শ্রীল ভক্তি বেদান্ত ত্রিবিক্রম মহারাজ ও তাঁহার ধর্মদর্শন

শ্রীল ভক্তি বেদান্ত ত্রিবিক্রম মহারাজ ও তাঁহার ধর্মদর্শন

নবদ্বীপ গৌড়ীয় আন্দোলনের উত্তরাধিকার, শুদ্ধ বৈষ্ণব ভাবধারার এক মহামানব চরিত

বাংলা ও মথুরা অঞ্চলের আধুনিক গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন মূলতঃ উনবিংশ শতকের শেষার্ধে এক অন্ধকার অধ্যায়ে পতিত হইয়াছিল। সেই সময়ে তথাকথিত বৈষ্ণব সমাজ বিবেকহীন, আচারহীন, আধ্যাত্মিকতাশূন্য ও সামাজিকভাবে উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়। বিপরীতে, বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু ধর্মের নামে এক সর্বদা “সবই ভালো” ধ্যানধারণা প্রচার করিতে লাগিল।

স্বামী বিবেকানন্দ, যিনি গদাধর চট্টোপাধ্যায়কে অবতাররূপে স্থাপন করিয়াছিলেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্বভাবতন্ত্র, তত্ত্বজ্ঞান ও প্রেমভক্তিকে পরোক্ষভাবে গ্রাস করিবার পথ রচনা করেন। শ্রীচৈতন্যদেবের প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব ও আচারানুশীলনের শুদ্ধ প্রতিষ্ঠা ও নবজাগরণের যজ্ঞযজ্ঞেশ্বর রূপে শ্রীমদ্‌ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদ উনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম লগ্নে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে আত্মপ্রকাশ করেন। এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর (1874 -1937) বাগবাজার মঠ হইতে এক নব আধ্যাত্মিক বিপ্লব সূচনা করেন।

গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বাংলার ইতিহাসে এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রবাহ, যাহা ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তভাগে প্রায় নিঃশেষিতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছায়। এ সময়ে শ্রীল সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভৃতি মঠাধিষ্ঠ গুরুজনেরা তদ্বিষয়ে এক মৌলিক ও দিগদর্শী বিপ্লব সাধন করেন। শাস্ত্রপাণ্ডিত্য, কঠোর শৃঙ্খলা, বহুভাষাজ্ঞান এবং নবদ্বীপীয় সংস্কৃতির বিশুদ্ধ পুনরোত্থান তাঁহার বৈষ্ণব প্রচারের মূল স্তম্ভ ছিল। কলকাতার বাগবাজারে প্রতিষ্ঠিত তাঁহার গৌড়ীয় মঠ হইতে আরম্ভ হয় এই নবজাগরণ, যাহা ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও মথুরা অঞ্চলে বিস্তৃত হইয়া পরে।

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ছিলেন এক বহুভাষাবিদ, তাঁহার পাণ্ডিত্য এতই প্রখর ছিল যে তিনি একসাথে ছয়জনকে ছয় ভাষায় অনুবাদ ও শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিতে পারিতেন। তিনি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করিতেন, যিনি কলেজ স্তরের শিক্ষায় শিক্ষিত; কারণ তিনি চাহিতেন শাস্ত্র ও সাধনার এক যুক্তিনির্ভর সংযুক্তি। শ্রীল নারোত্তম দাস ঠাকুরের কীর্তনপদ্ধতি, গৌড়ীয় বিশুদ্ধ খাদ্যাচার এবং নবদ্বীপীয় ঐতিহ্যবাহী বৈষ্ণব রীতি তাঁহার মাধ্যমে পুনরায় জনজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্রীরূপ সিদ্ধান্তী মহারাজ (ভারতী মহারাজ দ্বারা শিক্ষিত) এক দিবস রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীসমাজের সম্মুখে এক প্রত্যক্ষ যুক্তিসিদ্ধ প্রশ্ন উত্থাপন করেন—

‘আপনারা কি আদৌ ধর্মীয় সংগঠন, না কি সমাজসেবাপ্রধান এক প্রতিষ্ঠান?’

উত্তরে, রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীবৃন্দ অকপটে স্বীকার করেন যে—তাঁরা আদতে ধর্মীয় সংগঠন নন; বরং সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান মাত্র, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সেবায় নিয়োজিত।

এই বক্তব্যেই প্রতীয়মান হয় যে, সেই মিশনের কার্যপ্রকৃতি মূলত সমাজসেবা-নির্ভর, আধ্যাত্মিকতাপূর্ব নয়। কৌতুক করে ইহা জানার পর শ্রীভক্তিসিদ্ধান্ত সারস্বতী আনন্দিত হন এবং অন্তর হইতে শ্রীরূপ সিদ্ধান্তীকে আশীর্বাদ প্রদান করেন অর্থপূর্ণ শাস্ত্রার্থে লিপ্ত হইবার জন্য।

তাঁহার মহাপ্রভাবিত শিষ্যবর্গের অন্যতম ছিলেন ভক্তিপ্রজ্ঞ কেশব গোস্বামী মহারাজ (1898 – 1968), যিনি বর্ধমান ও মেদিনীপুর অঞ্চলে প্রচারকর্মে নিযুক্ত ছিলেন এবং কঠোর শৃঙ্খলা ও সংগঠন পরিচালনার মাধ্যমে এক সুসংবদ্ধ মঠ সংস্কৃতি গড়িয়া তোলেন। ভক্তিবেদান্ত ত্রিবিক্রম, এই কেশব মহারাজেরই প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে এবং ভক্তিকমল মধুসূদন মহারাজের (১৯৮৮ সালে বর্ধমানের মিঠাপুকুর মঠে মৃত্যুবরণ করেন) ভাগবত পাঠের মাধ্যমে আত্মিক ও শাস্ত্রজ্ঞান লাভ করেন।

ত্রিবিক্রম মহারাজ (1916-2002) ছিলেন গৌড়ীয় বেদান্ত সমিতির (নবদ্বীপ) দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্ন্যাসী ও প্রধান প্রশাসক। তিনি নিজে কখনো দীক্ষা প্রদান কারেন নাই, কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে গৌড়ীয় দর্শনের ‘রাগানুগা মার্গ’, জীব গোস্বামীর ‘ষট্-সন্দর্ভ’ এবং বলদেব বিদ্যাভূষণ ও বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর বেদান্ত ব্যাখ্যার গভীরতম ধারা তাঁহার চিন্তন ও বক্তৃতায় প্রকাশ পায়। তিনি কেবলমাত্র গৌড়ীয় পরম্পরার নয়, বরং শঙ্কর, মধুসূদন সরস্বতী, শ্রীরামানন্দ, শ্রীরাধা-মাধব রসতত্ত্ব এবং ভাগবতের পরম বেদান্ত দর্শনের এক অদ্বিতীয় ব্যাখ্যাতা ছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন — রাধার কোনও স্বতন্ত্র সত্তা নাই; তিনি কেবলমাত্র ‘মহাভাব’রূপিণী, চৈতন্য মহাপ্রভুর হৃদয়ের আত্মিক অভিব্যক্তি মাত্র। ‘রাধা, কৃষ্ণের উপরে’ — এই প্রকার বিকৃত মতবাদকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

চৈতন্য মহাপ্রভু নিজ মহাভাবরূপে প্রেমতত্ত্বের এমন এক ধাপে উপনীত হন, যাহা শঙ্করাচার্যের ব্রহ্মানন্দ, জ্ঞানদেবের অপরোক্ষানুভূতি, পঞ্চরাত্রের চতুর্ব্যূহ তত্ত্ব ও উপনিষদের “রসো বৈ সঃ”—এই সকল দর্শনের চূড়ান্ত সমন্বয়। জীব গোস্বামীর ষট্‌সন্দর্ভই এই তত্ত্বসমূহকে চৈতন্য দর্শনের আলোকে একটি সংহত ও যুক্তিবদ্ধ ভিত্তি প্রদান করে। ত্রিবিক্রম মহারাজের জ্ঞানের গভীরতা ও প্রাঞ্জলতা এমন ছিল যে, তাঁহার নাম কেবলমাত্র সিদ্ধান্ত সরস্বতী ও ভারতী মহারাজের সমান্তরালভাবে স্মরণীয়। তাঁহার ভাগবত পাঠ মধুসূদন সরস্বতী, শ্রিধর স্বামী ও শ্রীনিবাস আচার্যের পরম্পরা মেনে চলে।

ভক্তিনারায়ণ মহারাজ (পূর্বতন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর) রাধার স্বতন্ত্রতা প্রচার করিয়া গৌড়ীয় রসতত্ত্বে যে এক নব্য আবেগতাড়িত, বিকারগ্রস্ত ভাবধারার সঞ্চার করিলেন, তাহা ত্রিবিক্রম নির্ভয়ে নিন্দা করেন। নারায়ণ মহারাজ কেশব মহারাজের নিকট হইতে দীক্ষা লইয়া পরবর্তীতে মথুরা অঞ্চলে হিন্দিভাষী এক পৃথক সাম্প্রদায়িক ধারা স্থাপন করেন। তিনি এক কাল্পনিক ‘স্বাধীন রাধা’ ভাবনার প্রচার শুরু করেন, যাহাতে রাধা, কৃষ্ণের ঊর্ধ্বে প্রতিপন্ন হন এবং কৃষ্ণ যেন রাধার অধীন—এই ধারণা প্রচারিত হয়। এই ভ্রান্ত ও অনুভূতিনির্ভর তত্ত্ববিকৃতি, গুরু ভাই ত্রিবিক্রম মহারাজ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বারংবার তাঁহাকে সতর্ক করেন। তিনি বারংবার সতর্ক করেন যে, এই ধারা গৌড়ীয় দর্শনের মূল তত্ত্ব ‘অচিন্ত্য ভেদাভেদ’–এর পরিপন্থী। ভাগবতে রাধার নাম না থাকাই প্রমাণ করে, তিনি কেবলমাত্র কৃষ্ণভক্তির এক পরাকাষ্ঠা, স্বতন্ত্র কোনো দেবী নন।

ত্রিবিক্রম মহারাজ নিজ শরীরের বল, কণ্ঠের গাম্ভীর্য এবং অনুপম শাস্ত্রবিশ্লেষণশক্তির মাধ্যমে গৌড়ীয় দর্শনকে পুনরায় উচ্চতর স্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁহার পঠনপাঠন ও উপদেশ ছিল ‘যুক্তাহারবিহারস্য, যুক্তচেষ্টস্য…যোগো ভবতি দুঃখহা’ এই শ্লোকানুগত। অর্থাৎ, সংযম, শৃঙ্খলা ও নির্লিপ্ত কর্মই কৃষ্ণভক্তির প্রকৃত পথ। গৌড়ীয় বৈষ্ণবতত্ত্বে ‘রাধা’ ও ‘মহাভাব’ শব্দযুগল কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, গভীরতম মেটাফিজিক্স ও রসতত্ত্বের প্রতীক। বহু ভাবুক ও সাধক এই দুই ধারণাকে বিভ্রান্তভাবে ব্যাখ্যা করিতে গিয়া দর্শনের পথে হঠাৎ আবেগ প্রবাহিত করিয়া ফেলিয়াছেন। পক্ষান্তরে, শ্রীল রূপ গোস্বামী, জীব গোস্বামী এবং সর্বোপরি, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু নিজে ‘মহাভাব’ রূপে যে রাধাতত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়া গিয়াছেন, তাহাই আলোচনার আধার।

যখন ব্রহ্ম-চৈতন্য জাগতিক দেহ ও পার্থিব চেতনাকে অধিকার করেন, তখনই মহাভাবের এক ঝলক প্রতিভাত হয়; ইহা কেবল দেহসঞ্চালিত সাধন নয়, বরং অধিযৌগিক চেতনার একান্ত আত্মআবিষ্ট অবস্থা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু একবার মহাপণ্ডিত বৈদান্তিক রায় রামানন্দকে ভক্তি, বেদান্ত ও মহাভাবের বিভিন্ন স্তরসমূহ বিশ্লেষণে আহ্বান করিলে, রামানন্দ যখন এক একটি স্তর উপস্থাপন করেন, মহাপ্রভু তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া তাঁহাকে ক্রমাগত গভীরতর সাধনসার উদ্ধারের প্রেরণা জোগান। অবশেষে রামানন্দ যখন মহাভাবের সীমান্তে উপনীত হন, চৈতন্য মহাপ্রভু তাহাকেই এক যোগীর ‘পরাকাষ্ঠা’ রূপে স্বীকৃতি প্রদান করেন। প্রাথমিক যোগীদের জন্য, যেমন শাস্ত্রে বলা হয়েছে—”জীবের স্বরূপ হইল কৃষ্ণের নিত্য দাস, কৃষ্ণের তটস্থ শক্তি, ভেদাভেদ প্রকাশ”—এই Epistemic তত্ত্বই প্রাসঙ্গিক পথ। ত্রিবিক্রম মহারাজ এই ভাবনার ধারায় শ্রোতাদের কাছে নিয়মশৃঙ্খলার মাধ্যমে প্রকৃত বৈষ্ণব জীবনবোধে স্থাপন করিবার প্রচেষ্টা করিতেন।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে এক ‘ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা’, যিনি ‘ন শোচতি, ন কাঙ্ক্ষতি’– এই গীতার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব প্রতিপালন করিয়া সমাজে নিঃস্বার্থভাবে ধর্ম প্রচার করিয়াছেন। ত্রিবিক্রম মহারাজ কখনো নিজে দীক্ষা প্রদান করেন নাই, তিনি কখনও পূজ্যপদ গুরু হইতে চাননি, তিনি কেবলমাত্র উপদেশ ও শাস্ত্রানুবর্তিতা বজায় রাখিয়াছেন।

ভক্তিবেদান্ত ত্রিবিক্রম মহারাজ কোনো স্বকীয় প্রচারে যুক্ত না হইয়াও, তাঁহার অতুলনীয় শাস্ত্রজ্ঞানে, গভীর আধ্যাত্মিকতায় ও বৈষ্ণব শৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মকে এক নিঃশব্দ অথচ সুগভীর ভিত্তি দান করেন।  তাঁহার জীবন ছিল নিঃশব্দ অথচ গম্ভীর। তিনি ছিলেন প্রকৃত ‘ব্রহ্মভূতঃ প্রাসন্নাত্মা’, শ্রীগীতার “ন শোচতি, ন কাঙ্ক্ষতি” বাণীর প্রকৃত জীবনায়ন।

ত্রিবিক্রম ছিলেন এক বীর্যবান ব্যক্তিত্ব, সপ্রতিভ কণ্ঠ, সুসংহত চিন্তা ও বৈষ্ণব-শৃঙ্খলার কঠোরতম ধারক। তিনি ইস্কনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল অভয়চরণ ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদের আহ্বান সত্ত্বেও ইস্কনের সহপ্রচারক হইতে অস্বীকৃতি জানান। অপরদিকে, নারায়ণ মহারাজ ইস্কনের বহু কার্যক্রমে সহায়তা করেন ও পরবর্তীকালে নিজস্ব সংপ্রদায়ও প্রতিষ্ঠা করেন।

ত্রিবিক্রম মহারাজের উপদেশ হইত—

“যুক্তাহার-বিহারস্য, যুক্তচেষ্টস্য, যুক্তস্বপ্নাবোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা”। অর্থাৎ, আত্মসংযম, তপস্যা ও শাস্ত্রানুবর্তিতা দ্বারাই কৃষ্ণতত্ত্ব উপলব্ধি সম্ভব।

শ্রীল জীব গোস্বামী গোপাল-চম্পু ও ভক্তি-সন্দর্ভ-তে ব্যাখ্যা করেন:

“রাধিকা হ্লাদিনী শক্তির পরাকাষ্ঠা, বা সর্বোচ্চ বিকাশ। কৃষ্ণের স্বরূপ-শক্তিরই প্রেমরূপী বিকার।”

এখানে রাধা কোন ব্যক্তিসত্তা নন, তিনি স্বরূপ-শক্তির ‘হ্লাদিনী বিকাশ’ (আনন্দতত্ত্বের প্রাকাশ্য)। তিনিই প্রেমের নির্যাস। কিন্তু ইহা কখনোই ontological বিচ্ছিন্নতা নির্দেশ করে না—রাধা ও কৃষ্ণ ‘অভিন্ন তত্ত্ব’।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাধা প্রেমরস অনুধাবনের জন্য ‘রাধা-ভাব-কান্তি’ গ্রহণ করেন। রূপ গোস্বামী বলেন:

“রাধা-ভাব-দ্যুতি-সুবলিতং নৌমি কৃষ্ণ-স্বরূপম্”

এই ‘রাধা-ভাব-দ্যুতি’ই হইতেছে ‘মহাভাব’—যা অভ্যন্তরীণ প্রেম, যাহা স্বরূপ-শক্তির চূড়ান্ত অবস্থা। মহাভাব কোন ব্যক্তিসত্তা নয়, তাহা এক তত্ত্বাবস্থা। ইহার ব্যতিক্রম ব্যাখ্যা হইলে শুদ্ধ গৌড়ীয় দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। “মহাভাবঃ স্বভাবস্য, অতিশয়িতা”।

ভক্তিতত্ত্বে এই বাণীই চূড়ান্ত: “মদ্ভক্তানাম্চ তত্বজ্ঞানং, মৎপ্রসাদে ভবিষ্যতি”

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন মূলত তিন স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত—তত্ত্ব (ontology), রস (aesthetics), এবং সাধন (practice)জীব গোস্বামী (১৫৩৩–১৬০৮) এই দর্শনের শাস্ত্রীয় কাঠামো নির্মাণ করেন ষড়দর্শনের যুক্তিভিত্তিতে, যাহা “ষট্‌-সন্দর্ভ”-এর মধ্যদিয়ে প্রকাশিত। শ্রীজীব গৌড়ীয় তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করিয়াছেন ‘ষট্‌-সন্দর্ভ’ গ্রন্থসমূহে—তত্ত্ব, ভাব, সংভব, কৃষ্ণ, ভক্তি, এবং প্রীতি। তিনি কৃষ্ণকেই স্বয়ং ভগবানরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়া বলেন:

“একঃ কৃষ্ণঃ স্বয়ং ভগবান্”— (কৃষ্ণ-সন্দর্ভ)

তাঁর মতে, রাধা ও কৃষ্ণ অভিন্ন তত্ত্ব, রাধা হ্লাদিনীর পরাকাষ্ঠা। রাধা নিজে কোন ব্যক্তিসত্তা নন, বরং কৃষ্ণরসের প্রকাশ্য প্রেম-রূপ। জীব গোস্বামী দর্শন রচনায় নির্ভর করেন ন্যায়, মীমাংসা ও বৈদান্তিক যুক্তির উপরে। তিনি ব্যাপকভাবে অনুমান, উপমান, ও আগম প্রমাণ ব্যবহার করেন।

“তদ্ভিন্না যাথার্থ্যনিষ্ঠা ন সঙ্গচ্ছতে” — অর্থাৎ কৃষ্ণতত্ত্ব ব্যতীত সমস্ত যুক্তি-তত্ত্ব অবৈধ।

বিষয়শ্রীজীব গোস্বামীশ্রীল ত্রিবিক্রম মহারাজ
সময়কাল১৬শ শতক (গোস্বামী যুগ) ২০শ শতক (গৌড়ীয় সংরক্ষণ যুগ)
ধারাদর্শনশাস্ত্র, প্রমাণ, যুক্তি প্রেমভক্তি, ভাষণ ও প্রচার
দর্শনের পন্থানির্ভুল গ্রন্থরচনা স্পষ্ট বক্তৃতা ও যুক্তিময় বিতর্ক
রাধাতত্ত্বঅহ্লাদিনী শক্তির বিকাশমহাভাবই রাধার প্রকৃতি, আলাদা দেবী নয়
প্রতিপক্ষ দর্শনমায়াবাদ, ব্যক্তিবাদ সহজিয়া, নব্যরাধাবাদ, নারীবাদীয় কৃষ্ণ-নিন্দা
অবস্থানগৌড়ীয় দর্শনের ভিত্তিস্থাপক  গৌড়ীয় দর্শনের প্রহরী

ঋগ্বেদের  “তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ”

—এই মন্ত্রে ‘বিষ্ণোঃ পরমং পদং’ বলতে সেই চরমতম চেতনাবাদী অবস্থার কথা বলা হয়েছে, যাহা সদা সূরয়ঃ অর্থাৎ ঋষি-যোগিগণ (আত্মারামশ্চ মুনায়ো) প্রত্যক্ষ করেন। বৈষ্ণব দর্শনে ইহা ‘পরমপদ’ নামে অভিহিত, যাহা কৃষ্ণতত্ত্বে হ্লাদিনী শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হ্লাদিনী শক্তি হইল স্বয়ং ভগবানের আন্তঃস্থ মহাশক্তি, যাহা আনন্দ, প্রেম ও চৈতন্যের পরাকাষ্ঠারূপ।

শ্রীজীব গোস্বামী তাঁর  ভাগবত সন্দর্ভ ও প্রীতি সন্দর্ভ-তে এই হ্লাদিনী শক্তিকে চৈতন্যের মূলস্বরূপরূপে নির্ণয় করেন। হ্লাদিনী ব্রহ্মজ্ঞান নয়, সেই পরম কৃষ্ণচৈতন্যের স্বরূপবিজ্ঞান, যাহা শ্রীমদ্ভাগবতে প্রকাশ পায় ‘আনন্দময়ো অভ্যাসাত্‌’ রূপে। এই হ্লাদিনীই পরমপদ, কারণ ইহা কৃষ্ণের আত্মস্বরূপ মহাভাব-রস-আনন্দময় উপলব্ধির শুদ্ধতম প্রতিফলন।

জীব গোস্বামী নির্মাণ করিয়াছেন গৌড়ীয় দর্শনের স্বর্ণমন্দির; আর ত্রিবিক্রম মহারাজ রক্ষা করিয়াছেন সেই মন্দিরের দরজা, যাতে কেহ ‘মহাভাব’কে রাধার থেকে পৃথক কিংবা রাধাকে কৃষ্ণের উপরে প্রতিপন্ন করিয়া প্রবেশ করিতে না পারে।

তাঁহারা উভয়ে একতত্ত্বের দুই রূপ—

একজন ‘শাস্ত্র’, অন্যজন ‘সংঘর্ষ’।
একজন ‘প্রমাণ’, অন্যজন ‘প্রতিরোধ’।

তবে উভয়েই ছিলেন ভগবৎপ্রেমের সারভূমিতে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র নিত্যসিদ্ধ বৈষ্ণব।

তাঁহার জীবনই প্রমাণ করে, চৈতন্য দর্শন কোনো আবেগ বা কল্পনা নহে, বরং এক সুসংহত, শাস্ত্রসম্মত, গুরুপরম্পরায় রক্ষিত বেদান্ততত্ত্ব—যাহার নির্ভীক বাহক ছিলেন শ্রীল ভক্তিবেদান্ত ত্রিবিক্রম। তিনি ১৯৯৪ সালে পুরীমঠে ও পরে চুঁচুড়ামঠে একমাত্র একজন ব্যক্তিকে প্রবলভাবে শিক্ষিত করিয়া যাবতীয় শিক্ষা ও দর্শন সমর্পণ করেন। এই ব্যক্তি আজও তাঁহার মৌন শিষ্যত্ব বহন করিতেছেন, যদিও কোনো দীক্ষা অনুষ্ঠান ঘটে নাই।

1st May 2025


 

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল