বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ব্যাকরণ অকারণ, কি কারণে শিখবো, যা খুশি মনে আসে তাই আমি লিখবো –
ব্যাকরণ কি কারণে, বলতে গেলে বলতে হয় যে, বি (বিশেষ)+আ (সম্যক্) + কৃ+অন=ব্যাকরণ। ব্যাকরণ = বি আ + করণ । “করণ” শব্দ সংস্কৃত √কৃ ধাতু (করণ = করা, সম্পাদন) থেকে এসেছে। উপকরণ = উপ + করণ । “করণ” (karan) দিয়ে শেষ হয় এমন অনেক বাংলা শব্দ আছে, যেগুলি সাধারণত সংস্কৃতান্ত অথবা সংস্কৃতনিষ্ঠ শব্দ।
সাধারণ “করণ”-সমাপ্ত শব্দ কারক বা উপায় অর্থে ব্যবহৃত হয় –
- কার্যকরণ (কাজ সম্পাদন)
- শিক্ষাকরণ (শিক্ষাদান প্রক্রিয়া)
- বিচারকরণ (বিচার সম্পাদন প্রক্রিয়া)
- নিবন্ধনকরণ (নিবন্ধ তৈরির প্রক্রিয়া)
- প্রকাশকরণ (প্রকাশ করা)
- সংস্কারকরণ (সংস্কার সম্পাদন)
- সঞ্চালনকরণ (চালনা করা)
- নির্ণয়করণ (ফলাফল নির্ণয়)
- সমাধানকরণ (সমস্যা সমাধান)
- প্রতিকারকরণ (প্রতিকার করা)
- প্রতিপালনকরণ (রক্ষা করা)
- নিয়ন্ত্রণকরণ (নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া)
- ব্যবস্থাকরণ (ব্যবস্থা করা)
- প্রয়োগকরণ (প্রয়োগ করা)
- সমীক্ষাকরণ (সমীক্ষা করা)
- সৃষ্টিকরণ (সৃষ্টি করা)
- স্থাপনকরণ (স্থাপন করা)
- সম্বন্ধকরণ (সংযোগ ঘটানো)
- অবতারণকরণ (অবতারণ করা)
- অনুষ্ঠানকরণ (অনুষ্ঠান সম্পাদন)
আইন-প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রয়োগে
- যাচাইকরণ (ভেরিফিকেশন)
- অনুমোদনকরণ
- প্রত্যাহারকরণ
- বহিষ্করণ
- অন্তর্ভুক্তিকরণ
- বর্জনকরণ
- গ্রহণকরণ
- পরিত্যাগকরণ
- দলিলীকরণ
- হিসাবকরণ
- প্রতিবেদনকরণ
- উপকরণ (সাহায্যকারী উপাদান)
ব্যাকরণ আসলে কোনও ভাষাকে বোঝানোর পদ্ধতি। বাংলার ব্যা-করণ মানে হচ্ছে বাংলাভাষাকে বোঝানোর এক বিশেষ রীতি (ঋতি)। এখন পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ বাংলার কোনও না কোনও উপভাষায় কথা বলে কিন্তু তারা ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন নিয়ে মাথা ঘামায় না। যদি আমরা খুঁজে দেখতে চাই যে গৌড়ীয় ভাষা কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে কি না, তবে তুলনামূলক ভাষা হিসেবে অন্য ভাষাগুলো আমাদের সামনে একটা দিশা দেয়। জার্মান, ফিনিশ কিংবা জাপানি ভাষা ভবিষ্যৎ বোঝাতে বর্তমানকালের ক্রিয়ার ব্যবহার করে, যেন ভবিষ্যৎ ঘটনাটাই এখন ঘটছে। কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যৎ—তিনটি কাল স্পষ্টভাবে আছে। ফরাসি ভাষায় যেমন ইংরেজির মতই “to go” দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝানো যায়, আবার তার আলাদা একটা পূর্ণ ভবিষ্যৎ কালও আছে। ইংরেজিতে I am going, I will go; ফরাসিতে je vais, j’irais—এরকম। ওয়েলশ, স্প্যানিশেও একই ধারা।
বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম মানে হচ্ছে বাংলাভাষায় কথাবলার সাধারণ রীতি বা স্বরলহরির ধরনকে ব্যা-খ্যা করা। সংস্কৃত একেবারে ব্রহ্মার সময় থেকে “শুদ্ধ ভাষা” বলে ধরা হয়েছে, কিন্তু বঙ্গীয়-গৌড়ীয় ভাষা চিরদিনই চলমান আর পরিবর্তনশীল, এখানে কোনও শুদ্ধ বাংলা বলে কিছু নেই। তাই সঠিক বাংলা বলার বা লেখার জন্য আলাদা করে ব্যাকরণ শেখার দরকার হয় না, ব্যাকরণ শুধু একটা ছক দেখায়, একটা রীতি বোঝায়। ‘করন’ মানে সাহায্যকারী পদ্ধতি আর ‘ব্যা’ মানে বিশেষ—তাই ব্যাকরণ মানে হলো কোনও ভাষার পরিস্থিতিকে বোঝানোর বিশেষ উপায়।
সংস্কৃত ছিল স্থির ভাষা, পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু প্রাকৃত ছিল পরিবর্তনশীল, তাই তার নানা রূপ সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা যেমন রংপুরি, চাটগাইয়া, ঢাকাইয়া—ই যদি ব্যাখ্যান করতে চাই, তবে প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা ব্যাকরণ দাঁড় করানো সম্ভব। যেমন চাটগাইয়া ব্যাকরণ, যশোরি ব্যাকরণ—এভাবে ধরা যায়। আমাদের সীমিত উদ্দেশ্যে আমরা চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষাকে মাপকাঠি হিসেবে ধরে বাংলা ভাষার ব্যাখ্যান করার চেষ্টা করবো। ২০২৫ সালে কলকাতা, নদিয়া, বর্ধমানের মানুষ অবশ্য চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষায় কথা বলেন না, কিন্তু তবু একটি সাধারণ নিয়ম সেখান থেকে ছেঁকে নেওয়া যায়। পুরুলিয়া বা মেদিনীপুরী উপভাষাতেও আজকের মানুষ কথা বলেন না, তবু তাদেরও আলাদা ব্যাকরণ ছিল, তাদের ভাষার এবং শব্দ কৌশলের নির্বচন করা সম্ভব ছিল।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন ১৮৩৫ সালে কলকাতায় এলেন, তখন তিনি নিজের মেদিনীপুরীয় বাংলা বাদ দিয়ে কলকাতার কথ্য বাংলার রীতি আয়ত্ত করলেন। কথ্যরীতি আগে আসে, ব্যাকরণ পরে তৈরি হয়। বাংলায় কথ্যরীতি আসে অভ্যাসের মাধ্যমে, ব্যাকরণ মেনে নয়। আমাদের গৌড়-বঙ্গীয় ব্যাকরণ আসলে গৌড়-বঙ্গীয় ভাষার রূপ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা, সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুবাদ নয়। তাই কৃতপ্রত্যয়, তদ্ধিতপ্রত্যয়, নট্বিধান বা ষট্বিধার মতো নিয়ম বাংলার ব্যাকরণে চাপিয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয় না। ঢং ঢং শব্দটা কি ধ্বনি-আত্মক? এটা না জেনেও ঢ্যাং ঢ্যাং করে বাংলা বলা যেতেই পারে, একটু খট-খাটে লাগলেও চট-পটেরা, ঝট পট করে বাংলা শিখতে পারে। শব্দের বর্গীকরণ না শিখলেও চলে । কুঞ্জবনে কুঝ্বটিকা, কোকোনদ জলে, রামের বাসর হবে মন্থরা জ্বলে, ইতি আদি শব্দ-বিন্যাস অভিজ্ঞতা বলেও করা যায়, তবে বাক সমর বা বাক্য রণে ব্যাকরণের অভ্যাস থাকলে সুবিধেই হয় ।
হাঁস ছিল সজারুও, ব্যাকরণ মানি না,
ব্যাকরণ পড়ে পড়ে, ভাষা শেখা হলো না।
ক্যামব্রিজ-অক্সফোর্ড, গ্রামারের চাটনি,
চাটা-চাটি সার হলো, এঁগ্রেজি এল না।
এঁগ্রেজ সব নিল আমেরিকা মাটিতে –
জামা-প্যান্ট-চপ্পল, ব্যাকরণ গেল না ।
ডুক্রিং কারণে দিন রাত রটে যাও,
পেটেতে লাগলে খিদে কাজে কিছু আসে না ।
কর্তা-কর্ম-কারক, তদ্ধিত-উপপদ,
অব্যয়-সন্ধি-সমাস এই বুঝি ভেসে যায়।
অনেক চেষ্টা করে বাংলাটা হলো না,
মিছামিছি চ্যাঁচামেচি কাজে কিছু দিল না।
আমি যখন ১৯৮৯ সালে নবম শ্রেণীতে পড়ি, তখন আমরা বাংলার রচনা ও ব্যাকরণের জন্য অধ্যাপক পি আচার্যের রচনা-বিচিন্তা এবং একই সঙ্গে বামনদেব চক্রবর্তীর উচ্চতর বাংলা ব্যাকরণ (১৯৮০) পড়তাম। তখনই আমার মনে হয়েছিল যে বাংলা আসলে সংস্কৃতের একটি রূপান্তরিত আঞ্চলিক উপভাষা, আর বাংলা ব্যাকরণ মূলত অনূদিত সংস্কৃত ব্যাকরণই—তার শর্তাবলি, তার পদবিন্যাস, সবই সংস্কৃত নির্ভর। কেউ কেউ বলতেন, যারা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণ কৌমুদী পড়েছেন তারা বাংলা ভাষায় গভীর দখল পেয়েছেন, আর যিনি সংস্কৃত জানেন তিনি বাংলা সহজেই রপ্ত করতে পারেন।
দেখা যায় যে বর্ণের শ্রেণীবিভাগ, ণত্ব বিধান ও ষত্ব বিধান, সন্ধি, পদপ্রকরণ, বিশেষ্য-বিশেষণ-সর্বনাম-অব্যয়ের শ্রেণীবিভাগ, লিঙ্গ- বচন, পুরুষ-কারক ও তাহার বিভক্তি তথা অনুসর্গ, ক্রিয়াপদ, সমাস, প্রত্যয়-উপসর্গ, ছন্দ-অলংকার—সবকিছুই সংস্কৃত কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি যখন আমরা দেশজ-কোলজ শব্দ বা বিদেশি শব্দ বাক্যে বসাই, তখনও বাংলা ব্যাকরণ তাদের সংস্কৃতায়িত করে নেয়। বোঝা যায় সহজেই যে বোপদেবের মুগ্ধবোধ (দ্বাদশ শতাব্দী), কলাপ ব্যাকরণ, এমনকি পাণিনি বা পতঞ্জলির নিয়ম আজও আমাদের স্কুল কলেজে চলমান।
এখানে ‘মূল বাংলা’ নামে আলাদা কোনো ধারণা নেই। বাংলা ভাষা মূলত ভাগ হয়ে গেছে ‘বাঙ্গাল ভাষা’ (বারেন্দ্রী ও বাঙ্গাল উপভাষা) এবং ‘ঘটি ভাষা’-য়। ‘ঘটি ভাষা’ বা ‘ঘটির ভাষা’ মূলত মানে ‘বন্দ ঘাটি’ সপ্তগ্রামী ভাষা—কিন্তু বাস্তবে এর মধ্যে রাঢ়ী উপভাষা, রাজবংশী উপভাষা, ঝাড়খণ্ডী উপভাষা সবই ঢুকে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, কেবলমাত্র বন্দঘাটি ভাষারই একটি সাধু রূপ ও ব্যবহারিক চলিত রূপ আছে। এই সাধুভাষা প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতেরই অনুবাদিত রূপ, সে পশ্চিমবঙ্গ হোক, ত্রিপুরা হোক বা বাংলাদেশই হোক। বাংলাদেশি শব্দ—খালা, ফুফু, পানি, নামাজ, মুন্সি ইত্যাদি যুক্ত হলেও বৃহত্তর সংস্কৃত কাঠামো কোনোদিনও পাল্টায় না।
