শ্রীহট্ট থেকে সিলেট: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের ধারাবাহিক বিবর্তন

শ্রীহট্ট থেকে সিলেট: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের ধারাবাহিক বিবর্তন

প্রাচীন হিন্দু রাজ্য থেকে মুঘল ও ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত শ্রীহট্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়পত্র

ঐতিহাসিকভাবে সিলেট অঞ্চলটি শ্রীহট্ট নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে এই অঞ্চল হিন্দু রাজাদের অধীনে বঙ্গ, হরিকেল ও কামরূপ রাজ্যের অংশ হিসেবে শাসিত হতো। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে মানুষের বসবাস বৃদ্ধি পায় এবং এই সময় শ্রীহট্ট হরিকেল নামেও পরিচিত ছিল। পরে চন্দ্র, সেন ও দেব রাজবংশ এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়। দশম শতকে মহারাজা শ্রীচন্দ্র শ্রীহট্ট জয় করে একটি প্রশাসনিক বিভাগ স্থাপন করেন—“শ্রীহট্টমণ্ডল”—যা সামন্ত রাজারা পরিচালনা করত। শ্রীচন্দ্রের শাসনকালে দক্ষিণ শ্রীহট্টে ব্রাহ্মণদের জন্য ভূমি দানপত্র পাওয়া গেছে, যার প্রমাণ মেলে মৌলভীবাজার জেলার পশ্চিমভাগে প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে।

এই হিন্দু রাজত্বের পতনের পর শ্রীহট্ট নানা স্বল্প ক্ষুদ্র রাজ্যের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেমন গৌড়, লাউড়, ইটা, তরফ এবং জৈন্তিয়া। একাদশ শতকে কেশব দেব এবং ঈশান দেবের শাসনকালে শ্রীহট্ট একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আল্-বেরুনির “কিতাবুল হিন্দ” গ্রন্থে এই অঞ্চলকে ‘সীলাহেত’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে হজরত শাহ্ জালাল সিলেট জয় করেন, ফলে অঞ্চলটি মুসলিম সুলতানদের অধীনে আসে এবং জালালাবাদ নামে পরিচিত হয়। এরপর এটি দিল্লির সুলতানদের অধীনে লখনৌতির শাসনাধীন হয়।

ঐতিহাসিকভাবে শ্রীহট্ট শব্দের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। হিন্দু পৌরাণিক মতে, শিবের স্ত্রীর সতীর হস্ত এখানে পতিত হয়, সেইজন্য স্থানটির নাম হয় ‘শ্রীহস্ত’, যা পরবর্তীতে ‘শ্রীহট্ট’ নামে পরিচিত হয়। সংস্কৃত ‘হট্ট’ শব্দের অর্থ বাজার বা বাণিজ্য কেন্দ্র, অর্থাৎ ‘শ্রীহট্ট’ মানে ঐশ্বর্যময় বাণিজ্যকেন্দ্র। ‘শক্তিসঙ্গমতন্ত্র’, ‘যোগিনীতন্ত্র’, ‘বৃহন্নলীতন্ত্র’ ও ‘দেবীপুরাণে’ শ্রীহট্টের উল্লেখ আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাক্ত পীঠস্থান হিসেবে। আবার এক শ্রুতি অনুসারে, রাজা গুহক তাঁর কন্যা শীলাদেবীর নামে স্থাপন করেন শীলাহাট, যা পরে ‘শিলট’, তারপর ‘সিলেট’ নামে রূপান্তরিত হয়।

এই অঞ্চলটি পাথরের প্রাচুর্যের জন্যও পরিচিত ছিল বলে অনেকের মতে ‘শীল’ (পাথর) ও ‘হাট’ (বাজার) শব্দ দুটি মিলে ‘শীলহাট’ বা পরে ‘সিলেট’ (1) নামের উৎপত্তি হয়েছে। অপর একটি মত অনুসারে ‘সিল’ মানে শীল এবং ‘হেট’ মানে হাট; প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল বলে এই নাম গৃহীত হয়েছে।

মধ্যযুগীয় বাংলায় সংস্কৃত ও ধর্মচর্চার তিনটি প্রধান কেন্দ্র ছিল—শ্রীহট্ট বা সিলেট, কুমারহট্ট বা হালিশহর এবং নবহট্ট তথা নবদ্বীপ। শ্রীহট্টের ব্রাহ্মণ সমাজ ছিল বিশেষভাবে বৈদিক সংস্কারে গড়া এবং তাঁরা বৈদিক শাস্ত্রচর্চায় প্রাজ্ঞ ছিলেন। শ্রীহট্টেই জন্মগ্রহণ করেন গদাধর ন্যায়সিদ্ধান্তবাগীশ, যিনি রঘুনাথ শিরোমণির প্রিয় ছাত্র এবং জগদীশ তর্কালঙ্কারের গুরু। নবদ্বীপে টোল স্থাপন করে গদাধর সেখানেই জীবন শেষ করেন। তাঁর রচিত “চিন্তামণি আলোক” ও “দীধিতি” টীকাগুলি ‘গদাধরী’ নামে বিখ্যাত। তাঁর প্রধান ছাত্র জগদীশ তর্কালঙ্কার রচনা করেন “শব্দশক্তি প্রকাশিকা” ও “তর্কামৃত”—যা ন্যায় এবং বৈশেষিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

শ্রীহট্টের ব্রাহ্মণ সমাজের মধ্যে আরও খ্যাতিমান ছিলেন রাধাকান্ত সিদ্ধান্তবাগীশ, যিনি নবদ্বীপে অধ্যাপনা করেন। ঐতিহ্যগতভাবে সংস্কৃত পণ্ডিতেরা বলতেন—“ছিলটিয়া গদা সোনার গদা।”

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্বপুরুষেরা শ্রীহট্ট জেলার দক্ষিণ ঢাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্র মিশ্র পুত্র জগন্নাথ মিশ্রকে পাঠিয়েছিলেন নবদ্বীপে শাস্ত্র শিক্ষা গ্রহণের জন্য, যেখানে চৈতন্যদেব পরবর্তীতে জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের পূর্বসূরিরা উড়িষ্যার মাজপুর থেকে শ্রীহট্টে এসেছিলেন। চৈতন্যদেব নবদ্বীপ থেকে হেঁটে শ্রীহট্টে এসে মাধবেন্দ্রপুরীর ভাইপো ঈশ্বর পুরীর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে নীলাচল অভিমুখে যাত্রা করেন।

১৬১২ সালে শ্রীহট্ট মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৭৬৫ সালে এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীনে আসে। ১৮৭২ সালে ভাটেরায় প্রাপ্ত তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে নবনীর্বাণ, গণগুণ নারায়ণ ও গোবিন্দ কেশব দেব এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন।

সিলেট তথা শ্রীহট্ট অঞ্চল বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মচর্চা এবং বাণিজ্যের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

(1) সিলেট (শিলার হাট) জেলার উত্তরে  রয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, পূর্বে ভারতের আসাম রাজ্য এবং পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা।

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল: 7th May 2025

Undivided Bengal

Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল