উৎপত্তি, নীরবতা ও সাহসের প্রথম অধ্যায়
ত্রিশের দশকের আগের বাঙালি সিনেমার ইতিহাস মানে এক রকম নীরব ধ্বনি—যার মধ্যে আলো, ছায়া, ভঙ্গি আর অভিব্যক্তি দিয়ে লেখা এক আশ্চর্য ভাষা। তখনো ‘ডায়ালগ’ নামে কিছু ছিল না পর্দায়, অথচ মানুষের মনের কথা বোঝানো হতো চোখের চাউনি, হাতের ভঙ্গি, আর ক্যামেরার নীরব গতি দিয়ে। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। সিনেমা ছিল এক নবীন শিল্প—তবে তাতে যে প্রাণ ছিল না, এমন বলা যাবে না।
হীরালাল সেন ছিলেন ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালক (রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি) এবং চিত্রগ্রাহক। হীরালাল সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬৮ সালের ১২ আগস্ট, ঢাকা জেলার (বর্তমান বাংলাদেশের) বগুড়া জেলার ভাগিনীরপাড়ায় (1)। পরে তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে পড়াশোনা করেন, এবং সেখানেই পাশ্চাত্য থিয়েটার ও আলোকচিত্রের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ১৯১৭ সালে আগুনে পুড়ে যায় হীরালাল সেন-এর সংগ্রহে থাকা সমস্ত চলচ্চিত্র—প্রায় ৪০টিরও বেশি কাজ চিরতরে হারিয়ে যায়। তাঁর প্রায় সমস্ত কাজ আজ নিখোঁজ, শুধুমাত্র লিখিত নথি এবং ইতিহাসবিদদের বর্ণনার মাধ্যমে আমরা তাঁর অবদান জানতে পারি।
১৯১৭ সালে হীরালাল সেনের প্রয়াণের পর বাংলা সিনেমার ভিত তৈরি করলেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর বিল্বমঙ্গল (১৯১৯)—যেটি অনেকেই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা ন্যারেটিভ সিনেমা বলে মানেন—সেই সময়ে এক দুঃসাহসিক কাজ। পুরাণের কাহিনি নিয়ে তৈরি, সেটাও আবার নিঃশব্দ সিনেমা! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভাবলে মনে হয় সহজ, কিন্তু তখনকার দিনে ছবি বানানো মানে ছিল সাহসিকতার সঙ্গে কল্পনারও পরিপূর্ণ পরীক্ষা।
এরপর এলো জামাই ষষ্ঠী (১৯৩১)—যেটি বাংলা ভাষায় প্রথম সবাক ছবি। তবে তার আগে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় জুড়ে যে নীরব ছবির অধ্যায়—তা উপেক্ষা করার নয়। ধীরেন্দ্রনাথের আলীবাবা (১৯২৭), কপালকুণ্ডলা (১৯২৯)—এসব ছবি ভারতীয় সাহিত্যের কাহিনিকে সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরার প্রথম প্রয়াস।
এই সময়কার সিনেমার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল থিয়েটারপ্রধানতা (2)। অভিনেতারা থিয়েটারের লোক, অঙ্গভঙ্গি, মেকআপ সবটাই যেন মঞ্চের রীতিতেই গড়া। ক্যামেরাও প্রায় স্থির, কাটিং-এর ছাঁট ছিল কম, তবে অনুভবের গভীরতা ছিল প্রবল। এই পর্বেই ধীরে ধীরে উঠে আসতে থাকে ছবি নির্মাণের কারিগরি দিকগুলি—এডিটিং, লাইটিং, আর্ট ডিরেকশন—যেগুলো পরে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালদের যুগে রীতিমতো শিল্পে পরিণত হয়।
এখনকার প্রজন্মের কাছে হয়তো এ ছবি গুলো ‘বোরিং’—কিন্তু যদি আমরা এ ইতিহাস না বুঝি, তা হলে বর্তমানকে বোঝার পরিপূর্ণ চাবিকাঠি হারিয়ে ফেলব। সিনেমা মানে তো শুধু বিনোদন নয়, তা একটি সময়ের আত্মপরিচয়ের দর্পণও।
ত্রিশের আগে বাংলা সিনেমা ছিল নীরব, কিন্তু তার নীরবতা এক গভীর ভাষা বয়ে নিয়ে এসেছে—যেখানে গল্প, চরিত্র আর সমাজের প্রতিচ্ছবি ধরা পড়েছে এক অন্যতরভাবে। এই প্রাথমিক অধ্যায় না থাকলে, ‘পথের পাঁচালী’ আসত না, উত্তম-সুচিত্রার রসায়ন জন্মাত না, এমনকি আজকের আধুনিক ছবিও হয়তো হতো না এই রকম।
তাই, বাংলা সিনেমার এই প্রথম অধ্যায় আমাদের গর্ব, আমাদের উত্তরাধিকার।
গ্রন্থ-পঞ্জী
(1) ঘরের কথা ও মুগসাহিত্য – দীনেশচন্দ্র সেন (1963)
(2) বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস – কে. মুখোপাধ্যায়
3rd May 2025
