বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ক
কৃত্তিবাস ওঝা (১৩৮১–১৪৬১ খ্রি.)-এর বংশপরিচয় বহু প্রাচীন। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে আদিশূর যখন কানৌজ থেকে পাঁচ জন ব্রাহ্মণকে এই দেশে আনেন, তাঁদের একজন ছিলেন ভরদ্বাজ-গোত্রীয় শ্রীহর্ষ। শ্রীহর্ষের সপ্তদশ পুরুষ অধস্তন নরসিংহ ওঝা ছিলেন বেদানুজ রাজার প্রধান মন্ত্রী। ধারণা করা হয়, এই বেদানুজই পূর্ববঙ্গের স্বর্ণগ্রামের রাজা ছিলেন। প্রায় ১২৪৮ খ্রিস্টাব্দে নরসিংহ অরাজক স্বর্ণগ্রাম ত্যাগ করে গঙ্গাতীরে বসবাসের উদ্দেশ্যে ফুলিয়ায় এসে স্থায়ী হন।
তখন ফুলিয়া ছিল বেশ সমৃদ্ধ এলাকা। কৃত্তিবাস নিজেই বলেছেন, পূর্বে এখানে ছিল “মালঞ্চ”, নানা ধরনের ফুলের বাগান—তাই নাম হয়েছে “ফুলিয়া”। দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বীচিমালিনী ভাগীরথী রুপালি ধারায় বয়ে চলেছে, প্রকৃতি অনাবিল সৌন্দর্যে ভরপুর। এই মনোরম পরিবেশে নরসিংহ তাঁর পদমর্যাদার উপযোগী আড়ম্বর নিয়ে এসে একেবারে বসত গড়ে তুললেন—
“ফুলিয়া চাপিয়া হইল তাঁহার বসতি।
ধন ধান্যে পুত্ত্র পৌত্ত্রে বাড়য়ে সন্ততি॥”
নরসিংহের দয়ালু পুত্র গর্ভেশ্বর ছিলেন কৃত্তিবাসের প্রপিতামহ। গর্ভেশ্বরের ছেলে মুরারি ওঝা—কৃত্তিবাসের পিতামহ—একজন প্রধান কবি ছিলেন। যদিও তাঁর কোনো রচনার সন্ধান মেলে না, কৃত্তিবাস তাঁকে ব্যাস-মার্কণ্ডেয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কৃত্তিবাসের বাল্যশিক্ষা শুরু হয়েছিল চতুষ্পাঠীতে। সেখান থেকেই তিনি সংস্কৃত রামায়ণ পাঠের পথে এগোন। পাঠশেষে, সেই সময়কার প্রথা অনুসারে, তিনি গৌড়েশ্বরের সভায় আত্মপরিচয়ের জন্য উপস্থিত হন। রাজা তাঁর প্রতিভা চিনে রামায়ণ রচনার আদেশ দেন। রাজাের আশীর্বাদ নিয়ে কৃত্তিবাস যখন বেরিয়ে আসেন, তখন চারিদিকে ধ্বনিত হয়—
“সবে বলে ধন্য ধন্য ফুলিয়া পণ্ডিত॥
মুনিমধ্যে বাখানি বাল্মীকি মহামুনি।
পণ্ডিতের মধ্যে তথা কৃত্তিবাস গুণী॥”
রাজা মাহেন্দ্রক্ষণে এই রচনার আদেশ দিয়েছিলেন। বাংলাভাষার ভোরের প্রথম সূর্যকিরণ যেন কৃত্তিবাসের কপালে সোনালি মুকুট পরিয়ে দিয়েছিল। গ্রামবাংলার আঙিনায়, গৃহস্থের উঠোনে, জনপদের বধূদের গোষ্ঠীতে, এমনকি নিরক্ষর কৃষকের কানে—ভালোবাসা ও ভক্তিভরে তাঁর রামায়ণ গাওয়া হতে লাগল। একাদশীর অপরাহ্ণে আজও কোথাও কোথাও বিধবারা উপবাসের ক্লান্তি ভুলে কিশোর-কণ্ঠে রামায়ণ পাঠ শুনে চোখ ভিজিয়ে নেন।
কৃত্তিবাসের রামায়ণ মনোহর কল্পনা, মধুর ভাব ও অনুপম কাব্যশৈলীতে ভরপুর, যা বঙ্গসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর রচনাই পরবর্তী যুগে অসংখ্য কবি ও লেখকের অনুপ্রেরণার উৎস হয়েছে। প্রায় পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁর নাম আজও বাঙালির ঘরে ঘরে, বাজারে, ক্ষেতের ধারে ধ্বনিত হয়। যদিও আজ আর গঙ্গার ধার ঘেঁষে ফুলিয়ায় তাঁর বসতির চিহ্ন নেই, তবু তাঁর রামায়ণ এখনও বাঙালির হৃদয়ে বাঁশির সুরের মতো বেজে চলে।
তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল গভীর মানবিক বোধ। তিনি জানতেন, ভারতবর্ষের মানুষ যাঁর মধ্যে প্রেম ও ভক্তির অশ্রু খুঁজে পায়, তাঁকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মতোই কবিতার আসল স্বাদ দিতে হলে নিজে তার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে মগ্ন হতে হয়। কৃত্তিবাস তাঁর প্রাণ নিঃশেষে ঢেলে দিয়েছিলেন কবিতার পাদপদ্মে—তাই তাঁর রচনায় কোথাও বাধা নেই, সর্বত্রই অপ্রতিহত গতি। মনে হয় যেন তিনি এক আসনে বসেই, মনকে অন্য কোনো দিকে না ভাসিয়ে, রামায়ণের গান গেয়েছেন—এবং নিজে মজে গেছেন, তাই তাঁর শ্রোতারাও মুগ্ধ হয়েছে, যুগে যুগে হবে।
গৌড়েশ্বরের সভায় তাঁর প্রথম উপস্থিতির বর্ণনায় কৃত্তিবাস লিখেছেন—
রাজপণ্ডিত হব মনে আশা করে,
সপ্তশ্লোক ভেটিলাম রাজা গৌড়েশ্বরে।
দ্বারিহস্তে শ্লোক দিয়া রাজাকে জানালাম,
রাজাজ্ঞা অপেক্ষা করি দ্বারেতে রহিলাম।
সপ্তঘটি বেলা যখন দগড়ে পড়ে কাঠি,
শীঘ্র ধাই আইল দূত হাতে সুবর্ণ লাঠি।
কার নাম ফুলিয়ার পণ্ডিত কৃত্তিবাস,
রাজার আদেশ হৈল করহ সম্ভাষ।
পাত্রেতে বেষ্টিত রাজা আছে বড় সুখে,
অনেক লোক দাঁড়াইয়া রাজার সম্মুখে।
রাজার ঠাঞি দাঁড়াইলাম চারি হাত অন্তর,
সাত শ্লোক পড়িলাম শুনে গৌড়েশ্বর।
পঞ্চদেব অধিষ্ঠান আমার শরীরে,
সরস্বতীপ্রসাদে শ্লোক মুখ হৈতে স্ফুরে।
নানা ছন্দে শ্লোক আমি পড়িনু সভায়,
শ্লোক শুনি গৌড়েশ্বর আমা পানে চায়।
নানামতে নানা শ্লোক পড়িলাম রসাল,
খুসি হৈয়া মহারাজ দিল পুষ্পমাল।
কেদার খাঁ শিরে ঢালে চন্দনের ছড়া,
রাজা গৌড়েশ্বর দিল পাটের পাছড়া।
রাজা গৌড়েশ্বর বলে—কিবা দিব দান?
পাত্রমিত্র বলে—রাজা, যা হয় বিধান।
পঞ্চগৌড় চাপিয়া গৌড়েশ্বর রাজা,
গৌড়েশ্বর পূজা কৈলে, গুণের হয় পূজা।
পাত্রমিত্র সবে বলে—শুন দ্বিজরাজে,
যাহা ইচ্ছা হয়, তাহ চাহ মহারাজে।
কারো কিছু নাহি লই, করি পরিহার,
যথা যাই, তথায় গৌরব মাত্র সার।
যত যত মহাপণ্ডিত আছে এ সংসারে,
আমার কবিতা কেহ নিন্দিতে না পারে।
সন্তুষ্ট হইয়া রাজা দিলেন সন্তোক,
রামায়ণ রচিতে করিলা অনুরোধ।
প্রসাদ পাইয়া বাহির হইলাম সত্বরে,
অপূর্ব জ্ঞানে লোকে ধায় আমা দেখিবারে।
চন্দনে ভূষিত আমি, লোক আনন্দিত,
সবে বলে—ধন্য ধন্য ফুলিয়া পণ্ডিত।
মুনিমধ্যে বাখানি বাল্মীকি মহামুনি,
পণ্ডিতের মধ্যে কৃত্তিবাস গুণী।
বাপ মায়ের আশীর্বাদ, গুরুর কল্যাণ,
রাজাজ্ঞায় রচে গীত সপ্তকাণ্ড গান।
সাতকাণ্ড কথা হয় দেবের সৃজিত,
লোক বুঝাইতে কৈল কৃত্তিবাস পণ্ডিত।
