রাজা কংসনারায়ণ (১৫৮০ খ্রি)

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

রাজশাহীর তাহিরপুর অঞ্চলের রাজা কংসনারায়ণ ছিলেন বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত এক ঐতিহাসিক পুরুষ, যিনি শুধু তাহিরপুরেই রাজত্ব করেননি, পরে গৌড়ের সম্রাট হিসাবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বংশধারা মৌনভট্ট ও ভট্টনারায়ণ থেকে আসা বলে কথিত, এবং মুঘল প্রশাসকের মধ্যে অর্থমন্ত্রী টোডরমল তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়ে বঙ্গ ও বিহারের দেওয়ান নিযুক্ত করেন। কংসনারায়ণের দুই পুত্র ছিলেন—মুকুন্দরাম রায় ও নরেন্দ্রনারায়ণ রায়।

হিন্দু সমাজ সংস্কারে কংসনারায়ণের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তখনকার ব্রাহ্মণ সমাজে দুটি শাখা ছিল—কুলীন ও শৌত্রিয়। শৌত্রিয় বলতে বোঝাত বৈদিক ব্রাহ্মণদের, যাঁরা শ্রীহট্ট অঞ্চলে বাস করতেন ও বৈদিক শাস্ত্রচর্চায় পারদর্শী ছিলেন। অপরদিকে, কুলীন পদবী সৃষ্টি করেন আদিশূর, শৌত্রিয় ব্রাহ্মণদের মর্যাদা খর্ব করার উদ্দেশ্যে। এই বিভাজনের ফলে সমাজে বিভ্রান্তি ও সংকট দেখা দেয়। কংসনারায়ণ বুঝতে পারেন যে কুলীন ব্রাহ্মণদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে শৌত্রিয়দের সঙ্গে রক্তসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে। তিনি কুলীন ও শৌত্রিয়দের মধ্যে আন্তর্বিবাহের পথ খুলে দেন এবং এইভাবে সমাজে নতুন ধারার সূচনা করেন।

১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে শরৎকালে তিনি প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। এই পূজার পেছনে তিনি নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করেন—যা সেই সময়ে বিপুল অর্থ। এই পূজার মাধ্যমে বাংলা দুর্গোৎসবের একটি নতুন রূপ নেয়। প্রতিমায় দুর্গার মুখ ছিল বাঙালি নারীর মতো, এবং তিনি পরে ছিলেন সুতানুটির বোনা বিখ্যাত হলুদ শাড়ি। আজকের দুর্গাপূজার চেহারা, অলংকরণ ও সামাজিক অবয়ব অনেকটাই তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে।

প্রভাত রঞ্জন (বাংলা ও বাঙালী) সরকার লিখেছেন, কংসনারায়ণ রাজসূয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শৌত্রিয় পণ্ডিতেরা বলেন, কলিযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্ভব নয়। তাঁরা তাঁকে মার্কণ্ডেয় পুরাণে বর্ণিত দেবী দুর্গার পূজা করতে বলেন, যাতে রাজসূয় যজ্ঞের সব আচার ও প্রতীক অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই উপদেশ অনুযায়ী কংসনারায়ণ দুর্গাপূজা শুরু করেন, যা একাধারে রাজকীয়, বৈদিক ও সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল বারনই নদীর পূর্ব তীরে রামরামা গ্রামের দুর্গামন্দিরে। বর্তমানে রাজশাহীর তাহেরপুরে যে দুর্গামন্দিরটি রয়েছে, তা কংসনারায়ণই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই পূজার মাধ্যমে তিনি বৈদিক সমাজের সব অংশ—অগ্রজ, অন্ত্যজ, পতিত, পতিতা, এমনকি চণ্ডালদেরও সমাজে মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এই পূজার আচার-অনুষ্ঠানে এমনভাবেই সব শ্রেণি-সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়, যাতে রাজসূয় যজ্ঞের উদার, মানবিক আদর্শ বজায় থাকে।

কংসনারায়ণ রায় দুর্গাপূজার যে নতুন রীতি শুরু করেন, তা শুধু আড়ম্বরপূর্ণ নয়, ছিল গভীর অর্থবহ এবং বহুমাত্রিক। তিনি দেবীর প্রতিমার পেছনের পর্দা হিসেবে ব্যবহার করেন গাঢ় নীল রঙের বাঙলাছালি কাপড়—যা পরে একপ্রকার রীতি হয়ে যায়। তাঁর দুর্গা একা নন—তাঁর সঙ্গে স্থাপন করা হয় লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে, যেমনটি দেখা যায় দুর্গা সপ্তশতীতে। কার্তিক স্থাপিত হন বৈদিক তত্ত্বের (दैवत्व) নেতৃত্ব রূপে, আর গণেশের মাধ্যমে তিনি সমাজের সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরেন।

প্রতিমার সঙ্গে প্রাণীর মূর্তি বা প্রতীক স্থাপন করে তিনি পশুজগৎকে স্থান দেন, আর কলাবউ (কলাগাছের প্রতীক দেবী) রূপে উদ্ভিদজগতের প্রতিনিধিত্ব করা হয়। এইভাবে তিনি এক বিস্তৃত জীবজগতের সম্মিলনে দেবীকে একটি সর্বজনীন শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করেন।

পূজামণ্ডপে একটি ঘট স্থাপন করা হয়, যাতে সারা ভারতের সাতটি সমুদ্র ও নানা প্রধান নদীর জল একত্র করে ঢালা হয়। এটি ছিল একপ্রকার ‘পঞ্চতীর্থ’ ধারণার সম্প্রসারণ, যা পূজাকে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি ভৌগোলিক সংহতির রূপ দেয়।

‘ডাকের সাজ’, অর্থাৎ অলংকার, অস্ত্রশস্ত্র ও রাজসিক সামগ্রীতে পরিপূর্ণ এক উৎসর্গ, যা পরবর্তীকালে বাঙালি দুর্গাপূজার এক অনিবার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে।

এই পূজার মাধ্যমে তিনি যুদ্ধ ও আধ্যাত্মিকতাকে এক সূত্রে বাঁধেন। তাঁর পরামর্শদাতা ছিলেন শ্রীহট্টের শৌত্রিয় বৈদিক পণ্ডিত রমেশ ভট্টাচার্য (ভট্ট), যাঁর প্রস্তাবে তিনি পূজায় কালপ্রারম্ভবোধন যোগ করেন। দেবী দুর্গার জাগরণের আগে প্রথমে বিষ্ণুর আহ্বান করা হয়, এবং তারপর শুরু হয় বোধন—বোধনের পরে পূজায় ঘটে এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপান্তর। মৃন্ময়ী প্রতিমা তখন কেবল মাটির প্রতিমা থাকেন না—বোধনের মধ্য দিয়ে সেই প্রতিমাই ব্রহ্মের আধার হয়ে ওঠেন। দেবী তন্ময় হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন, আর সেই মুহূর্ত থেকেই পূজার প্রতিটি আচার, প্রতিটি অঙ্গন, প্রতিটি স্পর্শ হয়ে ওঠে এক গম্ভীর যাগ্যিক তত্ত্বের ধারক। এই ব্রহ্ম-অধিষ্ঠিত মৃন্ময়ী মূর্তির মাধ্যমে শুরু হয় যজ্ঞতন্ত্রের বিস্তার, যাতে সাহায্য করেন তন্ত্রধারী ব্রাহ্মণরা—সাধনপটু, তত্ত্বজ্ঞ এবং আচারপূর্বজ্ঞ শৌত্রিয় পণ্ডিত।

কংসনারায়ণর রাজ্য বিস্তৃত ছিল বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর অঞ্চলজুড়ে। সংস্কৃত ভাষায় এই অঞ্চলকে “সাস্তালি” বলা হত, যা ছিল শাস্ত্রজ্ঞ বৈদিক ব্রাহ্মণদের এক বিশিষ্ট কেন্দ্র। বাংলায় একে বলা হত সাতৈর, সতৈল বা সাতোড়। কংসনারায়ণের উৎসাহে এই অঞ্চল ছিল বৈদিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। তাঁর রাজত্ব এবং সংস্কার বাংলা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল, যা পরবর্তীকালের দুর্গোৎসব, সামাজিক ধর্মভাবনা ও সর্ববাদের এক নতুন পরিসর তৈরি করে।


আরও দেখুন

কংস রাজা (১৩৮৫ খ্ৰী)


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল