চর্যাপদ

Charyapada script

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার লাইব্রেরিতে আবিষ্কৃত একটি পুঁথি “চর্যাচর্যবিনিশ্চয়” নামে পরিচিত, যার অন্তর্গত গীতিকবিতাগুলি পরবর্তীকালে “চর্যাপদ” নামে পরিচিতি লাভ করে। এই গীতিগুলি মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের রচিত এবং “চর্যা” নামে এক ধরণের গীতিকবিতার রূপ। কিন্তু এই চর্যাপদ বাংলাভাষার প্রারম্ভ বা উৎস কি না, তা নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে। কারণ চর্যাপদের ভাষা তৎকালীন গৌড়ভূমির সাধারণ জনগণের ভাষা ছিল না; এ ভাষা ছিল এক ধরণের অপভ্রংশ, যার সঙ্গে বাংলা, উড়িয়া ও অসমীয়া ভাষার কিছু মিল থাকলেও এটিকে বাংলার আদি রূপ বলা যায় না।

চর্যাপদ রচনার সময়কাল ও স্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, এই গীতিকবিতাগুলি ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত হতে পারে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তিনবার নেপাল ভ্রমণ করেন; ১৮৯৭ সালে বৌদ্ধ সহজিয়া আচার নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথম নেপাল যান, দ্বিতীয়বার ১৮৯৮ সালে কিছু বৌদ্ধ ধর্মীয় পুঁথি সংগ্রহ করেন, এবং তৃতীয়বার ১৯০৭ সালে গিয়ে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। পরে এই পুঁথিতে সংরক্ষিত পদগুলি তিনি “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা” নামে ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশ করেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাচর্যবিনিশ্চয় পুঁথি থেকে ৪৬টি পূর্ণ পদ ও একটি খণ্ডিত পদ উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী তিব্বতীয় অনুবাদ থেকে আরও চারটি পদের অনুবাদ উদ্ধার করেন। ১৯৬৩ সালে ডঃ শশীভূষণ দাশগুপ্ত প্রাচীন ২০টি পুঁথি ও প্রায় ২৫০টি পদ আবিষ্কার করেন, যার মধ্যে ৯৮টি পদ নিয়ে “নব চর্যাপদ” নামে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তা প্রকাশিত হয়।

চর্যাপদের রচয়িতারা যেমন লুইপা, সরহপা, কুক্কুরিপা, ডোম্বিপা, তান্তিপা প্রমুখ, তারা কেউই বাংলা, মৈথিলি, অপভ্রংশ বা অবহট্ট ভাষায় প্রাঞ্জলভাবে কথা বলতেন না। অধিকাংশই তিব্বতীয় বা উপতিব্বতীয় অঞ্চলের ভাসমান সমাজের লোক, যাঁদের ভাষা-পরিচয় অস্পষ্ট। চর্যাপদ তাই ভাষাগত দিক থেকে এক নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষার নিদর্শন নয়, বরং এক ধরনের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ কবিতাগুচ্ছ।

চর্যাপদ রচনার সময় বৌদ্ধধর্ম ভারতে বিশেষত উত্তর ও পূর্ব ভারতে অস্তমিত। পাল যুগের শেষ পর্ব ও সেন যুগের সূচনায় বৌদ্ধরা সমাজে গুরুত্ব হারায় এবং একপ্রকার তান্ত্রিক, গোপন, বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। সহজিয়া বৌদ্ধরা বৌদ্ধ হলেও তাদের মধ্যে আর বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের ঐতিহ্য ছিল না। অতীশ দীপঙ্কর যদিও একবার চেষ্টা করেছিলেন বৌদ্ধধর্মকে টিকিয়ে রাখতে, কিন্তু তিনিও হিন্দু তান্ত্রিকতা অনুকরণ করেই সেই প্রচেষ্টা চালান। পালি ও মাগধী প্রাকৃতের সাহিত্য ঐতিহ্যও তখন লুপ্তপ্রায় (৯৫০)।

এই পরিস্থিতিতে চর্যাপদ কোনো রাজপ্রয়োজনে রচিত হয়নি, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত সমাজের ভাষাও ছিল না। এই নিরিখে আমরা চর্যাপদকে বিচার করতে পারি । চর্যাপদের ভাষা পাঠে এমনকি ভাষাতাত্ত্বিক বা ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ ছাড়া এর বক্তব্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।

বাংলা ভাষা ক্রমে বিকশিত হয়েছে, কোনো এক সময়ে হঠাৎ করে জন্মায়নি। ভাষা কোনো কলকারখানায় তৈরি হয় না; ভাষা একটি জৈব প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যুগযুগান্তরে মানুষের মুখে-মুখে তার রূপান্তর ঘটে। ভাষা যদি কোনো রাজার পৃষ্ঠপোষকতা না পায় কিংবা কোনো শিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা না থাকে, তবে সেই ভাষা অচিরেই হারিয়ে যায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষার কোনো নির্দিষ্ট “উৎপত্তি মুহূর্ত” নেই। বরং একাধিক আঞ্চলিক ও ধ্বনিগত ধারা — যেমন মাগধী প্রাকৃত, পিশাচী প্রাকৃত, সংস্কৃত-নির্ভর অপভ্রংশ, এবং পূবদিকে অবহট্ট — এই চারটি প্রবাহই মিলেমিশে বাংলার ভিত্তি রচনা করে। চর্যাপদ ভাষাগত দিক থেকে সংস্কৃত “আর্যা” ধ্বনির অপভ্রংশ, যেখানে “আর্যা” শব্দটির অর্থ ছন্দবদ্ধ পংক্তি বা পদ্যরীতির ধ্বনি বিন্যাস। সেই অর্থে চর্যাপদ ভাষার এক প্রান্তিক ও অস্পষ্ট নমুনা।

বাংলা ভাষার বিকাশ বা পরিবর্তনের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে গেলে চৈতন্যচরিতামৃত (১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ) আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বোধগম্য উদাহরণ। এই গ্রন্থটি এমন এক ভাষায় রচিত, যেটা আজকের পাঠক বাইরের কোনো সাহায্য ছাড়াই পড়ে বুঝতে পারেন। ভাষাটি স্পষ্ট, সুসংগঠিত এবং পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বাংলা গদ্য ও কাব্যের ধারার প্রথম পরিণত নিদর্শন। এর স্থান ও সংস্কৃতি — নদিয়া-শান্তিপুর তথা গৌড়ভূমির — আজও চিহ্নিত ও জীবন্ত। লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ নিজে মথুরার বৃন্দাবনে বসে বাংলা বর্ণমালায় এই রচনাটি লেখেন, কিন্তু ভাষার ভিত্তি নদিয়া অঞ্চলভিত্তিক সমাজ ও লোকভাষা। বাংলা ভাষা তার নিজের শরীর, আত্মা ও পরিচিতি পেয়েছে নদিয়া-শান্তিপুরের জনজীবন থেকে — যার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে চৈতন্যচরিতামৃত মহাগ্রন্থে।

প্রাক-আধুনিক বাংলা (খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী – ১৪৮৫ খ্রিঃ): এই পর্বে বাংলা ভাষা ধীরে ধীরে গঠিত হচ্ছে প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অবহট্টের ধারা ধরে। চর্যাপদ (৯৫০-১২০০ খ্রিঃ) এ সময়েরই একটি আঞ্চলিক ও সীমান্তবর্তী নিদর্শন। এরপরে কিছু কিছু ধর্মীয় ও লৌকিক কবিতা, যেমন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, ইত্যাদি বাংলা ভাষার আদি রূপকে মূর্ত করে।

বাংলা ভাষার অন্ধকার যুগ (১২০০ – ১৩৫০ খ্রিঃ): ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণের মাধ্যমে তুর্কি শাসনের সূচনা হয়। এই পর্বে বাংলা ভাষার বিকাশ একপ্রকার স্তব্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অস্থিরতা ও আরবি-ফারসি প্রশাসনিক ভাষার আগমনে বাংলা ভাষা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এই প্রায় ১৫০ বছরকে “বাংলা ভাষার অন্ধকার যুগ” বলা হয় কারণ এই সময়ে খুব কম সাহিত্যচর্চা বা ভাষার লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায়।

আধুনিক বাংলা যুগের সূচনা (১৪৮৫/১৫০০ খ্রিঃ-এর পর): এই যুগের সূচনা চৈতন্যদেবের (জ. ১৪৮৬ খ্রিঃ) আবির্ভাব এবং বৈষ্ণব সাহিত্য ও ভাবধারার প্রসারের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়। চৈতন্যদেবের প্রভাব কেবল ধর্ম বা আধ্যাত্মিক চেতনায় নয়, ভাষার শৈলী, কাব্যভঙ্গি ও কথনভঙ্গিতেও নতুন গতি আনে। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত (১৫৫৭ খ্রিঃ) আধুনিক বাংলা ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সুগঠিত রূপ, যেখানে নদিয়া-শান্তিপুর অঞ্চলের লোকভাষা ও উচ্চশ্রেণির ভাবভাষা একত্রে মিশে গেছে। এই সময় থেকেই বাংলা, ওড়িয়া ও অসমীয়া — তিনটি গৌড়ীয় ভাষা — নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই ভাষাগুলির মধ্যে লৌকিকতাবোধ, তান্ত্রিকতা, প্রেম ও ভক্তির উপাদান মিলিয়ে নতুন এক সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়। চৈতন্যচরিতামৃত, মহাভাগবত, দীনেশচন্দ্র সেনের সংকলিত পদাবলী এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের বিশাল সম্ভার তার সাক্ষ্য।

চর্যাপদের ভাষা নিয়ে বহু গবেষণা হলেও এটা পরিষ্কার যে চর্যাপদ কোনও নির্দিষ্ট ভাষা বা উপভাষা-প্রণালী অনুসরণ করে না। একে ব্যাকরণগতভাবে বিশ্লেষণ করলে বহু অসংগতির সম্মুখীন হতে হয়। এই পাঠগুলো কোনো রাষ্ট্রীয় ভাষা বা প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ শিক্ষালয়ের ভাষা নয়, বরং এটি বিচ্ছিন্ন সাধকদের মুখের ভাষায়, যারা কোনো নির্দিষ্ট ভাষিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। সেই কারণে একে “ভাষাহীন ভাষা” বললেও অত্যুক্তি হয় না।

শবরপা এর লেখা চর্যাপদগুলির একটি—

‘উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।
মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী
উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরি।
ণিঅ ঘরনি ণামে সহজ সুন্দরী
ণাণা তরুবর মৌলিল রে গঅণত লাগেলি ডালী।
একেলী সবরী এ বণ হিণ্ডই কর্ণ কুণ্ডলবজ ধারী।

উদ্ধৃত পদটি শবরপা’র — ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে আমরা পিশাচ প্রাকৃত এবং মাগধী প্রাকৃতের ধ্বনি ও গঠন উপাদান দেখতে পাই। যেমন:

  • “ণিঅ” (নিয্‌/নিজ/ঘরনী) – ‘নি’ ধ্বনি এবং ‘ঘর’ এর সঙ্গবন্ধ, যা পিশাচ প্রাকৃতের বিশেষ ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য।
  • “ণাণা” (নানা) – বহুবচনবাচক শব্দ, যেখানে ‘ণ’ ধ্বনির ব্যবহার পিশাচ প্রাকৃতের লক্ষণ।
  • “গঅণত” (গাছে/বনে) – এটি সম্ভবত গঅণত = গহনেতে বা গাছে অর্থে ব্যবহৃত, যেখানে মধ্যভারতীয় ধ্বনি রূপান্তরের নিদর্শন পাওয়া যায়।

অন্যদিকে,

  • “সহজ সুন্দরী” — এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে মাগধী প্রাকৃতের ছাপ বহন করে। ‘সহজ’ শব্দটি গৌণতান্ত্রিক সহজিয়া বৌদ্ধ ধারণার সঙ্গে যুক্ত, এবং ‘সুন্দরী’ শব্দটি মাগধী/সাধারণ প্রাকৃত-সংস্কৃতের রূপান্তর।

“টালত ঘর মোর নাহি পরিবেষী।

হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।”

আপাত দৃষ্টিতে এর অর্থ ” পাহাড়ের টিলায় আমার ঘর কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই, কিন্তু নিত্যই অতিথি আসে”

কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসূহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।।
সঅল স [মা] হিঅ কাহি করিঅই ।
সুখদুখেতেঁ নিচিত মরিআই ।।
এড়িএউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুন্ন পাখ ভিড়ি লাহু রে পাস।।
ভণই লুই আম্‌হে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা।। (লুই পা)

এই পদটি পিশাচ প্রাকৃত ও মাগধী প্রাকৃতের ধ্বনি, শব্দগঠন ও বাক্যবিন্যাসের সংমিশ্রণ।

লক্ষণ অনুসারে পিশাচ উপাদানসমূহ:

১. সুন্ন পাখ ভিড়ি লাহু রে পাস।।

“সুন্ন”

  • সংস্কৃত শূন্য (śūnya) → প্রাকৃত ও অপভ্রংশে “সুন্ন”
  • পিশাচ প্রাকৃতের বৈশিষ্ট্য: দীর্ঘ স্বরধ্বনির মিহিন রূপান্তর, যেমন “শূন্য” → “সুন্ন”
  • শ্বাসধ্বনির হারানো, dental-velar shift লক্ষণীয়

“পাখ”

  • পাখা বা ডানা
  • “পক্ষ/পক্ষপতি”-এর (wing) লোকপ্রিয় রূপ।
  • পিশাচ প্রাকৃতের স্বভাব হল মূল ধাতু রেখে শব্দ সংক্ষিপ্ত করা।

“ভিড়ি”

  • সম্ভবত সংস্কৃত ‘ভেদ’ বা ‘বিদ্ধ’ → ‘ভিড়ি’ (অর্থ: প্রবিষ্ট, গাঁথা)।
  • পিশাচ প্রাকৃতের একটি বৈশিষ্ট্য:
    • ভিড়ি / ভিড়ি জাতীয় রূপ, যেখানে মূল ধাতুর সঙ্গে অনুপযুক্ত ধ্বনি-সংযোগ হয়।

“লাহু রে পাস”

  • লাহু = রক্ত (লহু/লাহু) — পিশাচ প্রাকৃত/লোকভাষায় প্রচলিত রূপ।
  • পাস = পিচ্ছিল/প্রবাহ/লেগে থাকা বা “লেগে আছে” বোঝাতে।
  • “রে” → একধরনের লোকপ্রিয় সম্বোধন/উচ্চারণ রূপ, যা ক্ল্যাসিক্যাল ভাষায় নেই।
  • পিশাচ প্রাকৃত ও আঞ্চলিক অপভ্রংশে “রে” ব্যবহার হতো সহোদরে, সম্বোধনে, এমনকি আবেগ-প্রকাশে।

২. ভণই লুই আম্‌হে ঝাণে দিঠা।

“ভণই লুই”

  • ভণই = “বলে”, ভণতি (সংস্কৃত ধাতু → বলা) এর প্রাকৃত রূপ।
  • পিশাচ প্রাকৃত/অপভ্রংশে বহু স্থানে “ভণই” (bhanai) রূপে ব্যবহৃত হয়।

“আম্‌হে”

  • আমরা বোঝাতে পিশাচ প্রাকৃত ও অপভ্রংশ রূপ → “অম্‌হে” বা “আম্‌হে”
  • সংস্কৃত “अस्मान्” → প্রাকৃত/অপভ্রংশে → “amhē”
  • মাগধীতেও “আম্হে” ব্যবহৃত হয়েছে।

“ঝাণে”

  • ঝাণে = জেনে
  • সংস্কৃত “ज्ञा” (জ্ঞান) → প্রাকৃত “झाण”, झाणे = “জানলাম” বা “জেনে”
  • এটি নিঃসন্দেহে পিশাচ প্রাকৃত/অপভ্রংশ ধারা

“দিঠা”

  • দেখেছি, “দৃশ” ধাতুর রূপান্তর
  • সংস্কৃত दृष्ट → প্রাকৃত/অপভ্রংশ → অবহট্ট / দিঠা
  • পিশাচ ও অপভ্রংশ উভয় ভাষায় ব্যবহৃত

৩. ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা।।

“ধমণ”

  • ধমনী (নাড়ি)
  • শব্দটি সংস্কৃতমূল (ধমনী) হলেও উচ্চারণে “ধমণ” হয়ে গেছে — যা প্রাকৃত-পিশাচী ভাষায় অনুরণিত হয়।

“চমণ”

  • নাড়ি বা প্রবাহের প্রতিরূপ শব্দ — প্রাকৃতধর্মী ছন্দের অংশ

“বেণি”

  • কুন্ডলী/গাঁথা — অপভ্রংশ ধারা

“পিণ্ডি”

  • গেঁথে ফেলা / আবদ্ধ করা (সংস্কৃত: পিণ্ড = দলা, গেঁথে দেওয়া)

“বইঠা”

  • বসে আছি বা বসে রইলাম
  • পিশাচ প্রাকৃত ও অপভ্রংশে → “विठ”, “বিঠ”, “বইঠ” (seat, to sit)
ধ্বনি/রূপসংস্কৃতপিশাচ/অপভ্রংশ রূপচর্যাপদের শব্দ
śūnya → সুন্নशून्यसुन्नসুন্ন
jñā → ঝাণেज्ञानझाणঝাণে
asma → আম্হেअस्मान्अम्हेআম্হে
दृष्ट → দিঠাदृष्टदिट्ठ/दिटाদিঠা
पिण्डপিণ্ডपिंडপিণ্ডি
उपविशत् → বইঠउपविशत्विठ/वुइठবইঠা

চর্যাপদের এই অংশটি অত্যন্ত ধ্বনিগতভাবে পিশাচ প্রাকৃত-ঘেঁষা, এখানে ব্যাকরণগত কাঠামো অপূর্ণ বা বিকৃত ।

Charyapada script

তথ্যসূত্র:

  • চর্যাপদ, সম্পা. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯১৬
  • সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি
  • সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, Origin and Development of Bengali Language, ১৯২৬
  • তন্ময় ভট্টাচার্য, চর্যাপদের ভাষা: সন্ধ্যা ভাষা নাকি প্রাকৃত ভাষার বিবর্তন? (2025)
  • বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাস, ক্ষেত্র গুপ্ত, গ্রন্থনিলয়, কলকাতা, ২০০১,
  • বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, অগ্রহায়ণ, ১৪১০,

চর্যাপদ বাংলা নয়

দুলি দুহি পিটা ধরণ না জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাতা।।
আঙ্গণ ঘরপণ সুণ ভো বিআতী।
কানেট চৌরি নিল অধরাতী।ধ্রু।।
সুসুরা নিদ গেল বিহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ।।ধ্রু।।
দিবসই বহুড়ী কাউই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলেঁ কামরু জাঅ।।ধ্রু।।
অইসন চর্যা কুক্কুরীপাএঁ গাইউ।
কোড়ি মঝেঁ একু হিঅহিঁ সমাইউ।।ধ্রু।। (কুক্কুরীপা)

এক সে সুন্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলঅ বারুণি বান্ধঅ।।
সহজে থির করী বারুণী সান্ধে।
জে অজরামর হোই দিঢ় কান্ধে।।
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইআ।।
আইল গরাহক অপণে বহিআ।।
চউশঠী ঘড়িয়ে দেঢ় পসারা।
পইঠেল গরাহকা নাহি নিসারা।।
এক ঘড়ুলী সরুই নাল।
ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল।। (বিরুপা)


চর্যাপদ ব্যাকরণ

ভিঅড্ডা চাপী জোইণি দে অংকবালী।
কমলকুলিশ ঘাণ্টে করহুঁ বিআলী।।
যোইণি তঁই বিণু খনহি ন জীবমি।
তো মুহ চুম্বী কমলরস পীবমি।।
খেপহু জোইণি লেপ ন জায়।
মণিকূলে বহিআ ওড়িআণে সমাঅ।।
সাসু ঘরে ঘালি কোঞ্চা তাল।
চান্দসূজ বেণি পখা হাল।।
ভণই গুডরী অম্‌হে কুন্দুরে ধীরা।
নরঅ নারী মাঝে উভিল চীরা।। (গুন্ডরী পা)

ভিঅড্ডা চাপী জোইণি দে অংকবালী… এই চর্যাপদের বাক্যসমূহে পিশাচ প্রাকৃতের একাধিক লক্ষণ ধরা পড়ে—

  • ভিঅড্ডা: সম্ভবত “বিভট্ট” বা “বিভ্রষ্ট” জাত শব্দ, যা সংস্কৃত বা সাধারণ প্রাকৃত ধ্বনির অপভ্রংশ (নাসালাইজড ও দ্বিত্বযুক্ত) রূপ। এখানে “ভিঅ” রূপটি পিশাচ প্রাকৃতের একান্ত ধ্বনিগত রূপান্তর।
  • জোইণি: “যোনি” শব্দটির পিশাচ প্রাকৃত রূপ। গলার স্বরবর্ণ ‘য’ থেকে ‘জ’ এবং ‘ন’ দ্বিত্বে পরিণত হয়ে ‘ণি’ যুক্ত হয়েছে — এটি পিশাচ প্রাকৃতের ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য।
  • অংকবালী: সংস্কৃত “অঙ্ক” + “বল্লী” বা “বালিকা” এর পিশাচ রূপ, যেখানে ‘ং’ বা নাসাল যুক্ত হয়েছে এবং শব্দ সংযুক্তি শিথিলভাবে ঘটেছে।
  • বিআলী: সম্ভবত ‘বেলী’ (লতা/গন্ধযুক্ত বস্তু) বা ‘ব্যালী’-এর বিকৃত রূপ, যেখানে উচ্চারণবিধির পরিবর্তন পিশাচ প্রাকৃতের ধ্বনি-স্বভাবকে নির্দেশ করে।
  • খনহি: সংস্কৃত “কদাচিৎ” বা “যখন” এর পিশাচ রূপ। এখানে ‘খ’ ধ্বনি পিশাচ প্রাকৃতের একটি সাধারণ উপাদান, যা সাধারণত মূর্ধন্য ধ্বনিকে প্রতিস্থাপন করে।
  • पībমি (পীবমি): সংস্কৃত “পিবামি” (আমি পান করি) এর পিশাচ রূপ। ক্রিয়া শেষে “মি” যোগ এই প্রাকৃতধর্মী রূপান্তরের লক্ষণ।
  • লাহু: অর্থ ‘সহজ’, ‘হালকা’। পিশাচ প্রাকৃত ও অপভ্রংশে ব্যবহৃত একটি সাধারণ শব্দ। সংস্কৃত “লঘু” এর প্রাকৃত অপভ্রংশ, যেটি পিশাচ প্রাকৃতেও বিদ্যমান।
  • বহিআ: বসা বা অবস্থান করার অর্থে, সংস্কৃত “উপবিষ্ট” বা “উপবিশ্য” এর পিশাচ রূপ, যেখানে “হি” বা “হিয়া” ধ্বনি ঢুকে পড়া একটি স্বাভাবিক লক্ষণ।
  • ওড়িআণে: এটি “ওড়িয়া” (ঢাকা দেওয়া, ঢাকা পড়া) + “আণে” (গমন বা সন্নিবেশ) — পিশাচ প্রাকৃতের যৌগিক শব্দগঠন বৈশিষ্ট্য, যেখানে পূর্বপদ ও উত্তরপদ জোড়ার মধ্যেকার ব্যাকরণিক সংযুক্তি দুর্বল হয়।
  • ঘালি কোঞ্চা: “ঘালি” সম্ভবত ‘ঘষা’ বা ‘রন্ধন’ অর্থে; “কোঞ্চা” সম্ভবত পোশাক/নিম্নাঙ্গ বস্ত্র অর্থে ব্যবহৃত। এই শব্দ যুগল পিশাচ ধাঁচের লৌকিক ব্যবহার নির্দেশ করে।
  • ভণই গুডরী অম্‌হে কুন্দুরে ধীরা:
    • ভণই: পিশাচ প্রাকৃতের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক; প্রাচীন গুরুবাণীর সূচনাকারী শব্দরূপ (“ভণতি” → “ভণই”)।
    • অম্‌হে: পিশাচ প্রাকৃতের প্রথম পুরুষ বহুবচন সর্বনাম। সংস্কৃত “অস্মান্‌” বা প্রাকৃত “অম্‌হে” থেকে এসেছে।
    • উভিল: ‘উভয় + লীন’ বা ‘উপবিষ্ট’—যুগ্মতা বা মিলনের অর্থে ব্যবহৃত, এবং এর লৌকিক রূপান্বিত ধ্বনি-প্যাটার্ন পিশাচ প্রাকৃত নির্দেশ করে।

এইভাবে পুরো পদে পিশাচ প্রাকৃতের ধ্বনি-রূপান্তর, শব্দসংযুক্তির শিথিলতা, অতিপ্রাকৃত ক্রিয়ারূপ (যেমন –মি), ও বিকৃত সর্বনাম ব্যবহারের বহু নিদর্শন লক্ষণীয়।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল