বঙ্গীয় ভূখণ্ড (প্রাচীন)

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

বঙ্গভূমির প্রাচীন রাজনৈতিক বিভাজন

তবে কথোদিনে ইচ্ছাময় ভগবান্।
বঙ্গদেশ দেখিতে হইল ইচ্ছা তান ॥
তবে প্রভু জননীরে বলিলেন আনি ।
“কথোদিন প্রবাস করিব মাতা! আমি ॥”
লক্ষী-প্রতি বলিলেন শ্রীগৌরসুন্দর।
আইর সেবন করিবারে নিরন্তর॥
তবে প্রভু কথো আপ্ত শিষ্যবর্গ লয়্যা।
চলিলেন বঙ্গদেশে হরষিত হয়্যা॥ (চৈতন্যভাগবত-১৫৩৫ খ্রি)

বঙ্গভূমি ছিল এক বৃহৎ সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জনপদের অংশ, যেখানে বহু ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জনপদ তাদের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ভাষাগত বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র ছিল।

পুরাণীয় বর্ণনা অনুযায়ী, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র, উড় এবং সুহ্ম—এই ছয়টি জনপদের প্রবর্তকগণ ছিলেন একত্রে ভ্রাতৃসম। তারা সকলে ছিলেন বলিনামক এক রাজপুরুষের দত্তক পুত্র এবং ঋষি গৌতম দীর্ঘতপা (Dirghatamas Gautama) কর্তৃক জন্মপ্রাপ্ত।

অঙ্গ (अङ्गेभ्यः) প্রাচীন ভারতের এক উল্লেখযোগ্য জনপদ, যার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অথর্ববেদ (সংহিতা ৫.২২.১৪) (৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) শ্লোকে অঙ্গদের নাম গন্ধারী, মুজবত (মুজবত বা মুজবত/মুজবত পর্বত অঞ্চলের অধিবাসী), এবং মগধদের সঙ্গে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে অঙ্গ ছিল তৎকালীন ভারতীয় জনজাতি ও রাজনৈতিক জনপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহাসিকভাবে, অঙ্গের অবস্থান বর্তমান বিহারের ভাগলপুর, মুঙ্গের ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বলে ধারণা করা হয়। পালি সূত্রগুলিতে অঙ্গ-রাজের রাজধানী ছিল চম্পা (Champa), যা গঙ্গা ও চাম্পা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত ছিল এবং তা ছিল একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক নগরী। প্রাচীন ভারতীয় নাট্য ও কাব্যে চম্পার সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য বর্ণিত হয়েছে।

অঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো এর মগধের দ্বারা অধিগ্রহণ। এটি ঘটেছিল রাজা বিম্বিসার (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে) শাসনকালে। বিম্বিসার, হর্যঙ্ক বংশীয় এক বলিষ্ঠ ও বুদ্ধিমান রাজা, অঙ্গ রাজ্য দখল করে মগধ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। অঙ্গের রাজা ব্রহ্মদত্ত বিম্বিসারের (৫৪৩ – ৪৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) পিতাকে পরাজিত করেছিলেন, এবং বিম্বিসার প্রতিশোধ স্বরূপ অঙ্গ জয় করে তাকে মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই বিজয়ের পর, তিনি চম্পাকে একটি প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন।

প্রাচীন জনপদসমূহ ও তাদের আধুনিক ভূ-অবস্থান

প্রাচীন জনপদআধুনিক ভূ-অবস্থান
পুন্ড্রবর্ধন (Pundravardhana)বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগ ও রংপুর বিভাগ; ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহর কিছু অংশ (বরেন্দ্রভূমি)
বঙ্গ (Vanga)বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ ও বরিশাল বিভাগ; পদ্মা নদীর পশ্চিম অংশ
তিরাভুক্তি (Tirabhukti)ভারতের মিথিলা অঞ্চল ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চল
গৌড় (Gauda)ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা
সুহ্মভূমি (Suhma)পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলি ও নদিয়া জেলা
সমতট (Samatata)বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগ, বরিশাল বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগ
হরিকেল (Harikela)বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ

বারাণসীর পূর্ব দিকে প্রাচীন জনপদগুলোর বর্তমান ভৌগোলিক চিহ্ন (রাজশেখর রচিত “কাব্যমীমাংসা” গ্রন্থের দেশ-কাল বিভাগ):

প্রাচীন নামবর্তমান অবস্থান
অঙ্গবিহারের ভাগলপুর ও মুঙ্গের অঞ্চল
কলিঙ্গবর্তমান ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশের উত্তরের কিছু অংশ
কোসলবিহার ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশ (সরযূ নদীর আশেপাশে)
তোষল / তোসলিওড়িশার ধৌলিগিরির কাছাকাছি (ভুবনেশ্বরের কাছে)
উত্কলমূলত বর্তমান উড়িষ্যার উপকূল অঞ্চল
মগধদক্ষিণ বিহার (গয়া, পাটনা ও আশপাশের অঞ্চল)
মুডগর (মুঙ্গের)বিহারের মুঙ্গের জেলা
বিদেহউত্তর বিহার (মিঠিলাঞ্চল – দরভাঙ্গা, মধুবনী অঞ্চল)
নেপালবর্তমান নেপাল রাষ্ট্র, বিশেষ করে তেরাই অঞ্চল
পুণ্ড্রউত্তরবঙ্গ (বাংলাদেশের বগুড়া, রংপুর এবং ভারতের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি অঞ্চল)
প্রাগজ্যোতিষবর্তমান আসাম (বিশেষ করে গৌহাটির আশেপাশে)
তাম্রলিপ্তপশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশ – বর্তমান তমলুক (মেদিনীপুর জেলা)
কমলসম্ভবত কামরূপ (আসামের একাংশ) অথবা বর্তমান কামতা এলাকা
মল্লনেপালের দক্ষিণাঞ্চল ও বিহারের গোরখপুর, কুশীনগর অঞ্চল
ভর্ত্তকসম্ভবত ভট্ট বা বর্তমান ভাটির অঞ্চল (অসম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক, অনুমানযোগ্য)
সুহ্মপশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান,হাওড়া এবং হুগলি জেলা
ব্রহ্মব্রহ্মদেশ – সম্ভবত বর্তমান মায়ানমারের কিছু অংশ (আরাকান/রাখাইন)
উত্তরসাধারণভাবে হিমালয়ের উত্তর অংশ – সম্ভবত তিব্বতের দিকে ইঙ্গিত

প্রাচীন বঙ্গীয় ভূখণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাঢ় বা রাঢ়দেশ, যাকে প্রাচীন সাহিত্যে কখনও রাধা কিংবা রাধ (৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে, এই রাধা শব্দটির রূপান্তরেই ‘রাঢ়’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। তখন আঞ্চলিক মানুষ পৈশাচী প্রাকৃত/প্রাকৃত ভাষায় কথা বলত। ভাষাতাত্ত্বিক ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় এই জনপদের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে মূলত বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, পুরুলিয়া এবং বীরভূমের কিছু অংশ জুড়ে। এটি ছিল পশ্চিম বঙ্গের অন্তর্বর্তী ও তুলনামূলক শুষ্ক ভূমিভাগ, যা ঐতিহাসিকভাবে নানা সাংস্কৃতিক ধারার সংমিশ্রণে গঠিত একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল।

রাঢ় জনপদ দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল বলে মনে করা হয়:

  • উত্তর রাঢ় (বীরভূম ও পূর্ব বর্ধমানের অঞ্চল), এবং
  • দক্ষিণ রাঢ় (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম বর্ধমান)।

এই অঞ্চলটি গঙ্গার মূল প্রবাহ থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে এক স্বতন্ত্র ভূপ্রকৃতি, ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। রাঢ়ভূমি তুলনামূলকভাবে পাথুরে, খরাপ্রবণ ও শুষ্ক হওয়ায় কৃষিকাজ কঠিন ছিল, ফলে এখানকার জনজীবনে পরিশ্রম, সহিষ্ণুতা ও কৌসুলি সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

Sahitya Samrat
বাৎস্যায়ন যুগের সংস্কৃতি ও বারাণসীর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল