তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
শ্রীঈশ্বরচন্দ্রশর্ম্মা বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) উনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গসমাজের অন্যতম প্রগতিশীল মনীষী ও বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম সার্থক রূপকার। যদিও তত্ত্বগতভাবে তিনি বাংলা গদ্যের জন্মদাতা নন, তথাপি বাংলা গদ্যকে সাবালক, সুসংহত ও ব্যাপকভাবে সমাজোপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্যসাধারণ।
বাংলা গদ্যের প্রারম্ভিক প্রচেষ্টা হিসাবে ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে রামরাম বসুর (১৭৫৭ – ১৮১৩) রাজা প্রতাপাদিত্য গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য; এই গ্রন্থে গদ্যরীতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তবে ১৮ শতকের শেষভাগে, ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে হুগলিতে প্রথম বাংলা হরফে মুদ্রাযন্ত্র স্থাপন এবং বাংলা মুদ্রণ সাহিত্যের সূচনা ঘটে, যা বিদ্যাসাগরের গদ্য নির্মাণে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
বিদ্যাসাগর কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ১৮২৯–১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্যাকরণ, সাহিত্য, ন্যায়, বেদান্ত, স্মৃতি ও অলঙ্কারশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা ও গভীর শাস্ত্রচর্চার মধ্য দিয়েও তিনি সামাজিক সংস্কার, যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও ভাষার সহজীকরণের অভূতপূর্ব সাধনায় নিজেকে নিবেদন করেন।
তাঁর প্রথম মৌলিক গদ্যরচনা বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮), একটি ইংরেজি বইয়ের ভিত্তিতে রচিত, বাংলা ভাষায় ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যগ্রন্থ রচনার প্রয়াস হিসেবে অগ্রগণ্য। এরপর আসে জীবনচরিত (১৮৪৯), যেখানে সংক্ষিপ্ত জীবনীগ্রন্থ রচনার ধারায় সুস্পষ্ট গদ্যভাষার প্রয়োগ দেখা যায়। শিশুদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তক বোধোদয় (১৮৫১), কথামালা (১৮৫৬) ও আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩) তৎকালীন বাংলা ভাষাকে সহজ, প্রবাহমান ও যথাযথ রচনার শৈলীতে রূপান্তর করে। এই বইগুলির ভাষা যেমন ছিল সরল ও অনাড়ম্বর, তেমনি তা শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল আকর্ষণীয়, শিক্ষাগ্রাহ্য ও সামাজিক ভাবনাচিন্তার দিক থেকেও যথার্থ।
তাঁর গদ্যপ্রয়াসের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন কিন্তু সংস্কৃত ব্যাকরণের বাংলা অনুবাদ ও বিশ্লেষণমূলক কাজ: সংস্কৃত ব্যাকরণ উপক্রমণিকা (১৮৫১) এবং চার খণ্ডে প্রকাশিত ব্যাকরণ কৌমুদী (১৮৫৩, ১৮৫৪, ১৮৬২)। এখানেও তাঁর গদ্য ভাষা নির্মাণের অতুলনীয় ক্ষমতা প্রতিফলিত হয়। সংস্কৃত-শিক্ষিত পাঠকের কাছেও এই রচনা-শ্রেণি ছিল সহজবোধ্য এবং কর্মোপযোগী।
সজনীকান্ত দাস তাঁর বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থে যথার্থই লিখেছেন:
“১৮২৯ হইতে ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ণ এক যুগকাল সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ সাহিত্য, বেদান্ত, অলঙ্কার, স্মৃতি ও ন্যায় অধ্যায়ন করিয়া এবং গোরা ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হইয়া তিনি যে কেমন করিয়া এই সংস্কারমুক্ততা অর্জন করিলেন, তৎকালে প্রচলিত জ্ঞান ও শিক্ষার মধ্যে এই উদারতার বীজ কোথায় কেমনভাবে তাহার মনে উপ্ত হইল, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও তাহার রহস্য আমাদিগকে অভিভূত করে।”
সার্বিক বিচারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াসে বাংলা গদ্য একটি জীবন্ত, বহনযোগ্য ও বিশ্লেষণযোগ্য ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা পায়। সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলা গদ্যকে একটি পরিণত ও সর্বজনগ্রাহ্য মাধ্যমে রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায়িত্বটি তিনিই প্রথম সার্থকভাবে পালন করেন।
তথ্যসূত্র:
১. সজনীকান্ত দাস, বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম প্রকাশ, কলকাতা, ১৯৫৮
২. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচনাসংগ্রহ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা
৩. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ভারতের ভাষা, ১৯৬০
৪. হার্দয়াল দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: জীবন ও কর্ম, কলকাতা, ১৯৭৪
৫. গৌরীভূষণ মজুমদার, বাংলা গদ্যের ইতিহাস, বিশ্বভারতী, ১৯৬৫
৬. রামরাম বসু, রাজা প্রতাপাদিত্য, প্রথম প্রকাশ ১৮০১ (পুনর্মুদ্রণ, আনন্দ পাবলিশার্স)
