বাংলার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার

Encyclopedia of Bengali Language and Literature

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার অব্দে বঙ্গভূমিতে যে প্রাকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল, তা ছিল মাগধী প্রাকৃত বা পিশাচ প্রাকৃত নামে পরিচিত একটি প্রাচ্য উপভাষা। সেই প্রাকৃত ভাষা বিবর্তিত হয়ে অপভ্রংশ এবং পরবর্তীতে অবহট্ঠ রূপে রূপান্তরিত হয়। ১০০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, বাংলাভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অতীতে বৈদিক ভাষা দুটি প্রবাহে বিকশিত হয়েছিল—সংস্কৃত এবং প্রাকৃত। এই প্রাকৃতের একটি রূপ মাগধে পালি নামে পরিচিত হয়। প্রাকৃত ছিল সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী বাজার, বাণিজ্য ও জনব্যবহৃত ভাষা, যেখানে সংস্কৃত ছিল উচ্চশিক্ষা ও রাজসভা-সংলগ্ন ভাষা।

সংস্কৃতভাষী হওয়া ছিল শিক্ষার প্রতীক। সংস্কৃত এবং বিভিন্ন প্রাকৃতের সমষ্টিগত রূপকে বলা হতো নাগরী ভাষা, যাদের নিজস্ব ব্যাকরণ ছিল নাগরী ব্যাকরণ। এই নাগরী ভাষার বিস্তার ছিল বল্খ/বহলিকা (পশ্চিম আফগানিস্তান) থেকে শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) পর্যন্ত এবং উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারী পর্যন্ত। শ্রীলঙ্কাবাসীরাও প্রাথমিকভাবে এক ধরনের প্রাকৃত ভাষায় কথা বলত, পরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে পালি ভাষা সেখানে প্রবেশ করে।

যদি প্রশ্ন তোলা হয় যে খাঁটি বাংলাভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার কত বড়, তাহলে বলা যায় যে এটি প্রায় ৭৫,০০০ থেকে ৮০,০০০ শব্দে সীমাবদ্ধ, যার মধ্যে সংস্কৃত, প্রাকৃত ও পিশাচ প্রাকৃতজাত শব্দ অন্তর্ভুক্ত। গুণাঢ্য তাঁর বৃহৎকথা রচনা করেছিলেন পিশাচ ভাষায়, কারণ এটি ছিল বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভাষা। রাজশেখর তাঁর কাব্যমীমাংসা গ্রন্থে এই নিম্নস্তরের পিশাচ প্রাকৃতকে ভূত ভাষা নামে অভিহিত করেন। ভূত ভাষা ছিল ধ্বন্যমূলক, যেমন—বাড্ডা, হাড্ডি, লাপসী, কাবজি ইত্যাদি শব্দ।

এই বাংলাভাষার শব্দভাণ্ডারে বিদেশি শব্দ গণনায় ধরা হয় না। যেমন নিম্নলিখিত শব্দগুলি সম্পূর্ণভাবে সংস্কৃতজাত এবং এরা ভারতের বাইরের কোনো উৎস থেকে আগত নয়: প্রারম্ভ, ভ্রুবিভ্রম, উড়নচন্ডী, ঘটিরাম, জাতিভ্রংশ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, পল্লীমঙ্গল, দ্রাক্ষাকুঞ্জ, দিবানিশি, বসুন্ধরা, প্রহেলিকা, মঞ্জুঘোষ, যুধ্বংদেহি, রিনিঝিনি, হাপুসনয়ন, সাহিত্যানন্দ, অনাঘ্রাতা, আঁকাবাঁকা, কুরুক্ষেত্র, অরুন্ধতী, শান্তিনিকেতন, স্বর্গসুখ, কাটখোট্টা, চারুকলা, দোর্দণ্ডপ্রতাপ, ধ্রুবতারা, শাখামৃগ, নকশিকাঁথা, পঞ্চায়েত, বহুব্রীহি, যৌবনচাঞ্চল্য, রূপমাধুরী, লোকহিতৈষী, অবগুন্ঠন, ভূতবিদ্যা, ধুন্ধুমার, স্ফূর্তি, প্রভৃতি।

আমরা যেসব শব্দ বাংলাভাষায় পাই, তাদের উৎসের খোঁজ নিলে দেখা যায় যে বহু শব্দ আদিতে সংস্কৃত থেকেই আগত। সংস্কৃতের কোনো শব্দ পালি, প্রাকৃত বা পিশাচ প্রাকৃতের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে বাংলায় প্রবেশ করেছে। যেমন—অঘটনঘটনপটিয়সী, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নিশীথবনভ্রমণবিলাসিনী প্রভৃতি যৌগিক শব্দ। বাংলা ভাষার শুদ্ধ রূপ এই সংস্কৃতধর্মী বাংলাই। বাংলার শব্দসম্ভারকে তৎসম ও তদ্ভব ইত্যাদি নিস্প্রাণ শ্রেণিতে বিভক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন—শ্রেষ্ঠ, উৎকৃষ্ট, সর্বোত্তম, উত্তম, সুন্দর, রমণীয়, সুশ্রী, সুঠাম, অনিন্দিত, চিকণ ইত্যাদি—সবই বাংলাভাষার ধন। এগুলিকে তৎসম বা তদ্ভব বললে ভাষার মাধুর্য খণ্ডিত হয়।

বাংলা ভাষার মূল উদ্দেশ্য হলো যোগাযোগ, বাণিজ্যের বিকাশ এবং বহিরাগত আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা। এই ভাষার জন্ম কোনো বৈদেশিক ভাষার অঙ্গজ হিসেবে নয়। আমরা কোনো ইন্দো-ইউরোপীয় বা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতত্ত্ব গ্রহণ করি না। বরং জোর দিয়ে বলি, বৈদিক ভাষাই ছিল ইউরোপীয়, গ্রিক, লাতিন ও প্রাচীন পারস্যীয় ভাষার জননী।

সাঁওতালি, মুন্ডারি, খাসি, হো ইত্যাদি ভাষাসমূহের উৎপত্তিও ভারতীয় ভূখণ্ডেই। এই ভাষা ভাষীগণ কোল উপভাষায় (এই ভাষা ভাষীগণ) কথা বলে। তাদের ভাষা কোনো চীন-তিব্বতি বা তথাকথিত অস্ট্রিক (অস্ট্রো-এশিয়াটিক) ভাষা নয়।

নিচে কিছু শব্দ তালিকা দেওয়া হলো, যেগুলি বাংলা ও সাঁওতালি/মুন্ডারি ভাষায় একরূপ এবং ভারতীয় সংস্কৃতিরই অঙ্গ:

১. উদ্ভিদ ও কৃষি: আম, জাম, কচু, ডুমুর, পানা, শাল, বাঁশ, তাল, মুড়ি, খই
২. জীবজন্তু: বাঘ, হাতি, গোসাপ, কাক, মাছ, ঝিঁঝি, বোলতা, জোঁক
৩. গৃহস্থালি: ঝুড়ি, ডালা, চুলা, খুঁটি, হাঁড়ি, কোদাল, লাঙ্গল
৪. প্রকৃতি: ঝর্ণা, ঝড়, ডাং, গাঁ
৫. শরীর ও আত্মীয়তা: মা, বাবা, চোখ, নাক, দাঁত
৬. কর্ম ও ক্রিয়া: ঝাঁপানো, খোঁড়া, ঝুলানো
৭. অন্যান্য: খোকা, খুকি, লাফ, মুঠো

ব্রিটিশ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি যখন ভারতে আসে, তখন তারা এই ভূখণ্ডকে সম্পদে সমৃদ্ধ, কৃষিনির্ভর এবং রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ক দেখতে পায়। মুসলিম শাসনের দীর্ঘকালীন উপস্থিতি এবং পরবর্তী ব্রিটিশ দখলনীতি ছিল বাণিজ্য এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ওপর নির্ভরশীল। তারা আরও লক্ষ্য করল যে, মুহাম্মদীয় (মুসলমান) শাসকরাও এই ভূখণ্ডকে পুরোপুরি ইসলামী ভূখণ্ডে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে—হোক তা লাহোরে, অথবা আগ্রাতে।

অতএব, ব্রিটিশ শাসকরা, তাঁদের সরকারী ইন্দোলজিস্টদের মাধ্যমে এবং খ্রিস্টীয় মিশনারিদের সহায়তায়, ভারতীয় স্থানীয় জনগণ এবং তাদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করল। তারা সর্বভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতির উপর সুনির্দিষ্টভাবে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। এই উদ্দেশ্যে তারা বৈদিক সাহিত্যের কয়েকটি শব্দ ও ধারণাকে বেছে নিয়ে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিতে থাকে, যাতে ভারতীয়দের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। তাদের এই প্রয়াস ছিল সুপরিকল্পিত, সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম করার একটি কৌশল। ইউরোপীয় শক্তি যা আমেরিকায়, ইনকা, আজটেক ও মায়া সভ্যতার সঙ্গে করেছিল, ভারতের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র (জ্ঞানশক্তিবিত্তব্যবস্থা) ছিল একটি প্রাচীনতর ও ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান, যা ছিল জীবনব্যবস্থাকেন্দ্রিক। এই কারণেই ভারতীয় সংস্কৃতির আত্মগৌরব ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় ছিল,তাকে চার্চ (Church) হরে হয় নি। ‘দ্রাবিড়’ শব্দটিকে ব্যবহার করে জাতিগত বিভাজন আনার চেষ্টা করা হলেও, এর মধ্যে কোনো রক্তগত ভিন্ন পরিচয় নেই । ‘দ্রাবিড়’ শব্দের অর্থ সংস্কৃতে হচ্ছে ‘সমুদ্রসন্নিহিত ভূমির বাসিন্দা’।

‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ কিংবা পরবর্তী কালে উদ্ভাবিত ‘আর্য অভিবাসন তত্ত্ব’ কোনো ঐতিহাসিক সত্য নয়, বরং বৈদেশিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃষ্টি থেকে উদ্ভূত। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ উল্লেখ করে যে বঙ্গ, মগধ, চের প্রভৃতি জাতিগণ বৈদিক অনুশাসন অমান্য করে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। এই অভিবাসনে তারা সঙ্গে নিয়ে আসে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডার, এবং পরে প্রাকৃতের আধিপত্য বিস্তার করে নিজস্ব প্রাকৃতরূপে বাংলাভাষার ভিত্তি স্থাপন করে। পালি ভাষায় এমন কোনো শব্দ নেই যেগুলি সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত নয়। আসামিয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি, ভোজপুরী, মগধি ইত্যাদি ভাষাও বাংলার সঙ্গে একাধিক শব্দ ভাগ করে।

ফলে বাংলা শব্দ ভান্ডার স্বকীয় ভাব ও গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ, মাধুর্যের চন্দ্রছটায় চরিতার্থ। বাংলা ভাষা বৈদিক ও প্রাকৃত ভিত্তিক, সর্বজনীন, সংস্কৃতিনির্ভর ও আত্মরক্ষামূলক ভাষা হয়েও জীবন্ত এবং অবিভাজ্য সত্তায় বর্তমান।


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল