ভাদু উৎসব

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

কোল রাজবংশের দেবী ভাদ্রাবতী থেকে ভাদু গানের যাত্রা, টুসু-ভাদুর নারীকণ্ঠ, এবং পৈশাচী প্রাকৃতের লোকসংগীত ঐতিহ্য

ভাদু উৎসব পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের একটি প্রাচীন লৌকিক পরব, যার বিস্তার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল মহকুমা ও ঝাড়খণ্ডের রাঁচি এবং হাজারিবাগ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ভাদ্র মাসজুড়ে পালিত এই উৎসব নারীকেন্দ্রিক উপাসনা ও গান-নৃত্য-আচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ যুবতী ও কুমারী কন্যাদের মধ্যে ‘ভাদু’ গান বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এই গানগুলি প্রেম বা রাজনীতির বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থেকে গৃহনারীদের দৈনন্দিন জীবনের কাহিনী, সামাজিক বোধ ও পৌরাণিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে রচিত হয়। ভাদু দেবীকে বিবাহযোগ্যা রমণীরূপে পূজা করা হয় এবং ভাদ্র সংক্রান্তির দিন প্রতিমা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিশেষ করে বীরভূম জেলার বহু অঞ্চলে পয়লা ভাদ্রে একজন কিশোরকে নারীবেশে সাজিয়ে তার কোলে ভাদু প্রতিমা বসিয়ে গান গেয়ে ও নাচ করে একটি পুরুষদল গ্রামে গ্রামে অর্থ সংগ্রহ করে। আবার, বধূবেশে সাজানো কন্যাদের দল মাটির পাত্রের সামনে বসে সমবেতভাবে গান করে। এই গান শুরু হয় প্রায় রাত নয়টা-দশটার দিকে এবং এগুলি নানা পাঁচালির সুরে গাওয়া হয়। একটি পরিচিত ভাদু গানে বলা হয়েছে:

“সব খাওয়ালে দাদা, না খাওয়ালে গিমারে
আর কি আসিব দাদা পুরুল্যারি সীমারে।”

এই পরবে ব্যবহৃত ‘ভাদু’ ও ‘টুসু’ দেবী ছিলেন আদিতে কোল সংস্কৃতির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। টুসু কোথাও তুযু, তুষলী, তোষলা বা তোসলি নামেও পরিচিত। রাজশেখর (৮৫০-৯০০ খ্রিঃ) রচিত কাব্যমীমাংসা-য় তুষলী বা তোসলির উল্লেখ পাওয়া যায়, যার অবস্থান ধৌলিগিরির কাছাকাছি ওড়িশা অঞ্চলে। এই অঞ্চল এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলা, ঝাড়খণ্ড ও পুরুলিয়া অঞ্চলে কোল রাজাদের শাসন চলত, যারা শবর, কিরাত ও পুলিন্দদের সঙ্গে কৌলিন্য ও সামরিক বংশগৌরবে যুক্ত ছিলেন। কোলদের ভাষা ছিল পৈশাচী প্রাকৃত। তাদের রাজ্য খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। টুসু ও ভাদু উভয়ই নারীত্বের প্রতীক; ভাদু বর্ষাকালের রূপক ও নারীত্বের চিরন্তন প্রতিমা, যেখানে টুসু ধানের মাঠের নারীকণ্ঠে সৃষ্ট ভ্রূণপ্রতিম সঙ্গীতরূপ।

ভাদু গানের দুই ধারাই লক্ষণীয়। একদিকে রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয়া দরবারি ভাদু, যা পঞ্চকোট রাজপরিবারের ধ্রুবেশ্বরলাল সিংদেও, প্রকৃতীশ্বরলাল সিংদেও ও রাজেন্দ্রনারায়ণ সিংদেও-র নেতৃত্বে বিকশিত হয়। হারমোনিয়াম, তবলা, পাখোয়াজ ও সানাই সহযোগে গাওয়া এই ভাদু গানগুলিতে মার্গধর্মী কাব্যিক ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। অপরদিকে, জনপ্রিয় লোকমুখে প্রবাহিত হয়েছে লৌকিক ভাদু গান, যা একেবারে মৌখিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে। বাংলার লোকশিল্পী রতন কাহার (জ. ১৯৩৫) ভাদু ও ঝুমুর গানের বিশিষ্ট ধারক।

ভাদু গানে নারীর জীবনের বিভিন্ন চিত্র এবং নানাবিধ সামাজিক পরিস্থিতি কাব্যিক রূপে গঠিত হয়। কিছু গান অত্যন্ত সরল অথচ আবেগময়, যেমন—

“তেঁতুল পাতে তেঁতুল পাতে ননদী ঘুমায় গো
উঠ ননদ, খাও ননদ, যাও শ্বশুর বাড়ী গো।”

এই জাতীয় গান কেবল উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, একেবারে নারীমনের অন্তঃস্বরূপকে প্রকাশ করে। আবার কিছু গান সামাজিক বিদ্রূপ ও চিত্রকল্পে ভরা:

“কাশীপুরের রাজার বিটি, বাগদি ঘরে কী কর?
কলসী কাঁধে লয়ে পরে, সুখ সাগরে মাছ ধর।”

ভাদু উৎসব রাঢ় বাংলার নারীর কণ্ঠে বহমান এক অমোঘ সাংস্কৃতিক ধারা, যেখানে প্রকৃতি, দেবতা, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস মিলেমিশে এক অনন্য সাংগীতিক ও নৃতাত্ত্বিক ধারা তৈরি করে।

গ্রন্থপঞ্জি

১. ব্যানার্জী, দেবাশীষ প্রমুখ। পোস্টহিউম্যানিজম অ্যান্ড ইন্ডিয়া: অ্যা ক্রিটিক্যাল কার্টোগ্রাফি। ব্লুমসবারি ইন্ডিয়া, ২০২৫।

২. বম্পাস, সিসিল হেনরি। সাঁওতাল পরগনার লোককথা। ১৯০৯।

৩. কারসন, র‍্যাচেল। সাইলেন্ট স্প্রিং। পেঙ্গুইন বুকস, ২০২০।

৪. চৌধুরী, অজয় সিং। দি এক্জস্টেড অফ দি আর্থ: পলিটিক্স ইন আ বার্নিং ওয়ার্ল্ড। রিপিটার বুকস, ২০২৪।

৫. গ্রিগনার্ড, এ. হান-এর ওড়াঁও ফোকলোর ইন দ্য অরিজিনাল। ১৯৩১।

৬. গ্রোসবার্গ, লরেন্স প্রমুখ। কালচারাল স্টাডিজ। রাউটলেজ, ১৯৯২।

৭. হাগান, গ্রাহাম এবং হেলেন টিফিন। পোস্টকলোনিয়াল ইকোক্রিটিসিজম: লিটারেচার, অ্যানিম্যালস, এনভায়রনমেন্ট। রাউটলেজ, ২০১৫।

৮. কিরো, সন্তোষ। মুন্ডা ফোকটেলস অ্যান্ড এলিফ্যান্ট স্টোরিজ। বৈভব পাবলিকেশন, ২০২৩।

৯. কিমারার, রবিন ওয়াল। ব্রেইডিং সুইটগ্রাস: ইন্ডিজেনাস উইজডম, সায়েন্টিফিক নলেজ অ্যান্ড দ্য টিচিং অফ প্লান্টস। মিল্কউইড এডিশন্স, ২০১৩।

১০. মাহাতো, পশুপতি প্রসাদ। সংস্কৃতিকরণ বনাম নির্বাকীকরণ। ২য় সংস্করণ, কলকাতা: পূর্বলোক পাবলিকেশনস, ২০১২।

১১. মালহোত্রা, নিশি। সাসটেইনেবল পাথওয়েজ: দি রোল অফ ইন্ডিজেনাস ট্রাইবস অ্যান্ড নেটিভ প্র্যাকটিসেস ইন ইন্ডিয়াস ইকনমিক মডেল। এমেরাল্ড পাবলিশিং লিমিটেড, ২০২৪।

১২. মুখোপাধ্যায়, রামকুমার এবং সঞ্জুক্তা দাশগুপ্ত। ইন্ডিয়ান ফোক নারেটিভস। সাহিত্য অকাদেমি, ২০২২।

১৩. মুন্ডা, রাম দয়াল। আদিধর্ম। কলকাতা: আদিবাণী, ২০১৪।

১৪. নায়ার, প্রমোদ কে। কনটেম্পোরারি লিটারারি অ্যান্ড কালচারাল থিওরি: ফ্রম স্ট্রাকচারালিজম টু পোস্টহিউম্যানিজম

১৫. রায়, শরৎচন্দ্র। দ্য মুন্ডাস অ্যান্ড দেয়ার কান্ট্রি। ইউনিভার্সাল লাইব্রেরি, ১৯১২।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল