বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
জ
জরিপ সংক্রান্ত বাংলাভাষায় ১৮৬২ খ্রি. লিখিত একটি অত্যন্ত প্রামাণ্য ও পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা, যা জমিদারি আমলের ভূমি জরিপ প্রথা, পরিমাপের পদ্ধতি, দাগ-ফর্দের শ্রেণিবিন্যাস, আমিনের কার্যপ্রণালী, মৌজার গঠন, একজাই-পরতল-পাইকম্তা-খামার-চাকরাণ প্রভৃতির ব্যুৎপত্তিগত ও কারিগরি ব্যাখ্যা প্রভৃতি বিষয়ে একটি প্রাচীন জরিপী দলিল বা কৃষি-সংগ্রহকার্যের হস্তলিখিত পুস্তিকার পুনর্লিখন বলে প্রতীয়মান।
জরিপ-প্রকরণ
সমগ্র দেশ বহু খণ্ডে বিভক্ত। বৃহত্তর খণ্ডকে “জেলা”, জেলার ক্ষুদ্র অংশকে “পরগণা”, এবং পরগণার অন্তর্গত আরও ক্ষুদ্র অংশকে “মৌজা” বলা হয়। কখনো এক মৌজায় একাধিক গ্রাম থাকিতে পারে, আবার কখনো এক গ্রামের মধ্যে একাধিক মৌজা অন্তর্ভুক্ত হইতে দেখা যায়।
জেলা কেবল পরগণাতেই বিভক্ত নহে; অনেক স্থানে জেলা বিভিন্ন “মহল”-এও বিভক্ত। যে জমির খাজনা সরাসরি সরকার (গবর্ণমেন্ট) আদায় করেন, তাহাকেই “মহল” বলা হয়।
জমিদার কর্তৃক প্রজার উপর নিরিখ করিয়া খাজনা বৃদ্ধি বা হ্রাস করিবার পূর্বে, যে পরিমাণ জমি উক্ত প্রজা ভোগ করিতেছে তাহার যথাযথ মাপজোক ও অনুসন্ধান করিতে হইবে। এইরূপ সর্বাঙ্গীণ ভূমি-মাপ ও খতিয়ান তৈয়ারির কার্য্যকে “জরিপ” বলা হয়।
জমিদারের পক্ষে যে ব্যক্তি এই জরিপ কার্য সম্পাদন করেন, তাহার নাম “আমিন”। তিনি গ্রামস্থ বহুদশী মণ্ডলগণের সহায়তায় জরিপকার্য্য পরিচালনা করেন। কখনো জমিদার সরকারকে ফির (ফি) প্রদান করিয়া কালেক্টরী আমিনের দ্বারাও জরিপ করাইয়া থাকেন।
জরিপকার্য কেবল শীত ও বসন্ত ঋতুতে সম্পাদিত হয়; কারণ গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপ এবং বর্ষা বা শস্যপূর্ণ সময়ে জমির অবস্থান নিরূপণে অসুবিধা হয়।
জমির প্রকৃতি ও ফলনের পরিচয় লক্ষ করিয়া জমিকে আওল, দোয়েম প্রভৃতি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়।
যদি কোনো গ্রামে একযোগে সমস্ত জমির জরিপ হইয়া থাকে, তাহাকে “একজাই জরিপ” বলা হয়।
একবার জরিপান্তে যদি কোনো সন্দেহ বা আপত্তি ওঠে, তাহা হইলে পুনরায় যে জরিপ করিতে হয় তাহাকে বলা হয় “পরতাল জরিপ”।
জরিপে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন প্রণালী প্রচলিত—
- কোথাও এলাহী রশি (৭৫ গজ),
- কোথাও সেকেন্দরী (৫৫ গজ),
- কোথাও ১৮ বা ২০ ইঞ্চি দীর্ঘ “হস্ত”-পরিমাণ রশি ব্যবহৃত হয়।
রশি তৈরিতে বিশেষ সতর্কতা আবশ্যক।
শুধু শণ-নির্মিত রশি আর্দ্রতায় সংকুচিত হইয়া প্রজার ক্ষতি সাধন করে,
শুধু পাট-নির্মিত রশি প্রসারিত হইয়া জমিদারের ক্ষতিসাধন করে।
অতএব, অর্ধাংশ শণ ও অর্ধাংশ পাটে প্রস্তুত রশি উত্তম।
এইরূপ রশি নির্দিষ্ট “হস্ত”-কাটিতে মাপিয়া, প্রতি কাঠা ও ছটাকের চিহ্ন বসাইলে মাপ কার্য্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়।
মাপের যন্ত্রকে “লগী” বলা হয়।
প্রচলিত লগীর দৈর্ঘ্য ৪ হাত।
লগীর বর্গফলে “১ গণ্ডা”,
২০ গণ্ডায় “১ কাঠা”,
২০ কাঠায় “১ বিঘা” হয়।
জরিপে অনেক সময় শিকল ব্যবহৃত হয়। পাঁচ কাঠা লম্বা শিকল সবচেয়ে সুবিধাজনক।
- এই শিকলে ৪০টি কাটি থাকে,
- কাটিকে “কড়ি” বলা হয়।
- প্রতি কড়ি আধ-হাত বা আধ-পোয়া দীর্ঘ।
- আট কড়ির পর পর “ফুলি” চিহ্ন থাকে।
- এক ফুলি এক কাঠা নির্দেশ করে।
- দুই প্রান্তে আংটা থাকে, যাহা ধরিা দুইজন মাপ কার্য্য করে।
যদি এক মহলের মধ্যে একাধিক মৌজা থাকে, তাহা হইলে পৃথক পৃথকভাবে মাপ দিতে হয়।
মৌজার উপখণ্ডকে “কিতা” বলা হয়। কিতা প্রায়ই চতুষ্কোণ হয়। তার সীমানা মাপলেই কিতার জমির পরিমাণ নির্ণয় হইয়া যায়।
দাগ ও ফর্দ রীতি (পুরাতন)
প্রাচীনকালে জরিপে চৌহদ্দি লেখার রীতি ছিল না। “তদতপই” ইত্যাদি শব্দে দিক নির্ধারণ করা হইত।
জমির শ্রেণী অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন “ফর্দ” প্রস্তুত হইত, যথা—
১ম — খোদকস্তা
২য় — পাইকম্তা
৩য় — ঠিকা
৪র্থ — পাতকর
৫ম — খামার
৬ষ্ঠ — চাকরাণ
৭ম — দেবোত্তর
৮ম — পীরোত্তর
৯ম — ব্রহ্মোত্তর
১০ম — মহত্রাণ
১১শ — বৈষ্ণবোত্তর
১২শ — খানাবাটী ইত্যাদি।
আমিন জরিপের সময় মাঠে গমন করিয়া প্রাপ্ত ভূমি সেই রকম ফর্দে লিখিত করিত।
এই কার্য্যকে “দাগর্ভাওরী” বলা হইত।
শেষে চিঠার কৈফিয়ত প্রস্তুত করিয়া তেরিজ বা সফাবন্দি সম্পাদন করিয়া—
খোদকস্তা, পাইকম্তা, ঠিকা, পাতকর, খামার, চাকরাণ, দেবোত্তর, পীরোত্তর প্রভৃতি সমস্ত জমি “মোজরাই” এবং “খালিসা” রূপে শ্রেণীভুক্ত করা হইত।
বর্ধমান প্রভৃতি বহু রাজপরিবারে ইহা এখনও প্রচলিত।
বর্তমানে এই পদ্ধতির পরিবর্তে দুইটি শ্রেণীবিভাগ রীত হয়েছে—
- মহলরাইয়তি – (খোদকস্তা, পাইকম্তা, ঠিকা, পাতকর)
- মহলএকদফা – (খামার ও অন্যান্য সমস্ত বাজে জমি)
জরিপ পূর্ববর্তী একরার
বরাবরেষু —
মহামহিম শ্রীযুক্ত বাবু বীরেন্দ্রচন্দ্র রায় বাহাদুর,
জমিদার মহাশয় বরাবর।
লিখিতং —
শ্রীগৌরদাস মণ্ডল ও শ্রীতিতু মাঝি,
সাং — দুর্গাপুর।
এই একরারপত্রমিদং —
কার্য্য এই যে, মৌজে দুর্গাপুর জরিপ হেতু আমিন শ্রীশম্ভুচন্দ্র মিত্র ও মুহুরি শ্রীশ্রীরাম দাস প্রেরিত হইয়াছেন।
আমরা, উক্ত মণ্ডলগণ, হাজির থাকিয়া গ্রাম মজকুর করিবার এবং ওয়াকাই জরিপ করাইবার বিষয়ে একমত থাকিলাম।
কোনোরূপ গড়মিল বা তফাৎ করিব না।
ইতি সন—তাৎ। ঈশাদী।
সাক্ষী —
শ্রীভূতনাথ মান্না
শ্রীকাশী কলে
সর্ব্ব সাং — দুর্গাপুর।
জরিপী চিঠা ও তাহার রীতি
জমির জরিপ শেষ হইলে “জরিপী চিঠা” প্রস্তুত করা হয়।
চিঠার শেষ অংশে লেখা থাকে:
“জরিপ শেষ হইল।”
তারপরে আমিন নিজ নাম স্বাক্ষর করেন, এবং শেষ দিবসে যিনি উপস্থিত ছিলেন, তাহার নামও লিখিয়া রাখেন।
জরিপে ব্যবহৃত শব্দ ও অর্থ
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| চিঠা | যে কাগজে জমির পরিমাণ ইত্যাদি বিস্তারিত লেখা থাকে। |
| জরিপ | ভূমি-মাপ। |
| পরতল | পুনরায় জরিপ (সন্দেহ দেখা দিলে)। |
| মুশোহাত | জমিদার ও প্রজার সম্মতিতে নির্দিষ্ট জরিপ। |
| জব্দজমী | ব্যক্তির দখলে থাকা ভূমি; হস্তের মাপ। |
পাবনা জেলার ভূমি জরিপ বিষয়ে বিবরণপত্র।
এই যে, জেলা পাবনার অন্তর্গত বিভিন্ন মৌজার ভূমি জরিপকার্য্য হইতে হইলে, তখনকার প্রচলিত প্রথা মোতাবেক (১৮৬২ খ্রি), একখানি আশিটি (৮০) হস্ত দৈর্ঘ্যের রশী, যাহা বিশ অথবা একুশ (২০ বা ২১) ইঞ্চি পরিমাণ হস্তে গণনা করা হইয়াছে, তাহা প্রস্তুত করিয়া ভূমি পরিমাপ করিতে হইত। এই মাপান্তর রীতিমত ভূমি পরিমাপ কার্য্যে ব্যবহার করা হইত।
ভূমি মাপিয়া যখন জমির শ্রেণী ও প্রকৃতি লিপিবদ্ধ করা হইত, তখন বাস্তুস্থলকে “খোদ” এবং উদ্বৃত্ত বা অব্যবহৃত ভূমিকে “ওজোড় খোদ” বলিয়া লিখা হইত। উপরন্তু, উক্ত ভূমিতে যেরূপ শস্যাদি উৎপন্ন হইত, তাহা বিশেষরূপে উল্লেখ করা হইত।
উল্লেখযোগ্য রীতি ছিল যে, ভূমির শ্রেণীকরণে ও তাহার ব্যবহারগত বিবরণে যেসমস্ত শস্য উৎপন্ন হইত, তাহার নামাবলি লিপিবদ্ধ করিতে হইত, যথা—
ধানী, কলাই, মসিনা, হরিদ্রা (হলুদ), পাট, পুষ্করিণী (পুকুর), বাঁশবন, বাগাত (বাগিচা ইত্যাদি) প্রভৃতি।
এইরূপে জমির শ্রেণী ও উৎপাদন ক্ষমতা অনুসারে তাহার পরিচয় রেকর্ডখাতায় অন্তর্ভুক্ত হইত।
