বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রাক-চৈতন্য যুগের নিদর্শন ও ধর্মীয় কাব্যধারার সূচনালিপি
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা ভাষার সর্বপ্রাচীন পরিচিত কাব্যসমষ্টিগুলির অন্যতম, যেটি মধ্যযুগীয় বৈষ্ণবধর্মভিত্তিক পদাবলীর অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এর রচয়িতা হচ্ছেন কবি বড়ু চণ্ডীদাস, যিনি ১৩শ-১৪শ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে (সম্ভবত ১৩৫০–১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নানুর অঞ্চলে বাস করতেন।
এই কাব্যটিকে কখনো কখনো বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, কারণ এতে চরিত্র, সংলাপ, দৃশ্যরচনা, অন্তঃসম্পর্ক ও ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনার নাট্যঘন কাব্যিক বিন্যাস পাওয়া যায়। এই গ্রন্থে কল্পিত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার লীলাবিলাসের মধ্যে দিয়ে চৈতন্য-পূর্ব সমাজের সাংস্কৃতিক, নৈতিক, ধর্মীয় ও আচারগত অবস্থা অনুরণিত হয়েছে।
পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার ও প্রকাশ
এই কাব্যটি দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে চণ্ডীদাসের নামে রচিত এই পদসমূহের একটি পুথি আবিষ্কৃত হয় ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে) বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ মহাশয় বাঁকুড়া জেলার বনবিষ্ণুপুরের কাছাকাছি কাঁকিল্যা গ্রামের বাসিন্দা শ্রীনিবাস আচার্যের দৌহিত্র বংশধর দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়ালঘরের মাচা থেকে তুলোট কাগজে লেখা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথিটি আবিষ্কার করেন। পুথিটি ১২৭৫ বঙ্গাব্দে (১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে) কপি করা হয়েছিল। গবেষক বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এটি উদ্ধার করেন এবং বিস্তারিত সম্পাদনার পর গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। পুঁথির ৪৫২ পৃষ্ঠার মাঝের ৪৫ পৃষ্ঠাও পাওয়া যায়নি।
প্রথমে কাব্যটির প্রকৃত রচয়িতার পরিচয় সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও পরবর্তীকালে ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যসমালোচকদের বিশ্লেষণে এটি বড়ু চণ্ডীদাস-রচিত বলেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। বর্তমানে ২৪৩/১ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডস্থ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পুথিশালায় এটি রক্ষিত আছে।
ভাষা ও রীতিশৈলী
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ ব্যবহৃত ভাষা মূলত মধ্যবাংলা (আনুমানিক ১৩শ শতাব্দীর ভাষারূপ), যেখানে সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশের প্রভাব থাকলেও ভাষাটি গ্রাম্য এবং কথ্য রীতির ঘনিষ্ঠ। এটি পদশৈলীতে রচিত, এবং এতে তৎসম শব্দ অপেক্ষাকৃত কম, তদ্ভব ও দেশজ শব্দ অধিক।
ছন্দরীতি অনিয়মিত, তবে প্রাক-চৈতন্য যুগের গান ও পালাগানের ধারা লক্ষণীয়। কিছু কিছু পদের অন্ত্যমিল ও অলংকার রচনাশৈলীতে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের পারস্পরিক প্রেম ও দেহগত সম্পর্কের বর্ণনায় যে বর্ণবৈচিত্র্য দেখা যায়, তা বাংলা সাহিত্যের পরবর্তী পদাবলী ধারার ভিত্তি রচনা করেছে।
কাব্যটি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচিত হলেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দও দেখা যায়। রচনাকাল সম্পর্কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৩৪০-১৪৪০ খ্রিষ্টাব্দ অনুমান করেছেন, আর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একে প্রাক-চৈতন্য যুগের সাহিত্যের সূচনাবিন্দু বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এই কাব্যের ভাষার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সাদৃশ্যও লক্ষ করেছেন।
বিষয়বস্তু ও ধর্মতত্ত্ব
এই কাব্যের মূল বিষয় কল্পিত রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা, কিন্তু তা শুধু ধর্মীয় নিষ্ঠার উপস্থাপন নয়—বরং দেহতত্ত্ব, লৌকিক সম্পর্ক, মান-অভিমান, যৌনতা ও কামনা-অকামনার দ্বন্দ্বময় রসায়নের (শৃঙ্গার রসের) প্রকাশ। রাধার মান, কৃষ্ণের অনুশোচনা, সখী ললিতার সংলাপ, গোপীদের সামাজিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক পরিসর গঠিত হয়েছে।
এই কাব্য রাধাকে একাধারে কামিনী, সাধিকা, পত্নী, প্রেমিকা, ভক্ত ও নারীবাদী প্রতিবাদের প্রতীকরূপে প্রতিষ্ঠা করে।
সাহিত্যিক গুরুত্ব
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মৌলিক কীর্তি, কারণ—
- এটি চৈতন্য-পূর্ব বাংলা ভাষার একটি প্রকৃত কাব্যিক নিদর্শন।
- এটি গীতিপদ, সংলাপ, এবং আখ্যানের মাধ্যমে নাটকীয় কাঠামো নির্মাণ করেছে।
- এতে একাধারে দেহতত্ত্ব, ভক্তিমার্গ ও লৌকিক সমাজজীবনের সমন্বয় ঘটেছে।
- এর ভাষা, বিষয়, রূপ ও ধ্বনিরীতি বাংলা পদাবলী সাহিত্যের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষত পরবর্তী যুগের পদকর্তা—বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, চণ্ডীদাস (চৈতন্য-পরবর্তী), জ্ঞানদাস প্রমুখ এই ধারারই রচয়িতা, যাদের কাব্যে রাধা-কৃষ্ণ প্রেমের যে কল্পিত দেহতাত্ত্বিক নাটকীয়তা দেখা যায়, তার উৎস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেই নিহিত।
পাঠ ও ব্যাখ্যা সংক্রান্ত সমস্যা
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে তার ভাষা ও ব্যাকরণে ব্যবহৃত প্রত্নধ্বনির অনিয়মিতা ও জটিলতা। অনেক শব্দই বর্তমানে অচল, বাক্য গঠনে অর্ধ-সংস্কৃত ধাঁচ, এবং উচ্চারণগতভাবে কিছু স্থানে স্পষ্টতা অনুপস্থিত। তাই এর পাঠ ও অনুবাদে গভীর পাণ্ডিত্য ও প্রাচীন বাংলা ভাষাজ্ঞান অপরিহার্য।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য তের খণ্ডে বিভক্ত –
১.জন্ম খণ্ড
২.তাম্বুল খণ্ড
৩.দান খণ্ড
৪. নৌকা খণ্ড
৫. ভার খণ্ড
৬.ছত্র খণ্ড
৭. বৃন্দাবন খণ্ড
৮. কালিয়দমন খণ্ড
৯. যমুনা খণ্ড
১০. হার খণ্ড
১১. বাণ খণ্ড
১২.বংশী খণ্ড
১৩.রাধা-বিরহ খণ্ড
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের একক কবির রচিত প্রথম আখ্যানধর্মী কাব্য হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাব্যটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ১৯১৬ সালে প্রথম প্রকাশ করে এবং মুখবন্ধ রচনা করেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। পুঁথিটি পাতলা তুলোট কাগজে, হালকা কালিতে, তিন ধরনের হস্তাক্ষরে লেখা। এই কাব্যের লিপিকর ছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পাণ্ডুলিপিটি সংগ্রহের জন্য দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরিবারকে ৫০ টাকা প্রদান করা হয়। এর পৃষ্ঠার সংখ্যা ৪৫২, এবং এতে মোট ৪১৮টি পদ রয়েছে যার মধ্যে ১৬১টি সংস্কৃত শ্লোক অন্তর্ভুক্ত।
কাব্যটির চরিত্রচিত্রণে অনন্যতা রয়েছে। প্রধান চরিত্র রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই। বড়াই একটি দূতি চরিত্র—তিনি একাধারে রসিক, কূটনৈতিক ও অনুভূতিপ্রবণ। বড়াই চরিত্রটি ‘বর্ণরত্নাকর’ কাব্যের কুটিনীর সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করেন ভাষাবিদ সুকুমার সেন। তিনি আরও মনে করেন যে এই কাব্যটি “নাটগীতি পাঞ্চালিকা” রীতিতে রচিত ও এটি পুতুলনাচের আসরে পরিবেশনের উপযোগী করে লেখা হয়েছে। কাব্যের ভাষায় ঝাড়খণ্ডি উপভাষার প্রভাব, বহু ব্রজবুলি শব্দের ব্যবহার এবং লোকগীতির লক্ষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘ঝুমুর’ গান, একতালা, যতি ও আঠতালা প্রভৃতি তালের উপস্থিতি এই কাব্যের সংগীতধর্মী বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ ৩২টি রাগরাগিণী ব্যবহৃত হয়েছে, যার মধ্যে পাহাড়িয়া রাগে সবচেয়ে বেশি পদ রচিত হয়েছে—৫৭টি। অন্যান্য রাগরাগিণীর মধ্যে গুর্জরী, পটমঞ্জরী, দেশাগ, মল্লার, কোড়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বস্ত্রহরণ খণ্ডে ব্যবহৃত রাগের সংখ্যা ১১টি। ‘ভিতে’, ‘বৌহারী’, ‘পুনম’, ‘জানিল’, ‘পুস্পযান’, ‘নাগকেশর’, ‘ঘোড়াচুল’ ইত্যাদি শব্দ ও প্রতীকের ব্যবহার একাধারে লোক-ঐতিহ্য ও পৌরাণিকতাকে মিশিয়ে একটি অভিনব আখ্যান নির্মাণ করেছে। কাব্যের ঘটনাকাল মোট আড়াই বছরব্যাপী।
এই কাব্যের আখ্যান মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও এতে ধর্ম, সমাজ ও দার্শনিকতার গভীর প্রভাব আছে। কৃষ্ণ এখানে পরমাত্মার প্রতীক এবং রাধা জীবাত্মার। বড়াই দূতির মাধ্যমে এই মিলন ঘটে। কাব্যের বিভিন্ন খণ্ডে পৌরাণিক চরিত্র যেমন মহাদেব, যুধিষ্ঠির, পাণ্ডু, অর্জুন, নারদের উপস্থিতি রয়েছে। কাব্যে রাধা কৈশোরে উপনীত হন তাম্বুল খণ্ডে, দান খণ্ডে তাঁর শরীরের প্রতিটি অঙ্গের মূল্য ২ কোটি মুদ্রা নির্ধারণ করা হয়। রাধার পিতা সাগর, জননী পদুমা এবং স্বামী অয়ান ঘোষ। শাশুড়ি জটিলা এবং শ্বশুর গোল। বড়াই ৩ বার কৃষ্ণের প্রেমবার্তা নিয়ে রাধার কাছে যান।
সমসাময়িক গবেষক যেমন সত্যব্রত দে, বিমলবিহারী মজুমদার, রমেশ বসু, নলীনীনাথ দাশগুপ্ত প্রমুখ এই কাব্য নিয়ে নানা আলোচনা করেছেন। কাব্যের প্রকৃত নাম “শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ” বলে মত দেন নলীনীনাথ দাশগুপ্ত ও সুখময় মুখোপাধ্যায়। বিমলবিহারী মজুমদার “রাধাবিরহ” খণ্ডকে প্রক্ষিপ্ত বলেন এবং কাব্যটিকে প্রায় pornography পর্যায়ে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন। ভাষাবিদ সত্যনারায়ণ দাস কাব্যের ভাষাকে সিংভূম অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
চণ্ডীদাসের কৃষ্ণকীর্তন কাব্য ভাষার দিক থেকে চর্যাপদের দশটি পদ পুনর্ব্যবহার করেছে এবং বৈষ্ণবতোষণী, গীতগোবিন্দ প্রভৃতির প্রভাব এ কাব্যে লক্ষ্যযোগ্য।
নীল জলদ সম কুন্তল ভারা
বেকত বিজুলী শোভে চম্পক মালা
শিশত শোভ এ তোর কাম সিন্দুর
প্রভাত সমএ যেন উয়িগেল মূর
ললাটে তিলক যেহ্ন নব শশিকলা
কুন্ডল মন্ডিত চারু শ্রবণ মুগলা
ক্ষাসা তিলফুল তোর অতী আনুপামা
গন্ডস্থল শোভিত কমলদল সমা
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কোনও ধর্মীয় গ্রন্থ নয় এবং এর সাথে কোনও ধরণের বৈষ্ণবধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। চরিত্রগুলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, কবি গীতগোবিন্দের কবির মতো কৃষ্ণের নাম ব্যবহারের সুযোগ নিয়েছেন।
প্রামাণ্য সূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
- বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ (সম্পা.): শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯১৬
- সুকুমার সেন: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি
- দীনেশচন্দ্র সেন: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, কলকাতা, ১৯২০
- ডেভিড লি: Bengali Literature in the Medieval Period, Harvard University Press
- Edward C. Dimock: The Place of the Hidden Moon: Erotic Mysticism in the Vaiṣṇava-Sahajiyā Cult of Bengal, University of Chicago Press
- Tony K. Stewart: The Final Word: The Caitanya Caritāmṛta and the Grammar of Religious Tradition, Oxford University Press, 2010
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী: Bharatiya Sahitya O Charyapada, ১৯২১
