বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
আ
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ১৮৬৪ সালের ২৯ জুন কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ডা. গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন শহরের খ্যাতনামা চিকিৎসক, আর মা জগত্তারিণী দেবী ছিলেন এক আদর্শ গৃহিণী। শৈশব কেটেছিল বাবা-মায়ের স্নেহ, যত্ন ও সতর্ক তত্ত্বাবধানে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি একটি শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রায় আড়াই বছর সেখানে পড়াশোনা শেষে কিছুদিন গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠ নেন, পরে ভবানীপুর সাউথ সাবার্বান স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। তখন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন খ্যাতনামা ব্রাহ্মধর্মপ্রচারক শিবনাথ শাস্ত্রী।
১৮৭৯ সালের নভেম্বরে আশুতোষ প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেই সময় কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন চার্ল্স টনি। ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষার আগে অসুস্থ হলেও ফলাফলে তিনি তৃতীয় হন। ১৮৮৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম স্থান অধিকার করে বি.এ. পাস করেন; পরের বছর গণিতে এবং তার পরের বছর পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ. সম্পন্ন করেন। ২২ বছর বয়সে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি পান, আর মাত্র দুই মাস পর সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এই বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। তাঁর অসাধারণ প্রতিভার কারণে তাঁকে এড়িয়ে অন্যের পক্ষে ওই বৃত্তি লাভ প্রায় অসম্ভব ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন মেনে না নিলেও পরের বছরই তাঁকে এম.এ. পরীক্ষার পরীক্ষক করা হয়। গণিতে তাঁর কৃতিত্ব বিদেশেও স্বীকৃত হয়েছিল—এডিনবরার রয়েল সোসাইটি, আয়ারল্যান্ডের রয়েল একাডেমি এবং আরও বহু আন্তর্জাতিক গণিতসভা তাঁকে সম্মানিত করে। তবে শুধু গণিত নয়, অন্যান্য বিদ্যাতেও তাঁর গভীর অনুরাগ ও সাফল্য ছিল।
যদি তিনি সারা জীবন কেবল গণিত নিয়েই থাকতেন, তবুও বিশ্বখ্যাত হতেন—এ নিয়ে সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে দেশ ও জাতির সেবাকেই জীবনের ব্রত করেছিলেন। শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টর স্যার আল্ফ্রেড ক্রফ্ট তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপকপদে আনতে চেয়েছিলেন, তৎকালীন ভাইস-চান্সেলার স্যার কোর্ট্নি ইল্বার্টও সহায় হতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আশুতোষের লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের উন্নতির বাহন করা—মেধাবী যুবকদের নানা বিদ্যায় দক্ষ করে তোলা এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে গৌরবময় আসনে বসানো।
বি.এল. পাশ করে তিনি হাই কোর্টের উকিল হন। এর আগে স্যার রাসবিহারী ঘোষের অধীনে চুক্তিবদ্ধ সহকারী হিসেবে আইন প্রয়োগবিদ্যা শিখেছিলেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি হাই কোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন। আইন পেশায় প্রভূত অর্থোপার্জন সত্ত্বেও বিচারকের পদ নেন এই উদ্দেশ্যে যে, অবসর সময় বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের সেবায় ব্যয় করতে পারবেন। ১৯০৪ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিচারপতি ছিলেন এবং একবার কার্যনির্বাহী প্রধান বিচারপতির পদও সামলান। তাঁর রায়ে সূক্ষ্মদৃষ্টি, বিচক্ষণতা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় ছিল, যা পণ্ডিত আইনজ্ঞদেরও বিস্মিত করত।
বিচারকের কঠোর দায়িত্ব পালন করেও তিনি দেশের কাজে নিরলস ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পারিবারিক দায়িত্ব উপেক্ষা করে জাতীয়তার প্রেরণায় প্রাণপণ কাজ করেছেন। তাঁর উদ্যোগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয়দের স্বাধিকারে প্রতিষ্ঠিত হয়—এক সত্যিকারের স্বদেশি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। নৈতিক দৃঢ়তা, সাহস ও নির্ভীকতাই তাঁকে ‘বাংলার বাঘ’ উপাধি এনে দেয়।
মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হন এবং ১৮৮৯ সাল থেকে মৃত্যুর দিন ১৯২৪ সালের ২৫ মে পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। ভাইস-চান্সেলার হিসেবে ১৯০৬–১৯১৪ এবং পুনরায় ১৯২১–১৯২৩ সময়কালে তিনি অসামান্য দক্ষতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি সাধন করেন। ১৯১৭ সালে পোস্ট-গ্রাজুয়েট শিক্ষা চালুর সময় তাঁর সংগঠনশক্তি সবার প্রশংসা কেড়ে নেয়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পরীক্ষা নিত, এখন সর্বোচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্বও গ্রহণ করে, আর এই বিশাল ব্যবস্থার ভার তাঁর কাঁধেই বর্তায়।
তিনি ভারতীয় ভাষার পঠন-পাঠন পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। বাংলা ভাষা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অবশ্যপাঠ্য হলেও ১৮৬৮ সালে তা উঠে যায়। ১৮৯১ সালে তিনি ফ্যাকাল্টি অব আর্টস সভায় প্রস্তাব দেন, যাতে সংস্কৃতপাঠী ছাত্রদের বাংলা, হিন্দি বা ওড়িয়া ভাষায় এবং ফারসি বা আরবি পাঠীদের উর্দু ভাষায় পরীক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়। যদিও সে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি, তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। ১৮৯৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ বাংলা ভাষাকে পুনঃঅবশ্যপাঠ্য করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তাব পাঠায়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় আশুতোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এর ফলে বি.এ. পর্যন্ত বাংলা ভাষার অধ্যাপনা ও পরীক্ষা চালু হয়, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়, এবং ছাত্ররা বিভাপতি-চণ্ডীদাস প্রমুখ কবিদের সুললিত কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হয়।
পোস্ট-গ্রাজুয়েট প্রতিষ্ঠান গঠনের পর এম.এ. পরীক্ষায় ভারতীয় ভাষার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থাও তাঁর কীর্তি। এর আগে ভারতে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় এই উদ্যোগ নেয়নি। তাঁর প্রচেষ্টায় আজ প্রায় সব কলেজেই বাংলা ভাষা অধ্যাপিত হয় এবং নানা বিভাগে এর সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলা ভাষার উন্নতিতে সাহিত্য পরিষদ ও সাহিত্য সম্মিলনের মাধ্যমে তিনি জনমত গড়ে তোলেন। ১৯০৬ সালে কাশিমবাজার রাজবাটীতে অনুষ্ঠিত প্রথম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর ১৯১৬ সালের বাঁকিপুর অধিবেশনের মূল সভাপতি ছিলেন আশুতোষ; সাহিত্য শাখার সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ১৯১৯ সালে হাওড়ায় অনুষ্ঠিত দ্বাদশ অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন এবং ১৯১৬ সালের এক অধিবেশনে সভাপতির আসনে বসেন। এসব সভায় তাঁর ওজস্বী বক্তৃতা বাংলা সাহিত্যে নতুন অনুপ্রেরণা এনে দেয়।
তাঁর বিশ্বাস ছিল—মাতৃভাষার সাহায্য ছাড়া জনশিক্ষা বিস্তার অসম্ভব। তাই তিনি প্রবলভাবে মাতৃভাষার অনুশীলনকে উৎসাহ দিতেন, বলতেন—“আপ্রাণ চেষ্টা করো মাতৃভাষার চর্চায়; মাতৃভাষার মাধ্যমেই দেশের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করা যায়।” এই দর্শন আজও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির ইতিহাসে দীপ্ত হয়ে আছে।
