বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
হেমলতা দেবী (২৪ জুন ১৮৬৮ – ১২ মে ১৯৪৩)
হেমলতা দেবী ছিলেন উনিশ ও বিশ শতকের সূচনালগ্নের এক বিশিষ্ট বাঙালি লেখিকা, সমাজচিন্তিকা ও স্মৃতিচারণমূলক গদ্যকার। তিনি ১৮৬৮ সালের ২৪ জুন দক্ষিণ ২৪ পরগণার মজিলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রী, ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃস্থানীয় সমাজসংস্কারক ও শিক্ষাবিদ। মাতা প্রসন্নময়ী। পরিবার থেকেই শিক্ষার পরিবেশ পেয়ে হেমলতা বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় ও বেথুন স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে বেথুন কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন, যা সেই সময়ে নারীশিক্ষার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৮৯৩ সালে তাঁর বিয়ে হয় ডাক্তার বিপিনবিহারী সরকারের (সনাতন ধর্ম্মিন) সঙ্গে। বিবাহোত্তর জীবনে তিনি স্বামীর কর্মসূত্রে নেপালে গমন করেন এবং সেখানেই বসবাসকালে তাঁর অন্যতম স্মরণীয় গ্রন্থ নেপালে বঙ্গনারী (১৯১১) রচনা ও প্রকাশ করেন।
তিনি লিখেছেন:
“পৃথ্বী নারায়ণ—নেপাল জয় করিয়া গুর্খা এবং নেপাল রাজ্য মিলিত করিয়া সমুদায় প্রদেশ নেপাল রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। পরে কিরাটী এবং লিম্বুদিগকে পরাজিত করিয়া পূর্ব্বে মিচি নদী পর্য্যন্ত নেপালরাজ্যের সীমা বিস্তার করেন। ক্ষুদ্র নেপাল রাজ্য এই প্রকারে বর্ত্তমান আকার ধারণ করিল। পৃথ্বীনারায়ণ নবজীতরাজ্যে অধিক দিন রাজত্ব করিতে পারেন নাই। ১৭৭১ খৃষ্টাব্দে তাঁহার মৃত্যু হয়। পৃথ্বীনারায়ণের নেপাল জয়ের পূর্ব্ব হইতে কাটমণ্ডুর মল্লরাজার সহিত ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা বাণিজ্যজাত সম্বন্ধ ছিল। সেই সূত্রে পৃথ্বীনারায়ণ নেপাল আক্রমণ করিলে তাঁহারা ইংরাজের সহায়তা ভিক্ষা করিয়াছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ এবং গুর্খা কর্ত্তৃক নেপাল জয় প্রায় সমসাময়িক ঘটনা।”
এই ভাষ্যে তিনি পৃথ্বী নারায়ণ শাহের মাধ্যমে নেপালের আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেই সময়ের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন।
এই রচনায় তিনি নেপালের ভৌগোলিক দৃশ্য, স্বাধীনতা ও সামাজিক পরিবেশ, এবং সেখানে বসবাসকারী বঙ্গনারীর অবস্থা বিশদভাবে বর্ণনা করেন। সহজপাঠ্য ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় নেপালের প্রতি ভারতীয় ও বিশেষত বাঙালিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন।
হেমলতা দেবীর অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
- দুনিয়ার দেনা (১৯২০) — ছোটগল্প সংকলন।
- পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর জীবন-চরিত (১৯২০) — তাঁর পিতার জীবনীগ্রন্থ।
- মিবার-গৌরব-কথা (১৯১২)
- স্বর্গীয় ব্রজসুন্দর মিত্র (১৯১৫)
- জল্পনা (১৯৩৫)
- দেহলি (১৯৩৯), বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ থেকে প্রকাশিত।
হেমলতা দেবী ১২ মে ১৯৪৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষত স্মৃতিচারণ, ভ্রমণকাহিনি ও জীবনী সাহিত্যে তাঁর অবদান সুপ্রসিদ্ধ। তিনি শিক্ষিত বাঙালি নারী সমাজের বিকাশে এক প্রেরণাদায়িনী ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয়।
নেপালে বঙ্গনারীর ভূমিকায় তিনি প্রাঞ্জল ও সুশ্রুত সাধু ভাষায় লেখেন:
“হিমালয় যে পয়োধি-বেষ্টিত বিপুল দেশের শিরোভূষণ তাহা জগতে হিন্দুস্থান বলিয়া বিখ্যাত। এই হিন্দুস্থানবাসী হিন্দুদিগের সহিত পৃথিবীর আর কোন জাতিরই সাদৃশ্য কিম্বা জ্ঞাতিবন্ধন নাই। দুর্ভেদ্য নৈসর্গিক পরিখা ও প্রাকারে বেষ্টিত করিয়া বিধাতা যেন ইহাকে পৃথিবীর মধ্যে সর্ব্ববিষয়ে স্বতন্ত্র এবং চিহ্নিত করিয়া রাখিয়াছেন। এই জাতির প্রাচীন ইতিহাস এবং মহত্ত্ব জগতে সর্বজনবিদিত, এস্থলে তাহার পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন। সেই আদিম সুসভ্য পরাক্রান্ত স্বাধীন হিন্দু জাতি আজ পরপদানত ও হীনবীর্য বলিয়া বর্তমান সুসভ্য জাতি সকলের কৃপাপাত্র হইয়াছে। কেবল দুইটা মাত্র রাজ্য এখনও পর্যন্ত স্বাধীনতার গৌরবময় উজ্জ্বল টীকা ললাটে ধারণ করিতেছে। তন্মধ্যে নেপাল প্রধান। ইহা হিমালয়ের ক্রোড়স্থ বিস্তীর্ণ প্রদেশ, প্রকৃতির রম্য কানন, বিবিধ নৈসর্গিক শোভা এবং সম্পদে সৌভাগ্যবান। ইহার উত্তরে চির-তুষারাবৃত হিমালয়ের শিখরমালা, তাহার চরণে গভীর শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যানী। হিমাচল নরের অগম্য, পুরাণে ইহা দেবের আবাসস্থান বলিয়া পরিকীর্ত্তিত হইয়াছে। বিধাতা নেপাল রাজ্যকে দুর্ভেদ্য প্রাচীরে বেষ্টিত করিয়াছেন, তাই ইহা আজও স্বাধীন। জগতবাসীর কথা দূরে থাকুক, এদেশ ভারতবাসীরও অজ্ঞাত। এ রাজ্য অতি বিচিত্র, ইহার প্রাচীন ইতিহাস অপূর্ব্ব উপন্যাসের ন্যায়। এই লুক্কায়িত স্থানে অনেক প্রাচীন কথা গুপ্ত আছে। সুদূর চীন হইতে কোন্ যুগে কোন্ বোধিসত্ত্ব মহাত্মা আসিয়া কোন্ বিপুল হ্রদকে রমণীয় উপত্যকায় পরিণত করিয়াছিলেন, কোথায় সেই হ্রদের মধ্যে শতদল শোভা পাইল, শতদলের নিয়ে পবিত্র বারি উৎসারিত হইল, সেখানে স্বয়ম্ভু ভগবান দিব্য কিরণে প্রকাশিত হইলেন, অদ্যাবধি নেপালবাসী ও নানা স্থান হইতে ভক্তবৃন্দ আসিয়া তথায় পশুপতিনাথকে দর্শন করেন। কোথায় কোন দেবতার হস্তম্পর্শে দৈব বারিধারা উৎসারিত হইয়া নিঝরিণী সৃষ্টি করিয়াছে—কি অপূর্ব্ব কথা সে সকল! যুগে যুগে কত মহাপ্রাণ হিন্দু, মুসলমানদিগের ভয়ে ভীত ও সংক্ষুব্ধ হইয়া এই দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় লইয়াছিলেন, হিন্দুস্থান হইতে হিন্দু ধর্ম্ম উৎপীড়িত হইয়া এখানে আসিয়া আশ্রয় লাভ করিয়াছেন। ভারত বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্ম্মের জন্মস্থান, এই উভয় ধর্ম্মই নেপালে আশ্রয় লাভ করিয়াছে। এক্ষণে এই উভয় ধর্ম্মই নেপালের জনসাধারণের ধর্ম্ম। ভারতের সর্ব্বত্রই রেলপথ বিস্তৃত হওয়াতে কোন প্রদেশই আর ভ্রমণকারীর অজ্ঞাত নাই। কিন্তু নেপাল রাজ্য সকলের নিকটেই অদৃষ্টপূর্ব দেশ হইয়া রহিয়াছে।”
