টুসু গীত

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

টুসুক সুরে মিটেই পেটেক ভুক

টুসু গীত বা কুড়মালি টুসু গান (कुड़मालि टुसु गीत) হল ঝাড়খণ্ড এবং পুরুলিয়ার (পুরুইল্যা পশ্চিমবঙ্গ) একটি ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত, যা টুসু পরব বা টুসু উৎসব-এর সঙ্গে যুক্ত। এই উৎসব কৃষিজীবী সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং টুসু নামের এক লোকদেবীকে কেন্দ্র করে পালিত হয়, যিনি ফসল, প্রকৃতি ও নারীশক্তির প্রতীক। টুসু পরবের উৎপত্তি ঝাড়খণ্ডের কুড়মি, মাহাতো ও বনবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে, যেখানে এটি পৌষ মাসের (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) ফসল তোলার সময় উদযাপন করা হয়। টুসু শব্দটির সঙ্গে প্রাকৃত ও পৈশাচী ভাষার সম্পর্ক আছে, কারণ এই অঞ্চলের আদি ভাষাগুলি প্রাচীন প্রাকৃত থেকে বিবর্তিত হয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, টুসু দেবী প্রকৃতপক্ষে পৈশাচ প্রকৃতির রূপ, আবার কেউ কেউ তাঁকে লক্ষ্মী বা দুর্গার সঙ্গে যুক্ত করেন।

টুসু গীতের ভাষায় সাদরি, নাগপুরি, কুড়মালি এবং স্থানীয় বাংলা উপভাষার মিশ্রণ দেখা যায়। এই গানগুলির সুর ও শব্দপ্রকরণে কোল সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। টুসু উৎসবে মেয়েরা মাটি ও ধানের শিষ দিয়ে টুসুর মূর্তি তৈরি করে, সিঁদুর-আলতা দিয়ে সাজায়। তারপর সবার সঙ্গে গান গেয়ে শোভাযাত্রা করে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয় (দুর্গাপূজার বিসর্জনের মতো)। এই সময় ঢোল, মন্দার, করতাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান গাওয়া হয়।

ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, খুন্তি, গুমলা, সিমডেগা এবং পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া অঞ্চলে টুসু গীত সবচেয়ে জনপ্রিয়। ওড়িশা ও বিহারের কিছু অংশেও এই উৎসব পালন করা হয়। জৈন ভগবতীসূত্র (প্রায় খ্রিস্টপঞ্চম শতাব্দী) অনুসারে পুরুলিয়া ছিল প্রাচীন ভারতের ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম এবং এই অঞ্চলটিকে তখন “বজ্রভূমি” (Vajra-bhumi) নামে অভিহিত করা হতো। এই উক্তি থেকে বোঝা যায় যে, পুরুলিয়া অঞ্চলের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং এটি রাজনীতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। “বজ্র” শব্দটি শক্তি, অনড়তা ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক, যা থেকে অনুমান করা যায়, এই অঞ্চলের মানুষ কঠোর ধর্মাচরণ, কঠিন ভূপ্রকৃতি এবং সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। জৈন ধর্মে বজ্রভূমি শব্দটি একদিকে যেমন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলকে চিহ্নিত করে, অন্যদিকে এটি একটি আধ্যাত্মিক উপমাও বটে, যেখানে কঠিন তপস্যা ও ব্রত পালনের প্রসঙ্গ উঠে আসে।

১৯৪৮ সালে মানভূম জেলায় বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার মানুষ টুসু গানের ভাষায় প্রতিবাদ জানান, যেগুলি রচনা করেছিলেন ভজহরি মাহাতো। এই গানগুলি সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক শক্তিশালী রূপ হয়ে ওঠে, অনেকেই গান গেয়ে গ্রেফতার হন। একটি জনপ্রিয় টুসু গান ছিল:

শুন বিহারী ভাই
তোরা রাখতে লারবি ডাঙ দেখাই।
তোরা আপন তরে ভেদ বাড়ালি,
বাংলা ভাষায় দিলি ছাই।

বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে।
মারবি তোরা কে তারে।।
এই ভাষাতে কাজ চলছে
সাত পুরুষের আমলে।
এই ভাষাতেই মায়ের কোলে
মুখ ফুটেছে মা বলে।।

এই ধরনের টুসু গীত শুধু সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিক চেতনারও প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল