বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)
তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)
চ
বাংলায় (বঙ্গে ) প্রচলিত মুখের ভাষার (গৌড়ীয় ভাষাতে) পাঁচটি প্রধান উপভাষার মধ্যে রাঢ়ী, বঙ্গালি, বরেন্দ্রী, কামরূপী ও ঝাড়খন্ডী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই উপভাষাগুলির মধ্যে রাঢ়ী উপভাষা, বিশেষত কলকাতা, হুগলি, নদীয়া, ও উত্তর চব্বিশ পরগণার উচ্চবর্গীয় ও শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই রাঢ়ী ভাষাভিত্তিক চলনের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ‘ভাষা‘, যেটিকে আমরা চলিত বাংলা বা স্ট্যান্ডার্ড কলোকিয়াল বেঙ্গলি বলি। এই চলিত ভাষাই বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের ও শিক্ষিত সমাজের মুখ্য ভাষারূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চলিত গদ্যরীতির প্রথম দিকের প্রয়োগ দেখা যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাট্যরচনায়, যেমন ‘শকুন্তলা’-র সংলাপে। এরপর প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসে এই ভাষার (আলালী ভাষা) সফল প্রয়োগ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এই কথ্য রীতিকে স্বীকৃতি দিয়ে একে ‘অপরভাষা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং পরে এক প্রবন্ধে একে ‘প্রচলিত ভাষা’ বলেও অভিহিত করেন। এখান থেকেই ‘চলিত ভাষা’ শব্দের প্রয়োগ শুরু হয়।
এই ধারার পূর্ণ বিকাশ ঘটে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬২) গ্রন্থে, যেখানে একেবারে নির্ভেজাল কথ্য ঢঙে রচিত গদ্যের (হুতোমী বাংলা) এক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তবে চলিত রীতির প্রবর্তক হিসেবে প্রমথ চৌধুরীর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বীরবলের হালখাতা’-তে (প্রথমে ভারতীতে প্রকাশিত, পরে গ্রন্থাকারে ১৯১৬ সালে) চলিত গদ্যের প্রথম সফল প্রয়োগ করেন। তাঁর সম্পাদিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজপত্র’ (প্রকাশিত ১৯১৪ সাল থেকে) চলিত ভাষার পক্ষে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক আন্দোলন সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথও চলিত গদ্যে রচনা শুরু করেন, যার প্রথম প্রকাশ ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসটি ১৯১৫ সালে ‘সবুজপত্র’ পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থাকারে আসে ১৯১৬ সালে।
কোম্পানির বাংলা দখলের কিছু পরে, নন্দকুমারেব ফাঁশী হবার কিছু পুর্ব্বে আমাদের বাবুর প্রপিতামহ নিমকের দাওয়ান ছিলেন, সেকালে নিমকির দাওয়ানীতে বিলক্ষণ দশ টাকা উপায় ছিল, সুতরাং বাবুর প্রপিতামহ পাঁচ বৎসর কৰ্ম্ম করে মৃত্যুকালে প্রায় বিশলক্ষ টাকা রেখে যান-সেই অবধি বাবুরা বনেদি বড় মানুষ হয়ে পড়েন। বনেদি বড় মানুষ বলাতে গেলে বাঙ্গালী সমাজে যে সরঞ্জামগুলি আবশ্যক, আমাদের বাবুদের তা সমস্তই সংগ্রহ করা হয়েচে, বাবুদের নিজের একটি দল আছে, কতকগুলি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, কুলীনের ছেলে, বংশজ, শ্রোত্রিয়, কায়স্থ, বৈদ্য, তেলী, গন্ধবেণে আব কাঁসারী ও ঢাকাই কামার নিতান্ত অনুগত… কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬২)
তবে একথা স্মরণে রাখা জরুরি যে, লিখিত চলিত ভাষা অপেক্ষাকৃত আধুনিক; এর আগেই মুখের চলিত ভাষার অস্তিত্ব ছিল। ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ নবদ্বীপ অঞ্চলে মুখের চলিত বাংলা (গৌড়ীয় ভাষা) প্রচলিত ছিল বলে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু হুতোম প্যাঁচার নকশা প্রভৃতি গ্রন্থে যে চলিত রীতির দেখা মেলে, তা রুক্ষ, বেখাপ্পা এবং ভদ্রলোকের ভাষা নয়; বরং এটি তৎকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবর্গের শহরবাসী কথ্য ভাষার রূপ। সত্যিকারের ভদ্রলোক সমাজের ব্যবহার্য চলিত ভাষা পরে প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে সাহিত্যে প্রবেশ করে ও পরিপক্বতা লাভ করে।
চলিত বঙ্গ ভাষার উদাহরণ
“যদ্যপি নববাবুবিলাসে নববাবুদিগের স্বভাব সুপ্রকাশ আছে, কিন্তু সে গ্রন্থের ফলখণ্ডে লিখিত ফলের প্রধান মূল বাবুদিগের বিবি, সেই বিবিরূপ প্রধান মূলের অঙ্কুরাবধি শেষ ফল তাহাতে সবিশেষ ব্যক্ত হয় নাই; এ নিমিত্তে তৎপ্রকাশে প্রয়াসপূর্ব্বক নব বিবি বিলাস নামক এই গ্রন্থ রচনা করিলাম এ গ্রন্থের মূল দেখিলেই সে মূলের আমূল পর্য্য্যন্ত বোধ হইবেক, এবং নববাবুদিগের ন্যায় নববিবিরাও শেষাবস্থায় কীদৃশাবস্থা প্রাপ্তা হয়েন তাহা অনায়াসে প্রকাশ পাইবেক বিশেষতঃ
যাঁহারা সুবোধ অথচ রসিক বাবু তাঁহারা কাহারো কাবু না হইয়া নববাবু ও নববিবি উভয়েরি নষ্ট চরিত্র দেখিয়া আপন২ চরিত্র
পবিত্র করিতে পারিবেন যেহেতুক বিচক্ষণ লোক অন্যের দোষ বিলক্ষণ রূপে সমীক্ষণ পূর্ব্বক আপন দোষ পরিহার করিয়া সাবধান হয়েন। শাস্ত্রে কথিত আছে, সর্ব্বত্র ত্রিবিধালোকা উত্তমাধম মধ্যমাঃ” (ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৮৩০খ্রিস্টাব্দ)।
“হরিণটা দেখ্তে দেখ্তে কোন্ দিকে গেল হে? কি আশ্চর্য্য! আমি কি নিদ্রায় আবৃত হয়ে স্বপ্ন দেখ্ছি? আর তাই বা কেমন করে বলি। এই ত ভগবান্ বিন্ধ্যাচল অচল হয়ে আমার সম্মুখে রয়েছেন। (চিন্তা করিয়া) এই পর্ব্বতময় প্রদেশে রথের গতির রোধ হয় বল্যে, আমি পদব্রজে হরিণটার অনুসরণ ক্লেশ স্বীকার কর্যে অবশেষে কি আমার এই ফল লাভ হলো যে আমি একলা একটা নির্জ্জন বনে এসে পড়লেম? মরুভূমিতে মরীচিকা বারিরূপে দর্শন দেয়; তা এ স্থলে কি সে মায়ামৃগ হয়ে আমাকে এত বৃথা দুঃখ দিলে! সে যা হৌক, এখন এখানে কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম কর্যে এ ক্লান্তি দূর করা আবশ্যক। (পরিক্রমণ করিয়া) আহা! স্থানটি কি রমণীয়! বোধ করি এ কোন যক্ষ কিম্বা গন্ধর্ব্বের উপবন হবে। প্রকৃতি, মানব জাতির লোচনানন্দের নিমিত্তে, এমন অপরূপ রূপ কোথাও ধারণ করেন না। আমি এই উৎসের নিকটে শিলাতলে বসি। এ যেন কলকল রবে আমাকে আহ্বান কচ্যে। (উপবেশন করিয়া সচকিতে) এ কি? এ উদ্যান যে সহসা অপূর্ব্ব সুগন্ধে পরিপূর্ণ হতে লাগলো? (আকাশে কোমল বাদ্য) আহা! কি মধুর ধ্বনি”। (মধুসূদন দত্ত, পদ্মাবতী নাটক, ১৮৬০ খ্রী)
ফসলখেতে ফলবাগানে রেলগাড়ি করে জল যোগাতে হলে জমির বিঘে-পিছু আস্ত এক ট্রেন জলের টাঁকি দরকার হত,—ভাগ্যিস্ তা করতে হয় না। তবে রেলেরই মতো বাঁধা পথে জল আসাযাওয়ার চক্কর খায়। আসার লাইন আকাশের ভিতর দিয়ে—সাগর থেকে ডাঙা; ফেরত লাইন মাটির উপর দিয়ে—ডাঙা থেকে সাগর। ফিরতি পথে, নদী বেয়ে যাবার সময়, জলে বিস্তর মাল বোঝাই থাকে,—এঁটেলমাটি, রকম বেরকমের নুন, কিছু কিছু ধাতু, প্রাণীর দেহপুষ্টির কাজে লাগে এমন অনেক জিনিস; শেষে এগুলোকে সমুদ্রে ঢেলে দিয়ে, মেঘ হয়ে, জল আকাশপথে হালকা চলে আসে। ঐ মাল যদি সব-কে-সব সমুদ্রে ফেলা যেত, তাহলে ডাঙার জমি ক্রমশ অসার হয়ে, প্রাণী বাঁচিয়ে রাখার অযোগ্য হয়ে পড়ত। কিন্তু গাছের কল্যাণে ধরিত্রীর সে দশা ঘটতে পায় না। (সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বমানবের লক্ষ্মীলাভ, ১৯৪০)
