বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
গুপ্তসম্রাট প্রথম জীবিতগুপ্তের (৫২৫-৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) শিলালিপিতে গৌড়ের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। শিলালিপির দলিল অনুযায়ী সম্রাট কুমারগুপ্ত প্রথমের (৪১৪–৪৫৫ খ্রি.) শাসনকালে উত্তরবঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগে পরিণত হয়, যার নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি—ভুক্তি মানে ছিল প্রদেশ। গুপ্তদের পতনের পর উত্তর ভারতে তিনটি স্বাধীন শক্তি আবির্ভূত হয়—স্থান্বীশ্বরের (আধুনিক হরিয়ানার থানেশ্বর) পুশ্যভূতি বা যাদের অনেক ঐতিহাসিক ‘বর্ধন’ রাজবংশ নামে জানেন, কোশল/কন্যাকুব্জের (আধুনিক উত্তরপ্রদেশ) মৌখারি, এবং মগধ-মালবায় (আধুনিক বিহার ও মধ্যপ্রদেশ) উত্তর গুপ্তরা। এদিকে বঙ্গভূমি, অর্থাৎ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকেই বঙ্গ-ভুক্তি নামে ঐক্যবদ্ধ ছিল। পশ্চিমাংশে এই ভূখণ্ডকে বলা হতো গৌড়, আর পূর্বাংশকে বঙ্গ। রাঢ় অঞ্চল ছিল গৌড়ের অঙ্গভুক্ত, আর বরেন্দ্র ছিল বঙ্গের অংশ।
ষষ্ঠ শতাব্দীর পরবর্তী কোনো সময়ে রচিত আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প ভারতে ও গৌড়ে ইতিহাসসম্বলিত একটি অধ্যায় রাখে। সপ্তম শতকে শৈব সম্রাট শশাঙ্কদেব গৌড়াঞ্চল সংহত করেন এবং তখন থেকেই পিশাচপ্রাকৃতের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন এক ভাষা, “গৌড়ীয় ভাষা”, প্রচলিত হতে শুরু করে। বাণভট্ট তাঁর হর্ষচরিত গ্রন্থে শশাঙ্ককে উল্লেখ করেছেন হর্ষবর্ধনের জীবনে বিপর্যয় আনার জন্য। ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের দাদা রাজ্যবর্ধন সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁদের বোন রাজ্যশ্রী গ্রহবর্মণের সাথে বিবাহিত ছিলেন। দেবগুপ্ত তাঁকে হত্যা করে কন্যাকুব্জ দখল করেন ও রাজ্যশ্রীকে বন্দি করেন। রাজ্যবর্ধন সেনা নিয়ে তাঁকে উদ্ধারের জন্য রওনা দেন এবং পথে মালবসৈন্যকে পরাজিত করেন, সম্ভবত দেবগুপ্তকেও হত্যা করেন। শশাঙ্ক, যিনি মালবেশ্বরের মিত্র ছিলেন, ছলনার মাধ্যমে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন বলে হর্ষচরিতের কাহিনি জানায়।
মনে রাখবার বিষয়, আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গৌড়রাজ্যের অন্তর্গত ভুরশুট রাজ্য ক্রমে বিশেষভাবে গুরুত্ব লাভ করে। শশাঙ্ক তাঁর রাজধানী স্থাপন করেছিলেন কর্ণসুবর্ণে —যা আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর অঞ্চলে অবস্থিত। শশাঙ্ক প্রায় বত্রিশ বছর দীর্ঘকাল শাসন করেন । মহাভারতের কাহিনি অনুসারে কর্ণসুবর্ণ ছিল হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের দুর্যোধনের অধীন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী, যা তিনি বন্ধুত্বসূত্রে রাধাপুত্র কর্ণকে উপহার দেন। রাঢ় অঞ্চলকে পূর্বে রাঢ়-ভুক্তি বা রাধাভুক্তি বলা হতো। রাধা ছিল কর্ণের মাতার নাম, সেই সূত্রেই এই নামকরণ। কিংবদন্তি অনুসারে কর্ণসুবর্ণে (कर्णसुवर्ण) ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র—এই জাতিভেদে কেউ বিভক্ত ছিলেন না; সবারই একমাত্র পরিচয় ছিল “সুবর্ণ”, অর্থাৎ অভিন্ন এক জাতিগত মর্যাদা।
শশাঙ্কের শাসনামল ৫৯৩ থেকে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির গণনা তাঁর সিংহাসন আরোহণ দিবস থেকেই শুরু হয়। রাক্ষসীডাঙা ঢিবির প্রত্নখননে যে ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে, তাকে শশাঙ্কের রাজপ্রাসাদ বলেই মনে করা হয়। কাহিনিতে আছে যে মহাভারতের যুদ্ধের অবসানের পর থেকে রাক্ষসীডাঙার মানুষ পিশাচপ্রাকৃত ভাষায় কথা বলত। “রাঙামাটি” নামটির উৎপত্তি হয়েছে রাক্ষসরক্তরঞ্জিত ভূমি থেকে, পরে সেই অঞ্চল কর্ণসুবর্ণ নামে পরিচিত হয়।
রাক্ষসীডাঙার একেবারে কাছেই ভীমকিতলা নামে একটি স্থান আছে। মহাভারতের পাঁচ পাণ্ডব তাঁদের অজ্ঞাতবাসের সময়কালে কিছুদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন। রাক্ষসীঢিবির কাছেই দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীমসেনের সঙ্গে বক রাক্ষসের যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে ভীমসেন বক রাক্ষসকে পরাস্ত করে হত্যা করেন এবং তার দেহ ও ছিন্নমস্তক দূরে নিক্ষেপ করেন। যেখানে রাক্ষসের দেহ পতিত হয়েছিল, সেই স্থানই পরবর্তীকালে রাক্ষসীডাঙা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মুর্শিদাবাদের বিচারক ও ঐতিহাসিক এইচ. বেভরিজ ১৮৯৩ সালে রাঙামাটিকে প্রাচীন কর্ণসুবর্ণের সঙ্গে অভিন্ন করেছেন। হিউয়েন সাঙ লিখে গিয়েছেন, কর্ণসুবর্ণ ছিল ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ।
মিনহাজউদ্দিন সিরাজ ‘তবকাৎ-ই-নাসিরীর’ (১২৬০ খ্রীষ্টাব্দ) অনুবাদক কর্নেল রেভার্টি দেখিয়েছেন সেই সময় ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ের নাম ছিল রাঙামাটি। বখতিয়ার খলজীর সামরিক অভিযানে কর্ণসুবর্ণর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয় এবং ঐ অঞ্চলটি রাঙামাটি নামে পরিচিত হয়। ‘তবকাৎ-ই-নাসিরী’ গ্রন্থের বর্ননা অনুযায়ী বিক্রমশিলা ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টিও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বখতিয়ার খলজীর হাতেই ।
কর্ণসুবর্ণের উল্লেখ জয়নাগের ‘বপ্পঘোষবাট তাম্রশাসন’ (বপ্পঘোষবাট লিপি), কামরূপের ভাস্করবর্মণের ‘নিধনপুর তাম্রশাসন’ এবং হিউয়েন সাঙের বিবরণে পাওয়া যায়। বপ্পঘোষবাট গ্রামে কাশ্যপগোত্রীয় ভট্ট ব্রহ্মবীরস্বামীকে ভূমিদান করা হয়েছে। বপ্পঘোষবাট ভূমিদানপট্টোলী অস্ট্রেলিয়ার পার্থ মিউজিয়ামে আছে। গঞ্জাম তাম্রশাসন প্রমাণ করে যে ৬১৯ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের রাজ্য গঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আবার ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের মেদিনীপুর তাম্রশাসনে দেখা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গও তাঁর অধীনে ছিল।
‘বঙ্গ’ নামের ব্যবহার সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। ভাগীরথী ও ভৈরব নদীর মধ্যবর্তী অংশকে প্রাচীন কালে বঙ্গ বলা হতো। টলেমির মানচিত্রে ভৈরব নদীর শাখাপথে ‘আগ্গা’ নামে এক স্থানের উল্লেখ আছে, যা সম্ভবত বঙ্গ শব্দেরই রূপান্তর, আর আধুনিক চন্দ্রকেতুগড়ের সাথে তার মিল পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও প্রমাণ করে চন্দ্রকেতুগড়ের (উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায়) সঙ্গে তাম্রলিপ্তির ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। কৃত্তিবাসী রামায়ণ (১৪শ শতক) অনুসারে গঙ্গার অববাহিকায় ভৈরবের সঙ্গে গঙ্গার সংযোগ প্রাচীন কালে খননকৃত খাল দ্বারা সম্ভব হয়েছিল, যার একটির নামকরণ হয় ‘পদ্মা’।
শশাঙ্কের মৃত্যুর (৬৩৭–৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ) পর হর্ষবর্ধন ও কামরূপেশ্বর ভাস্করবর্মণ আক্রমণ চালিয়ে কর্ণসুবর্ণ পর্যন্ত দখল করেন। ফলে গৌড় রাজ্যের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্বের অবসান ঘটে। তবু পাল ও সেন রাজারা নিজেদের ‘গৌড়েশ্বর’ বা ‘গৌড়াধিপতি’ উপাধিতে ভূষিত করতেন। ধীরে ধীরে ‘গৌড়’ ও ‘বঙ্গ’ শব্দ দুটি সমগ্র বাংলার প্রতিশব্দে রূপ নেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যে গৌড় নগরী বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়। ভারতবর্ষে বিজয়নগর (১৩৩৬ খ্রীঃ) ও গৌড়—এই দুটি শহরই বৃহত্তম নগরী বলে গণ্য হতো।
গৌড় অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য-চেতনা প্রাচীন কাব্যে ভাষা ও অলঙ্কারে প্রতিফলিত হয়েছে। আলঙ্কারিক দণ্ডী কাব্যাদর্শে (খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দী)‘গৌড়ী’ নামে স্বতন্ত্র এক প্রাকৃতভাষা ও ‘গৌড়ী-রীতি’ নামে কাব্যরচনার ধারা উল্লেখ করেছেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড়রাজ্য হর্ষবর্ধনের অধীন হয়। হিউয়েন সাঙ বঙ্গদেশের পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্তি ও কর্ণসুবর্ণের বিবরণ দিলেও কোনো রাজাধিপতির নাম করেননি—সম্ভবত শশাঙ্কের ধ্বংসযজ্ঞে সেই প্রাচীন রাজবংশগুলি নিশ্চিহ্ন হয়েছিল এবং কর্ণসুবর্ণে তাঁর উত্তরাধিকারীও হর্ষবর্ধনের দ্বারা সিংহাসনচ্যুত হন।
গৌড়, তিরোত, ডিল্লী, কাশী আদি করি।
গুজ্জরাট, বিজয়ানগর, কাঞ্চী-পুরী ॥
হেলঙ্গ, তেলঙ্গ, ওড্র, দেশ আর কত ।
পণ্ডিতের সমাজ সংসারে আছে যত॥
দূষিব আমার বাক্য সে থাকুক্ দূরে
বুঝিতেই কোন জন শক্তি নাহি ধরে॥ (চৈতন্যভাগবত-১৫৩৫ খ্রি)
৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাস ঘোর অন্ধকারে ঢেকে যায়। মগধের আদিত্যসেন ৬৭১ খ্রিস্টাব্দে “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেন। বাক্পতিরাজের কাব্যে গৌড়পতি ও মগধনাথকে একই ব্যক্তি হিসেবে দেখা যায়, যা থেকে বোঝা যায় মগধেশ্বরই তখন ‘গৌড়াধিপতি’। সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক অবধি, তুর্ক আক্রমণ পর্যন্ত, গৌড় অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা যেমনই হোক না কেন, গৌড়েশ্বর উপাধিধারী রাজপুরুষের অস্তিত্ব কখনও লুপ্ত হয়নি।
শশাঙ্ক-পরবর্তী যুগে গৌড়ে পরমভাগবত জয়নাগ (৬৪৮-৬৭০ খ্রি ) নামে এক রাজা স্বল্পকাল রাজত্ব করেছিলেন। মঞ্জুশ্রীমূলকল্পে তাঁর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে মহারাজাধিরাজ জয়নাগ কর্ণসুবর্ণর বপ্পঘোষবাট গ্রামে থেকে ভূমিদানের তাম্রশাসন জারি করেন।

বীরভূম-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে আবিষ্কৃত কয়েকটি ‘জয়’ নামাঙ্কিত মুদ্রা, মঞ্জুশ্রীমূলকল্পের জয় এবং তাম্রশাসনের জয়নাগকে একই ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত করা হয়। বাঙালি ইতিহাসবিদদের মধ্যে ডঃ রাধাগোবিন্দ বসাকই জয়নাগ সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
শশাঙ্ককেই ইতিহাস প্রথম “বাংলার সম্রাট” রূপে চিহ্নিত করেছে।
রাজেন্দ্রচোলদেবের (১০১৪-৪৪ খ্রি) তিরুমালৈ অভিলেখে উল্লেখ আছে যে ১০২৫ খ্রিস্টাব্দের কিছু পূর্বে চোল সেনাপতি শিবনাথ, গৌড় অভিযানে এগিয়ে এসে দণ্ডভুক্তির ধর্মপাল, দক্ষিণ রাঢ়ের রণশূর, গৌড়ের গোবিন্দচন্দ্র এবং উত্তর রাঢ়ের মহীপালকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। গৌড়ের এই জয়ের গৌরবে রাজেন্দ্রচোলদেব ‘গঙ্গোইকোণ্ড’ অর্থাৎ গঙ্গাজয়ী উপাধি ধারণ করেন এবং গঙ্গাইকোণ্ড চোলপুরমে বৃহদেশ্বর শিব মন্দির (১০৩৫ খ্রি) নির্মাণ করেন।

