হিন্দী ভাষার উৎস ও বঙ্গভাষার সহিত প্রাচীন ঐতিহাসিক সংযোগ

হিন্দী ভাষার উৎস ও বঙ্গভাষার সহিত প্রাচীন ঐতিহাসিক সংযোগ

শৌরসেনী প্রাকৃত হইতে ব্রজবুলি ও উর্দুর উদ্ভব পর্যন্ত হিন্দী ভাষার বিবর্তন ও তার বাঙালি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রভাব

হিন্দী ভাষার সহিত বঙ্গভাষার প্রাচীন সংযোগ এক সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার অন্তর্গত। হিন্দী বা হিন্দবী নামে যাহা আজ অভিহিত, তাহা আদিতে বৈদিক সংস্কৃতের এক প্রাকধারার উত্তরসূরি—শৌরসেনী প্রাকৃতশৌরসেনী অপভ্রংশ হইতে উৎসারিত। সপ্তম শতকে শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষার উদ্ভব ঘটে এবং এই ভাষার উপর ভিত্তি করিয়াই হিন্দী ভাষার গঠন আরম্ভ হয়। কবি আমীর খুসরো (১২৫৩ – ১৩২৫ খ্রি.) ‘হিন্দবী’ শব্দ ব্যবহার করিয়া এই ভাষাকে অভিহিত করেন। পারস্য সাহিত্যে ‘হিন্দ’ অর্থে সিন্ধু অঞ্চলের ভাষা হিন্দী নামে পরিচিত ছিল। মোঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে হিন্দী বা হিন্দবী রাজদরবারের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করিল।

সম্রাট ঔরঙ্গজেব স্বয়ং হিন্দবী ভাষায় বাক্যালাপ করিতেন। যদিও তিনি উর্দুর ব্যবহারকে অনুমোদন দেন নাই, তথাপি দিল্লী ও লখনউ অঞ্চলে সৈনিক শিবিরে প্রচলিত নিম্ন স্তরের এক ভাষা হিসাবে উর্দুর অস্তিত্ব ছিল—যাহা ‘লস্করী জবান’ নামে অভিহিত হইত। উর্দু শব্দের উৎপত্তি তুর্কি ভাষার ‘ওর্দু’ হইতে, যাহার অর্থ ‘সেনা’। গুলাম হামাদানী মুশাফি প্রায় ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘উর্দু’ শব্দটি ব্যবহৃত করেন।

শৌরসেনী প্রাকৃত, যাহা তৃতীয় শতাব্দীতে ভারতের প্রায় সমগ্র উত্তরাঞ্চলে প্রচলিত ছিল, সেই ভাষা যখন পারস্য শব্দভান্ডারের সহিত মিশ্রিত হইল (১৩০০-১৪০০ খ্রিঃ), তখন এক নবধর্মী ভাষার রূপায়ণ হইল—যাহা পরে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে ‘উর্দু’ নামে প্রসিদ্ধ হইল। পারস্য ভাষা কুতুবউদ্দিন আইবকের (১২০৭ খ্রিঃ) আমলে ভারতবর্ষের রাজভাষা হইয়াছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষাকে প্রশাসনিক সংযোগের মাধ্যমরূপে গ্রহণ করে এবং ইংরেজিকে উচ্চ স্তরের রেকর্ডপত্রে ব্যবহৃত করে। লর্ড ক্লাইভ, সিরাজউদ্দৌলার সহিত উর্দুতে কথা বলিতেন, উমিচাঁদ ও জগতশেঠের সহিত ইংরেজিতে। কোম্পানির অধিকাংশ উচ্চপদস্থ অফিসারদের দৃষ্টিতে নবাব সিরাজ অশিক্ষিত ও অসভ্য আচরণকারী বলিয়া বিবেচিত হইতেন, আর মীরজাফর অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত, মীরকাশিম ইংরেজি শিক্ষায় অভ্যস্ত ছিলেন। আজিও কলকাতার খ্রিষ্টান ইংরেজ পাদ্রিগণ তাঁহাদের পরিচারকদের সহিত উর্দু বা হিন্দীতে বাক্যালাপ করেন, অপরজনের সহিত ইংরেজিতে।

বিহার অঞ্চলে শৌরসেনী প্রাকৃত ভাষা মৈথিলী, ভোজপুরী প্রভৃতি আঞ্চলিক রূপ গ্রহণ করিয়াছিল। মহাকবি বিদ্যাপতি (জন্ম: ১৩৪০ খ্রিঃ) মৈথিলীতে পদাবলী সাহিত্যের বিপুল ভান্ডার নির্মাণ করিয়াছেন, যাহার প্রভাব চণ্ডীদাস (১৩৪২-১৩৯৯ খ্রি.) হইতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ভানুসিংহের পদাবলি) পর্যন্ত বিস্তৃত। বিদ্যাপতির লেখনীতে ব্যবহৃত ‘ব্রজবুলি’ এক কল্পিত কাব্যভাষা, যাহা কখনোই সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল না। এই ব্রজবুলি ও মথুরা অঞ্চলের ব্রজভাষা (ব্রজভাষা) সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রজভাষা অবলম্বনে রচিত হইয়াছে তুলসীদাসের বিনয়-পত্রিকা, সুরদাসের সুরসাগর, গুরু গোবিন্দ সিংহের দশম গ্রন্থ এর অংশবিশেষ। কাশ্মীর নিবাসী কেশব কাশ্মীরী ভট্টাচার্য, যিনি নবদ্বীপে প্রায় ১৫০৫ খ্রীষ্টাব্দে গৌরাঙ্গ (নিমাই) মিশ্রের সহিত শাস্ত্রার্থে পরাভূত হন, তিনিও হিন্দী ভাষার এক প্রসারক ছিলেন। অনুমান করা চলে যে, গৌরাঙ্গ ও কেশবের সেই শাস্ত্রার্থ হিন্দী ও সংস্কৃত ভাষায় অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। কেশবের রচিত কর্মদীপিকা হইতে বহু অংশ গ্রহণ করিয়া গৌড়ীয় হরিভক্তিবিলাস (শ্রীল গোপাল ভট্ট গোস্বামী/শ্রীল সনাতন গোস্বামী) সংকলিত হইয়াছে। কর্মদীপিকা মূলত নিম্বার্ক সম্প্রদায়ভুক্ত আচার্য্যদের আচারশাস্ত্র বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। জগন্নাথ মন্দিরের আচারে কেশবের এই কর্মদীপিকা সুস্পষ্ট প্রভাব বিস্তার করিয়াছে।

চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৮-১৫৩৪ খ্রি.), পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ‘কুহেলী বৈকুণ্ঠ’ নামক স্থানে বসিয়া গদাবরীর গভর্ণর (১৪৯৭ থেকে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ) রায়রামানন্দের (রামানন্দ পট্টনায়েক পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সভাপণ্ডিত) মুখে বিদ্যাপতির ব্রজবুলি পদ শুনিতেন। এই কাব্যভাষা তাঁহার ঈশ্বরচিন্তায় এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করিয়াছে। সম্ভবতঃ শ্ৰীল রামানন্দ (জগন্নাথবল্লভ নাটক কর্তা) উড়িয়া, হিন্দী, বাঙ্গালা, আরবী, পারসী, তামিল তেলেগু ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। বাঙ্গালীদের সহিত ঘনিষ্ট সংস্রব থাকার জন্য উড়িষ্যার অধিবাসীদের পক্ষে বাঙ্গালা ভাষা জ্ঞানও স্বাভাবিক। মাদল পঞ্জী অনুসাবে জানা যায় ১৫০৪ খ্রি. হইতে ১৫৩২ খ্রি. পৰ্য্যন্ত মহারজ প্ৰতাপরুদ্র উৎকলে রাজত্ব কবেন ।

হিন্দী ভাষা তৎসম শব্দভাণ্ডারে সমৃদ্ধ, তাহা প্রথামতে দেবনাগরী লিপিতে লিপিবদ্ধ হয়। আধুনিক হিন্দী সাহিত্যে গদ্যের সূচনাকার বলিয়া দেবকীনন্দন খত্রীর চন্দ্রকান্তা (১৮৮৮ খ্রিঃ) বিবেচিত হয়। ভাষাটির প্রসারে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, ভারতেন্দু হরিশচন্দ্র (১৮৫০ – ১৮৮৫ খ্রি.) প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

উর্দু ভাষা মুসলিম লীগ কর্তৃক গ্রহণযোগ্য হইলেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হিন্দী (দেবনাগরী লিপিতে) কে স্বীকৃতি দেয়। লিয়াকত আলী খান ১৯৩৯ খ্রিঃ সালে ঘোষণা করেন, “আমরা আরবী ত্যাগ করিয়াছি, তুর্কি ভাষা ত্যাগ করিয়াছি, এবং এক ভাষা গ্রহণ করিয়াছি যাহা এই দেশের ভিতরে সৃষ্টি হইয়াছে—এমন এক ভাষা যাহা বিশ্বের আর কোথাও কথ্য নহে। এখন আমাদেরকে বাল্মীকির ভাষা গ্রহণ করিতে বলা হইতেছে। আমরা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছি, আর এক পদ আমরা লইব না।” পাকিস্তানের পূর্বাংশ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে উর্দুকে প্রত্যাখ্যান করিয়া বাংলা ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেয়।

হিন্দী ভাষা, যাহা অপভ্রংশ ও শৌরসেনী প্রাকৃতের যোগে প্রাচীন রূপে বিকাশ পাইয়াছে, তাহা আজ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সরকারী ভাষা—ইংরেজির সহিত। কালিদাসের বিক্রমোর্বশীয়ম (विक्रमोर्वशीयम्) নাটকে অপভ্রংশের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। স্বয়ম্ভূদেব (৮ম শতক) অপভ্রংশে ঋত্থনেমিচরিয়ু, পৌমচরিয়ু প্রভৃতি মহাকাব্য রচনা করেন। মুলতানি কবি আব্দুর রহমান বা আদ্ধমান (১২শ শতক), অপভ্রংশে সন্দেশরাসক নামে এক প্রেমোপাখ্যান রচনা করেন। এইভাবে, হিন্দী ভাষার ধারা বঙ্গীয় সাহিত্যে এক পরোক্ষ অথচ সুগভীর প্রভাব বিস্তার করিয়াছে—বিশেষত বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, চৈতন্য, এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে।


বিদ্যাপতি (ব্রজবুলি)

শুন-শুন সুন্দর কানহাই। তোহি সোঁপলি ধনি রাই॥
কমলিনি কোমল কলেবর। তুহু সে ভূখল মধুকর॥

সহজ করহ মধু পান। ভুলহ জনি পঁচবান॥
পরবোধি পয়োধর পরসহ। মধুকর জইসে সরোরুহ॥

গনইত মুক্তিম হারা। ছলে পরসব কুচ ভারা॥
ন বুঝএ রতি-রস-রঙ। খন অনুমতি খন ভঙ॥

সরিস-কুসুম সম তনু। থোরি সহব ফুল-ধনু॥
বিদ্যাপতি কবি গাব। দূতিক মিনতি তুয় পাব॥

সোমবার, ৩০ জুন, ২০২৫

Read Next Part:

সংস্কৃত হইতে প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্ট ভাষাসমূহের রূপান্তর


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল