বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
ন
প্রেমবিলাস গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন নিত্যানন্দ দাস, যিনি ছিলেন খণ্ডবাসী শ্রীজাহ্নবা দেবীর শিষ্য। গ্রন্থের বচন থেকেই তাঁর পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি নিজেই লিখেছেন—
“মোর দীক্ষাগুরু হয় জাহ্নবা ঈশ্বরী।
যে কৃপা করিলা মোবে কহিতে না পারি।
বীরচন্দ্র প্রভু মোর শিক্ষাগুরু হয়।
আমারে করুণা তিহো কৈলা অতিশয়।
মাতা সৌদামিনী, পিতা আত্মারাম দাস।
অম্বষ্ঠ কুলেতে জন্ম, শ্রীখণ্ডেতে বাস।
বলরাম দাস নাম পূর্ব্বে মোর ছিল।
এবে নিত্যানন্দ দাস শ্রীমুখে রাখিল।”
এই উদ্ধৃতি থেকে জানা যায়, তাঁর পূর্ব নাম ছিল বলরাম দাস। পরবর্তীতে নিত্যানন্দের (১৪৭৪ -১৫৪৫ খ্রি) দ্বিতীয় স্ত্রী শ্রীজাহ্নবা দেবীর (ঈশ্বরী) কৃপায় তিনি “নিত্যানন্দ দাস” নামে পরিচিত হন। তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন শ্রীজাহ্নবা দেবী (১৫১৬-১৫৯০ খ্রি) এবং শিক্ষাগুরু ছিলেন বীরচন্দ্র। পিতার নাম আত্মারাম দাস ও মাতার নাম সৌদামিনী। তিনি অম্বষ্ঠ কুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর নিবাস ছিল শ্রীখণ্ডে। ধারণা করা হয়, প্রেমবিলাস গ্রন্থটি ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে গৌড়দেশে রচিত হয়েছিল।
শ্রীজাহ্নবা বীরচন্দ্র পদে যার আশ।
প্রেমবিলাস কহে নিত্যানন্দ দাস ॥
প্রেমবিলাস গ্রন্থে সমকালীন সমাজজীবনের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। বিশেষত শ্রীনিবাস আচার্য প্রভৃতি ভক্তদের প্রধান প্রধান শাখাগণের বর্ণনা এই গ্রন্থে উপস্থিত। চতুব্বিংশ বিলাসে রাঢ়ী ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের বিস্তৃত ইতিহাস আলোচিত হয়েছে। সেখানে বল্লালের কথা, পঞ্চ ঋষির আগমন, বংশ বর্ণনা, কৌলীন্য স্থাপন, কুলমর্যাদার বিশ্লেষণ ইত্যাদি সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া কুলপরিচয় ও বংশবিস্তার, পরিবর্তনশীল সামাজিক রীতিনীতি, করণ-পদ্ধতি, পাষ্টী, প্রকৃতি, আর্তি, ক্ষেম্য প্রভৃতি বিষয়ও আলোচনা করা হয়েছে। মেল বা সমাবেশ, পটী-বন্ধন এবং সমাজজীবনের নানা সংগঠনমূলক দিক নিয়েও সেখানে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
নিত্যানন্দ দাস রচিত প্রেমবিলাস–এ উল্লেখ পাওয়া যায় যে বৃন্দাবন দাস ঠাকুর তাঁর চৈতন্যভাগবত রচনা করেন ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে। পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যচরিতামৃত সম্পূর্ণ করেন। চৈতন্যভাগবত মূলত শ্রীচৈতন্যের প্রারম্ভিক জীবন ও নবদ্বীপের লীলার বিস্তৃত বিবরণ দেয়, অন্যদিকে চৈতন্যচরিতামৃত–এ আদিলীলা, মধ্যলীলা ও অন্ত্যলীলার সুসংহত আখ্যানরূপ চিত্রণ পাওয়া যায়।
প্রভুর চরিত্রকথা জাহ্নবী আদেশে।
রচিলেন প্রেমবিলাসে নিত্যানন্দ দাসে ॥
প্রেমবিলাস–এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রচনাপ্রেরণা ও আভ্যন্তরীণ উদ্দেশ্য। নিত্যানন্দ দাস এই গ্রন্থ রচনা করেন মূলত শ্রীঅদ্বৈত আচার্য ও তাঁর উত্তরসূরিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জানাতে। সেখানে বলা হয়েছে যে, অদ্বৈত আচার্য ভক্তির পথ পরিত্যাগ করে বৈদান্তিক মুক্তির প্রচার শুরু করেছিলেন। গৌড়িয়া ভক্তরা মহাপ্রভু কে নালিশ করেন এবং নিত্যানন্দ নাকি পাত্র লিখে চৈতন্য কে শ্রীঅদ্বৈত আচার্যর ভণ্ডামি প্রকাশ করেন । চৈতন্য এই সংবাদ শুনে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হন এবং এ বিষয়ে নিজ ভক্তগণের সঙ্গে আলোচনা করেন। বিশেষত সার্বভৌম ভট্টাচার্য এ খবর শুনে প্রচণ্ড রুষ্ট হন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন নাড়িয়ায় গিয়ে অদ্বৈত আচার্যের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি হবেন।
নিত্যানন্দ প্রভুর পত্র হস্তে তে আছিল।
পত্র পড় ভট্টাচার্য্য, প্রভু আজ্ঞা কৈল ॥
পত্রপড়ি ভট্টাচার্য্য হৈলা মহাক্রোধ।
হেন বুঝি গৌড়দেশে নাহি কার বোধ !
ভক্তি ছাড়ি মুক্তিকে বাখানে কোন জন।
সেই স্থানে আমরা যাইব তিন জন॥
বিচার করি তাঁরে প্রভু নিরস্ত করিব।
প্রৌঢ়ি করেন যদি বান্ধিয়া আনিব । (প্রেমবিলাস-1)
ভটাচার্য্যের বাক্যে প্রভুর আনন্দ হৃদয়।
না হইব ভক্তিবাধ শুন মগাশয়॥
স্বাক্ষরেতে এক পত্র যায় অদ্বৈতেরে।
আর পত্র লিখেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুরে ॥
ভাল ভাল বলি এই যুক্তি দৃঢ় কৈল
বৈষ্ণব দ্বারায় পত্র গৌড়ে পাঠাইল।
প্রেমবিলাস–এ বলা হয়েছে যে প্রায় ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দের দিকে নীলাচলে (পুরীতে) এক প্রবল ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ভূমিকম্পের পরপরই এক ভয়ংকর সুনামি আঘাত হানে। সমুদ্রের জল তখন এতটাই প্রবলভাবে উঠে আসে যে তা কাশী মিশ্র ভবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা জগন্নাথ মন্দিরের একেবারে নিকটে অবস্থিত।
