দূষিত এলিজা ইম্পে

দূষিত এলিজা ইম্পে

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

এলিজা ইম্পে (Elijah Impey, ১৭৩২–১৮০৯) ছিলেন একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্রিটিশ বিচারক এবং কলকাতার সুপ্রীম কোর্ট অব জুডিকেচারের প্রথম প্রধান বিচারপতি। ১৩ জুন ১৭৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এক দরিদ্র খ্রিস্টান পরিবারে। শৈশবে ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং আজীবন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। পরে ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ১৭৫৬ সালে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৭৭২ সালে হাউস অব কমন্সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত হয়ে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৭৩ সালে পাস হওয়া রেগুলেটিং অ্যাক্ট অনুসারে কলকাতায় সুপ্রীম কোর্ট গঠিত হলে, ১৭৭৪ সালে অ্যাটর্নি জেনারেল থারলো’র সুপারিশে ইম্পে প্রথম প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন। একই বছর তিনি নাইট উপাধি পান এবং এপ্রিল মাসে জাহাজ Anson-এ চেপে ভারতে এসে ১৯ অক্টোবর কলকাতায় পৌঁছান। ব্রাহ্মণ ও হিন্দু ধর্মের প্রতি তার তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল।

১৭৭৪ সালে সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হলে পুরনো মেয়র্স কোর্ট উঠে যায়। মাদ্রাজ, কলকাতা এবং বোম্বেতে মেয়র আদালতগুলি ব্রিটিশ ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সর্বোচ্চ আদালত ছিল। মেয়র্স কোর্ট ১৭২৬ সালের সনদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আদালতের (সুপ্রীম কোর্ট) নিজস্ব ভবন না থাকায় কিছুদিন মেয়র্স কোর্ট ভবনেই বিচারকার্য চলত। সেই পুরনো মেয়র্স কোর্ট ভবনেই ১৭৭৫ সালের ৮ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত মহারাজা নন্দকুমারের মামলা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ১৭৭৫ তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়, বর্তমান ব্রিগেড প্যারেড মাঠে তাকে মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। নন্দকুমারকে ১৭৬৪ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ‘মহারাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন এবং ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে বর্ধমান, নদিয়া ও হুগলির দেওয়ানি প্রদান করেছিল। পরবর্তীকালে নন্দকুমার ওয়ারেন হেস্টিংসের (১৭৩২ – ১৮১৮) দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনতে উদ্যোগী হলে তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা রুজু হয়। তখন ইংল্যান্ডের আইনে জালিয়াতি ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।

ইম্পে আইনের ভুল ব্যাখ্যা এবং এখতিয়ারহীন মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। এ রায়কে ইতিহাসে ভারতের প্রথম ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। লর্ড ম্যাকলে (Macaulay) ইম্পে ও হেস্টিংসকে ‘আইনি হত্যার ষড়যন্ত্রকারী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এই বিচারের রায় ও পরিণামই ইম্পেকে ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করে।

মহারাজা নন্দকুমার ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকাশ্যে ইংরেজ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ফাঁস করেছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করে তিনি বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এই কারণেই ইংরেজরা তাঁকে নিঃশব্দে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। ব্রিটিশ ইতিহাসে ভারতে এটিই প্রথম বিচারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে পরিচিত। নন্দকুমার দেশের প্রথম শহিদ, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদে দাঁড়িয়েছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছিলেন।

কলকাতার শেরিফ আলেকজান্ডার ম্যাক্রেবি ছিলেন নন্দকুমারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁর বর্ণনায় এক গভীর বেদনার ছবি ফুটে ওঠে—“তিনি হাসিমুখে ফটকের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং অনায়াসে পালকিতে বসলেন, চারপাশে তাকালেন নিস্পৃহ দৃষ্টিতে। রাজা পালকির উপরে শান্তভাবে বসে ছিলেন, প্রথমে কিছু মনোযোগ দিয়ে চারিদিক লক্ষ্য করলেন। ফাঁসির মঞ্চ কিংবা চারপাশের প্রস্তুতি দেখে তাঁর মুখে বা আচরণে সামান্যতম বিচলিত ভাবও আমি লক্ষ্য করিনি। তিনি বিলম্ব চাননি, বারবার আমাকে বলছিলেন—‘আমি প্রস্তুত’।’’ শেষ মুহূর্তে নন্দকুমার শেরিফকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর চোখ ঢাকার কাপড় যেন তাঁরই ভৃত্য বাঁধে। ম্যাক্রেবির লেখা অনুযায়ী—“রাজা ইশারায় তাঁর এক অনুগত ভৃত্যকে ডাকলেন, যে তখন তাঁর পদতলে শায়িত ছিল। মাথা নত করে কেঁপে ওঠা সেই ভৃত্যকেই তিনি মুখোশ পরানোর দায়িত্ব দিলেন।”

Maharaja Nanda Kumar

১৭৭৪ সালের যে সনদের মাধ্যমে কলকাতা সুপ্রীম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার খসড়া প্রণয়ন করেছিলেন ইম্পে। সেখানে বিচারপতির জন্য অসীম ক্ষমতা রাখা হয়েছিল। এখতিয়ার সংক্রান্ত অস্পষ্টতার কারণে এই ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে হাউস অব কমন্সে অভিসংশনও হয়।

১৭৮০ সালের অক্টোবরে ওয়ারেন হেস্টিংসের সুপারিশে ইম্পে সদর দেওয়ানি আদালতের বিচারপতি নিযুক্ত হন। মাসিক বেতন ছিল ৫৬০০ সিক্কা টাকা, যা বার্ষিক প্রায় ৭৭৯৫ পাউন্ড চার শিলিং। অথচ সুপ্রীম কোর্টের সনদ অনুযায়ী এই নিয়োগ বেআইনি ছিল। এর ফলে লন্ডনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ১৭৮৩ সালে ইম্পেকে দেশে ফিরতে বাধ্য করা হয়। ১৭৮৭ সালের ১২ ডিসেম্বর হাউস অব কমন্সে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে অভিসংশন গৃহীত হয়। ১৭৮৯ সালে নন্দকুমার মামলার বিচার এবং ওয়ারেন হেস্টিংসকে রক্ষার ভূমিকার কারণে ইম্পে ও হেস্টিংস—উভয়কেই অভিসংশনের মুখে পড়তে হয়। ইম্পের বিচারিক জীবন কলঙ্কিত হয়ে যায়।

ইম্পে কলকাতায় মিদলটন রো-তে থাকতেন, যেখানে পরে লোরেটো হাউস কনভেন্ট স্থাপিত হয়। সেই বাড়ির পেছনে হরিণখামার ছিল, যেখান থেকে এলাকার নাম হয় ‘পার্ক স্ট্রিট’। পূর্বে রাস্তার নাম ছিল Burial Ground Road।

১৭৮০ থেকে ১৭৮৪ সালের মধ্যে বর্তমান কলকাতা হাইকোর্টের স্থানে সুপ্রীম কোর্টের নতুন ভবন তৈরি হয়েছিল। পরে ১৮৬২ সালে সেটি ভেঙে ফেলে হাইকোর্ট ভবন গড়ে ওঠে। পুরনো মেয়র্স কোর্ট ভবন যেখানে ছিল, সেখানে ১৮১৫ সালে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ নির্মিত হয়। কলকাতা হাইকোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ১ জুলাই, ১৮৬২।

এলিজা ইম্পে ১৭৭৪ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত ভারতের বিচারব্যবস্থায় কার্যরত ছিলেন। নন্দকুমার মামলার জন্য তিনি আজও ব্রিটিশ বিচার ইতিহাসে কলঙ্ককর, এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থার পক্ষপাত, অস্পষ্টতা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহারের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়।

Rajbari of Maharaj Nanda Kumar at Murdhidabad
সৈয়দাবাদ রাজবাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের সৈয়দাবাদ অঞ্চলে অবস্থিত। এই রাজবাড়িটি মহারাজা নন্দকুমারের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। প্রায় ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে এটি নন্দকুমারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হত।

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল