Date: 12th March 2025
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাসটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অন্যতম প্রেরণাস্বরূপ সাহিত্যকর্ম। ১৮৮২ সালের ৮ই এপ্রিল Liberal পত্রিকায় উপন্যাসটির বিজ্ঞাপনে যে মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছিল, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিজ্ঞাপনের বক্তব্যের মূল সুর হলো—ব্রিটিশ শাসনের উদ্দেশ্য এবং ভারতীয়দের প্রতি তাদের প্রভাব সম্পর্কে একটি দর্শন উপস্থাপন করা।
১. ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা ও ঈশ্বরের ইচ্ছা
বিজ্ঞাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল: ভারতীয়দের কি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত? নাকি ব্রিটিশ শাসনকে ঈশ্বরের ইচ্ছার অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত?
(ক) মুসলিম শাসনের অবসান ও ব্রিটিশ শাসনের আসা
বিজ্ঞাপনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে এসেছে মুসলিম শাসনের অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানোর জন্য। এই ধারণাটি বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আনন্দমঠ-এ চিত্রিত সন্ন্যাসী বিদ্রোহ মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হলেও, উপন্যাসের শেষভাগে ব্রিটিশ শাসনকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
(খ) ব্রিটিশ শাসন ও আর্য ধর্মের পুনর্জাগরণ
উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে সন্ন্যাসী নেতা সত্যানন্দকে এক চিকিৎসক বলেন—“ইংরেজদের রাজত্বের মাধ্যমে আর্য ধর্মের পুনর্জাগরণ সম্ভব।” বিজ্ঞাপনের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞান ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটানো, যা পরোক্ষভাবে হিন্দু ধর্মের প্রকৃত রূপকে পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করবে।
২. ভারতীয় সমাজে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা
বিজ্ঞাপনের আরেকটি প্রধান তত্ত্ব হলো—ভারতীয়দের উচিত পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও জ্ঞানের অনুসরণ করা।
(ক) জ্ঞানের দুটি স্তর: বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ
বিজ্ঞাপনের ভাষ্য অনুসারে, প্রকৃত হিন্দুধর্ম কেবলমাত্র বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জ্ঞান ও আত্মসাধনার উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে আত্মসাধনার পূর্বশর্ত হলো বাহ্যিক বা বস্তুগত জ্ঞানের প্রসার। বিজ্ঞানের চর্চা ছাড়া ভারতীয়দের প্রকৃত ধর্মীয় ও আত্মিক বিকাশ সম্ভব নয়।
(খ) ইংরেজদের কাছ থেকে শেখার প্রয়োজনীয়তা
বিজ্ঞাপনের যুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয়দের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করতে হলে ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থার অনুসরণ করা জরুরি। কারণ ইংরেজরা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ এবং তারা ভারতীয়দের এই জ্ঞান শেখানোর জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত।
৩. ইংরেজি শিক্ষা ও ভারতীয় সমাজের ভবিষ্যৎ
বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য করবে এবং এই জ্ঞান ভারতীয় সমাজকে নবজাগরণের পথে পরিচালিত করবে।
(ক) আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ সংস্কার
উপন্যাসের বিজ্ঞাপন অনুসারে, ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নতির জন্য আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চা অপরিহার্য। ইংরেজরা এই শিক্ষার মাধ্যমেই ভারতীয়দের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তা ও সংস্কারের বীজ বপন করবে।
(খ) ইংরেজি শিক্ষা ও ব্রিটিশ শাসনের স্থায়িত্ব
বিজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে যে, “ব্রিটিশ সরকার অক্ষুণ্ণ থাকবে, যতদিন না হিন্দুরা পুনরায় জ্ঞান, নৈতিকতা ও শক্তিতে উন্নত হয়।” এই বক্তব্য বোঝায় যে ভারতীয়দের যদি প্রকৃতভাবে শিক্ষিত হতে হয়, তাহলে ব্রিটিশ শাসন মেনে নেওয়াই শ্রেয়।
৪. বিজ্ঞাপনের দৃষ্টিকোণ: সমালোচনা ও পর্যালোচনা
বিজ্ঞাপনের এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।
(ক) জাতীয়তাবাদের চেতনা ও বিরোধী মতামত
অনেক জাতীয়তাবাদী এই বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁদের মতে, এটি ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভারতীয়দের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পরিবর্তে ইংরেজদের উপর নির্ভরশীল করে তুলতে চায়।
(খ) ব্রিটিশদের শিক্ষানীতির বাস্তবতা
যদিও ব্রিটিশরা ভারতে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল, তবে তাদের উদ্দেশ্য নিছক জ্ঞানবিকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল উপনিবেশিক শাসনকে সুসংহত করার একটি কৌশল। শিক্ষার নামে ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই ছিল প্রকৃত লক্ষ্য।
১৮৮২ সালের Liberal পত্রিকায় প্রকাশিত আনন্দমঠ-এর বিজ্ঞাপন ব্রিটিশ শাসনকে এক বিশেষ ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। এটি বোঝাতে চেয়েছিল যে, ভারতীয় সমাজের প্রকৃত উন্নতি ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণের জন্য ইংরেজদের শাসন প্রয়োজন। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন শিক্ষিত হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশের সাথে সাথে এই তত্ত্ব বিতর্কিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত, ভারতবাসীর মুক্তি ও উন্নতি ব্রিটিশ শাসনের মধ্যস্থতায় নয়, বরং আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
প্রথমবারের বিজ্ঞাপন।
বাঙ্গালীর স্ত্রী অনেক অবস্থাতেই বাঙ্গালীর প্রধান সহায়। অনেক সময় নয়।
সমাজবিপ্লব অনেক সময়েই আত্মপীড়ন মাত্র। বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী।
ইংরেজেরা বাঙ্গালা দেশ অরাজকতা হইতে উদ্ধার করিয়াছেন।
এই সকল কথা এই গ্রন্থে বুঝান গেল।
দ্বিতীয়বারের বিজ্ঞাপন।
Translation from Original English
প্রথমবারের বিজ্ঞাপনে যাহা লিখিয়াছিলাম, তাহার টীকা স্বরূপ কোন বিজ্ঞ সমালোচকের কথা অপর পৃষ্ঠে উদ্ধৃত করিলাম (শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়):
উপন্যাসের মূল ধারণাটি হলো এই—জাতীয় চেতনায় কি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস মনোভাব পোষণ করা ন্যায়সঙ্গত? অথবা, এই প্রশ্নকে অন্যভাবে উপস্থাপন করলে, ইংরেজ শাসনের প্রতিষ্ঠা কি কোনোভাবে বিধিবদ্ধ বা ঈশ্বরপ্রদত্ত? অথবা, আরও চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে, ঈশ্বর কী উদ্দেশ্যে ও কোন তাৎক্ষণিক লক্ষ্য সামনে রেখে ইংরেজদের এই দেশে পাঠিয়েছেন?
উপন্যাসের ভূমিকায় এই উদ্দেশ্য সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—বাংলায় মুসলিম শাসনের অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানো। এবং শেষ অধ্যায়ে এই মিশনের ব্যাখ্যা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে করা হয়েছে:
“চিকিৎসক বললেন, ‘সত্যানন্দ, নিরাশ হয়ো না। যা ঘটে, তা সর্বদাই মঙ্গলের জন্য ঘটে। এটাই বিধিলিপি যে, আর্য ধর্মের পুনর্জাগরণের পূর্বে ইংরেজদের প্রথমে দেশ শাসন করা প্রয়োজন। বিধাতার অভিপ্রায়ে মন দাও। আর্যদের ধর্ম তিন শত ত্রিশ মিলিয়ন দেবদেবীর পূজায় আবদ্ধ নয়; প্রকৃতপক্ষে, এটি ধর্মের এক প্রকার অবক্ষয়—যা প্রকৃত আর্য ধর্মের বিলোপ ঘটিয়েছে এবং তথাকথিত ‘ম্লেচ্ছ’ হিন্দুত্বের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। প্রকৃত হিন্দুধর্ম জ্ঞানের ভিত্তিতে স্থাপিত, কর্মের ভিত্তিতে নয়।
জ্ঞান দুই প্রকার—বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ। অভ্যন্তরীণ জ্ঞানই হিন্দুধর্মের মূল ভিত্তি। তবে বাহ্যিক জ্ঞানের বিকাশ ছাড়া অভ্যন্তরীণ জ্ঞান বৃদ্ধি পায় না। আত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বস্তুগত জ্ঞানের প্রয়োজন। বহির্জগতের জ্ঞান বহুদিন ধরে এই দেশ থেকে হারিয়ে গেছে এবং এর সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে আর্য ধর্ম। তাই, পুনর্জাগরণ ঘটাতে হলে সর্বপ্রথম বস্তুগত বা বাহ্যিক জ্ঞানের প্রচার প্রয়োজন। এখন কেউ নেই যে আমাদের এই শিক্ষা দিতে পারে; আমরাও তা শেখাতে পারি না। আমাদের তা অন্য দেশ থেকে গ্রহণ করতে হবে।
ইংরেজরা বস্তুগত জ্ঞানের বিশাল পাণ্ডিত্য অর্জন করেছে এবং তারা দক্ষ শিক্ষকও বটে। সুতরাং, তাদের রাজা করা উচিত। ইংরেজি শিক্ষা আমাদের লোকদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করাবে, যা তাদের নিজেদের আত্মিক প্রকৃতির সমস্যা বোঝার ক্ষমতা দেবে। এর ফলে, আর্য ধর্মের প্রচারে যে প্রধান বাধা ছিল, তা দূর হবে এবং প্রকৃত ধর্ম স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনর্জীবিত হবে।
ব্রিটিশ সরকার অবিনশ্বর থাকবে, যতদিন না হিন্দুরা পুনরায় জ্ঞান, নৈতিকতা ও শক্তিতে মহান হয়ে ওঠে। অতএব, হে জ্ঞানী, সংগ্রাম থেকে বিরত থাকো এবং আমাকে অনুসরণ করো।’”
এই উক্তিটি শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে সর্বাধুনিক ও প্রগতিশীল মতামত প্রতিফলিত করে এবং যেহেতু এটি একটি শক্তিশালী কাহিনীর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে, তাই এটি সমগ্র জাতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
লেখকের মতবাদ আমরা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করি, কারণ এটি ইতোমধ্যেই ইংরেজি শিক্ষার এক মূল আদর্শে পরিণত হয়েছে। আমরা একে এইভাবে প্রকাশ করতে পারি—ভারত বাধ্য যে, পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে গ্রহণ করবে এবং সমস্ত সত্যের ব্যাখ্যায় তা প্রয়োগ করবে।
এই ধারণা অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং এটি যেন এক সোনালি সূতোর মতো সমগ্র গ্রন্থের বুননে ছড়িয়ে আছে।
এটি ৮ই এপ্রিল, ১৮৮২ তারিখে Liberal পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্যের বাংলা অনুবাদ।
