্রথমবারের মতো ভারতে পূর্ণাঙ্গ ইংরেজ ধাঁচের আদালত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এর প্রথম বিচারপতিরা ছিলেন স্যার এলিজাহ ইম্পে (প্রধান বিচারপতি ১৭৭৪–১৭৮৩), স্টিফেন সিজার লে মেস্ট্র (১৭৭৪–১৭৭৭), জন হাইড (১৭৭৪–১৭৯৬), রবার্ট চেম্বার্স (১৭৭৪–১৭৯৮, যিনি পরে প্রধান বিচারপতি হন), স্যার উইলিয়াম জোন্স (১৭৮৩–১৭৯৪) এবং স্যার উইলিয়াম ডানকিন (১৭৯১–১৮০২)। আদালত শুরু থেকেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, কারণ এটি ইউরোপীয় প্রজাদের পাশাপাশি ভারতীয় অধিবাসীদের ওপরও কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা করে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট ও কোম্পানির পরিষদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের (সদর দেওয়ানি আদালত ও নিযামত আদালত) মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
নন্দকুমার মামলা সুপ্রিম কোর্টের প্রথম দিকের কুখ্যাত দৃষ্টান্ত। নন্দকুমার গৌড়ীয় ভাষায় (গৌড়ীয় বাংলা) দক্ষ ছিলেন, ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজিও বলতে পারতেন এবং গৌড়ীয় পদ্ধতির হিসাবরক্ষণে পারদর্শী ছিলেন। বিচার চলাকালে তিনি এই যোগ্যতা ব্যবহার করলেও, প্রধান বিচারপতি ইম্পের ঈর্ষা ও পক্ষপাত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ১৭৭৭ সালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা পাটনা মামলা (Kamaluddin v. East India Company) শোনা হয়। সেখানে কোম্পানির আধিকারিকেরা মুসলমান ব্যবসায়ী কামালউদ্দিনকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করেছিলেন। কামালউদ্দিন সুপ্রিম কোর্টে নালিশ জানালে আদালত কোম্পানির আধিকারিকদের দোষী সাব্যস্ত করে এবং ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। এর মাধ্যমে আদালত ভারতীয় প্রজাদের ওপরও habeas corpus-এর নীতি প্রয়োগ করে, যা ছিল নজিরবিহীন। তবে এর ফলে কোম্পানির প্রশাসনের সঙ্গে আদালতের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয় এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭৮১ সালের বেঙ্গল জুডিকেচার অ্যাক্ট পাস করে আদালতের ক্ষমতা সীমিত করে দেয়।
এই আদালতের বিচারকরা ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র ও সমাজব্যবস্থাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে থাকেন। খ্রিস্টান নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা বলতে শুরু করেন যে হিন্দু সমাজের সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তথাকথিত সমাজসংস্কার আন্দোলনের ভিত্তি, যা কলকাতা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ষড়যন্ত্র হিসেবেও বিবেচিত হয়। আদালতের সমস্ত কার্যক্রম ইংরেজিতে পরিচালিত হতো। ১৭৮৩ সালে বিচারক হিসেবে আগমনকারী উইলিয়াম জোন্স ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণার নামে ভারতীয় ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটান। যদিও তিনি জীবনে কখনও গৌড়ীয় বাংলা বা সংস্কৃত ভাষা শিখতে পারেননি, তবুও তাঁর রচনা ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয় ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ওপর।
১৮৪৪ সালে Supreme Courts, Fort William Act XI of 1844 পাস করা হয়, যাতে বিচারব্যবস্থার গতি বাড়ানো ও প্রশাসন উন্নত করার জন্য আদালতের বিচারকদের আলাদা আলাদা বসে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আদালতের কার্যক্রম সেশনকালীন ও সেশনকালীন বহির্ভূত উভয় সময়েই বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। ১৮৬২ সালে Indian High Courts Act 1861 অনুযায়ী কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টই ছিল ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।
