কংস রাজা (১৩৮৫ খ্ৰী)

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

কংস রাজা নামে এক অল্প পরিচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় রমেশচন্দ্র দত্তের লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস বঙ্গবিজেতা (১৮৮০)-তে। তিনি লিখেছেন, ১৩৮৫ খ্রিস্টাব্দে কংস রাজা নামের এক হিন্দু জমিদার নিজের শক্তি ও বুদ্ধির জোরে বঙ্গদেশের শাসক হন এবং টানা সাত বছর ধরে শান্তিপূর্ণভাবে রাজত্ব করেন। তাঁর পুত্র পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁদের বংশই প্রায় চল্লিশ বছর বাংলার রাজত্ব চালায়। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে, মুসলমান শাসনকালে হিন্দু জমিদারদের যথেষ্ট প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল। পাঠান শাসকরা বাংলার প্রশাসনিক দায়িত্ব, রাজস্ব আদায়, এমনকি সৈন্যদলের নেতৃত্বও হিন্দু জমিদারদের হাতে তুলে দিতেন।

বঙ্গদেশীয় হিন্দুগণ সাহস ও যুদ্ধকৌশলে নুন হঁলেও অতিশয় বুদ্ধিমান ও কৰ্ম্মঠ ; এজন্য পাঠান অধ্যক্ষগণ তাহাদিগকেই প্রধান প্রধান কাৰ্য্যে নিযুক্ত করিতেন, তাহাদিগকেই জমীদার করিয়া তাহাদিগের দ্বার প্রজার নিকট কর সংগ্ৰহ করিতেন এবং তাহাদিগকেই বিশেষ সন্ত্রমের পাত্র করিতেন । এমন কি, বঙ্গদেশের পাঠান রাজাদিগের মধ্যে আমরা একজন হিন্দুরাজারও নাম দেখিতে পাই । ১৩৮৫ খ্ৰীষ্টাব্দে কংস রাজা বঙ্গদেশের অধিপতি হইয়া সাত বৎসর নিরাপদে রাজত্ব করেন। তিনি পূৰ্ব্বে জমীদার ছিলেন, আপন বাহুবলে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহার পুত্র মুসলমানধৰ্ম্ম অবলম্বন করেন ও তাহার বংশ সৰ্ব্বশুদ্ধ চত্বারিংশৎ বৎসর বঙ্গদেশে রাজত্ব করেন।

তখনকার দিনে অধিকাংশ জমিদার, জায়গীরদারই ছিলেন হিন্দু। প্রজারা পুরোপুরি জমিদারদের অধীন থাকত। জমিদার যদি সদয় হতেন, তাহলে প্রজারা সুখে থাকত; আর যদি তিনি প্রজাপীড়ক হতেন, তাহলে তাঁদের কোনো নিস্তার থাকত না। জমিদারদের মধ্যে প্রায়ই নিজেদের মধ্যে জমি ও প্রভাব নিয়ে সংঘর্ষ চলত, যা অনেক সময় অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হত। কিন্তু সেই দ্বন্দ্বের মধ্যেই কেউ কেউ বিশেষ বুদ্ধি, চালাকি বা শক্তির জোরে অন্যদের জমি দখল করে নিজের কর্তৃত্ব বাড়িয়ে নিত।

প্রজাদের মধ্যকার বিবাদ বা গ্রাম্য অপরাধের বিচারও করতেন এই জমিদাররাই। গ্রামের শান্তি রক্ষা, অপরাধীদের শাস্তি, এমনকি কর নির্ধারণ—সবই জমিদারদের হাতে ছিল। বলা যায়, সেই সময়ে জমিদাররাই ছিলেন প্রজাদের “বাপ-মা”, প্রশাসক, বিচারক ও অভিভাবক। তাঁদের অবিচার করলে সুবিচারের কোনো পথ খোলা থাকত না। সুতরাং জমিদারদের ভূমিকাই ছিল রাজাসুলভ।

এই কংস রাজাকে অনেকে কংসনারায়ণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, যিনি ১৫৮২ সালে শরৎকালে দুর্গাপুজোর জাঁকজমকপূর্ণ সূচনা করেন এবং বাঙালি সমাজে এক নতুন সাংস্কৃতিক অধ্যায় শুরু করেন। কিন্তু কংস রাজা কংসনারায়ণের বহু আগে, এবং তাঁর সঙ্গে দুর্গাপুজোর কোনও সম্পর্ক ছিল না।

রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর উপন্যাসে আরও জানান যে, ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় হিন্দুরাজ্যের পতনের পর ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত আফগান ও পাঠান শাসকরাই রাজত্ব করেছেন। এই দীর্ঘ শাসনকালেই কংস রাজা তাঁর জমিদারি থেকে উঠে এসে বঙ্গ ও বিহারের শাসনভার গ্রহণ করেন। যদিও কংস রাজার অস্তিত্ব নিয়ে ঐতিহাসিক তর্ক থাকতে পারে, তবুও তাঁর শাসনকাল মধ্যযুগীয় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে হিন্দু জমিদারদের বাস্তব ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল