কানু ব্যানার্জী (অভিনেতা)

Kanu-Banerjee

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

কানু বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৯০৫) ছিলেন বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের এক অনন্য অভিনেতা, যাঁর অভিনয় আজও বাংলার সংস্কৃতিসচেতন মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। তাঁর সিনেমা যাত্রা শুরু হয় ১৯২৬ সালে কৃষ্ণকান্তের উইল চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, যেটি ছিল এক নির্বাক বাংলা ছবি। পরের বছরেই তাঁকে দেখা যায় দুর্গেশনন্দিনী ছবিতে। কিন্তু অভিনয়ের যে প্রতিভা ও প্রাণবন্ততা তিনি মঞ্চে দেখিয়েছিলেন, তা তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। সেদিনকার বড় মাপের নাট্যব্যক্তিত্বরা যেমন শিশির ভাদুড়ী তাঁর অভিনয় দেখেছিলেন, তেমনি বলা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত তাঁর অভিনীত ছবি দেখে মন্তব্য করেছিলেন।

কিন্তু তাঁর জীবনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় যখন সত্যজিৎ রায় তাঁকে ‘অপু ট্রিলজি’-র প্রথম দুই পর্বে—পথের পাঁচালি (১৯৫৫) ও অপরাজিত (১৯৫৬)—অপু ও দুর্গার পিতা হরিহর রায়-এর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করেন। হরিহরের চরিত্রে কানুবাবুর সূক্ষ্ম আবেগ, অপার দারিদ্র্য, জীবনের প্রতি সহজ বিশ্বাস—সবকিছু এক আশ্চর্য আবেগে ফুটে উঠেছিল। এই দুটি ছবিই তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ঘরের মানুষ করে তোলে।

তবে, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনে আর একটি স্মরণীয় কাজ হল—ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ (১৯৫৫) ছবিতে রামকৃষ্ণ চরিত্রে অভিনয়। ছবিটির অর্থায়িত করে রামকৃষ্ণ মিশন, নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রফুল্ল চক্রবর্তী, আর চিত্রগ্রহণে ছিলেন বিভূতি চক্রবর্তী। পুলিন ঘোষ নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে সেট নির্মাণ করেন, এবং ছবি বিশ্বাস ও শোভা সেন যথাক্রমে মথুরবাবু ও শারদাদেবীর চরিত্রে অভিনয় করেন।

এই ছবিতে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় এক অভিনব রামকৃষ্ণ গড়ে তোলেন—যাঁর কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ছিল কলকাতায় এসে বাস করা কোনও রংপুরিয়ার মতো, একধরনের ‘ন‍্যালা-খ্যাপা’ ভাব যার মধ্যে ছিল। অথচ দক্ষিণেশ্বরের ছোট বামুন গদাধর ছিলেন হুগলির কামারপুকুরের মানুষ, ১৮৮০-এর দশকের এক ব্রাহ্মণপল্লির সন্তান। কানুবাবুর এই অভিনয় এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ (গদাধর চট্টোপাধ্যায় ) চরিত্র রূপায়ণ মানেই ‘ন‍্যালা-খ্যাপা’ ভঙ্গিমার অনুকরণ হয়ে দাঁড়ায়। কাহিনীচিত্রে গদাধর ও হরিহর যেন একাত্ম হয়ে ওঠেন—দু’জনেই দরিদ্র, ভাবপ্রবণ, সংসারে অপ্রতুল দর্শন, কিন্তু আত্মায় অখণ্ড। মনে হয় রামকৃষ্ণ (গদাধর) নয়, এ যেন হরিহর রায়ই অন্য রূপে ফিরে এসেছেন।

কানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ দিকের উল্লেখযোগ্য কাজ আলো আমার আলো (১৯৭১), যেখানে তিনি অতশীর পিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন। চরিত্র নির্মাণে তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তুলনা টানা চলে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ি কিংবা তুলসী চক্রবর্তীর সঙ্গে—যাঁরা নিছক অভিনয় নয়, একেকটি চরিত্রকে বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখতেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কানু বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৩ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রয়াত হন, একেবারে হরিহর রায়ের মতোই নিঃস্ব অবস্থায়। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় যেন আরেকটি বাস্তব সিনেমা, যেখানে শিল্পীর আত্মা অমর হলেও দেহে জায়গা হয় না সম্মানের। তবুও, বাংলা সিনেমা ও নাট্যমঞ্চের ইতিহাসে কানু বন্দ্যোপাধ্যায় আজও এক উজ্জ্বল ও সম্মানিত নাম।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল