চর্যাপদের ভাষা: সন্ধ্যা ভাষা নাকি প্রাকৃত ভাষার বিবর্তন?

চর্যাপদের ভাষা: সন্ধ্যা ভাষা নাকি প্রাকৃত ভাষার বিবর্তন?

চর্যাপদের ভাষা: প্রাকৃত ভাষা

প্রাচীন বাংলার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলির সন্ধানে প্রাকৃত বাংলায় রচিত চর্যাপদ (Charyapad) একটি অনুপূরক উপাদান। চর্যাপদ, যা ৮ম-১০ম শতাব্দীর মধ্যে রচিত, বাংলা ভাষার প্রাথমিক পর্যায়ের ভাষাগত অবস্থা ও গঠনরূপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে চিহ্নিত। এটি বাংলা ভাষার বিবর্তনমূলক ইতিহাসে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয় কিছু গবেষকের মতে, যা পরবর্তী ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তি স্থাপন করে। কিন্তু আমরা দেখাবো যে চর্যাপদ একটি সহজিয়া ধারণা, বৈদিকধর্মের সঙ্গে সঙ্গতিহীন এবং এটি মূলত বৌদ্ধধর্মের একটি বিচ্যুত ধারা।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ The Origin and Development of the Bengali Language প্রকাশের মাধ্যমে প্রথম এই বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন। তিনি ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে চর্যাপদের ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য, শব্দপ্রকৃতি এবং ভাষার পরিবর্তনশীল গঠন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।

পরবর্তী যুগে ডক্টর সুকুমার সেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, তারাপদ মুখোপাধ্যায়, পরেশচন্দ্র মজুমদারডক্টর রামেশ্বর শ’—এই বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ও গবেষকরা চর্যাপদের ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন এবং বিভিন্ন ভাষাগত বৈশিষ্ট্য যেমন ধ্বনিগত, ব্যাকরণগত ও শব্দগত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তাঁদের কাজ বাংলার ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা আজও ভাষাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

এই সকল ভাষাবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণায় চর্যাপদের ভাষার বৈশিষ্ট্যগুলিকে সুনিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, যা বাংলার ভাষাগত বিবর্তন এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গভীর ধারণা প্রদান করে।

যত গূহ্য অধ্যাত্মসাধনার গূহ্যতর তত্ত্বই ইহাদের মধ্যে নিহিত থাকুক না কেন, স্থানে স্থানে এমন পদ দু’চারটি আছে যাহার ধ্বনি, ব্যঞ্জনা ও চিত্রগৌরব এক মুহূর্তে মন ও কল্পনাকে অধিকার করে। অথচ, এ-কথাও সত্য যে, সাহিত্যসৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই গীতগুলি রচিত হয় নাই, হইয়াছিল বৌদ্ধ সহজসাধনার গূঢ় ইঙ্গিত ও তদনুযায়ী জীবনাচরণের (চর্যার) আনন্দকে ব্যক্ত করিবার জন্য। সহজ সাধনার এই গীতিগুলি কর্তৃক প্রবর্তিত খাতেই পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সহজিয়া গান, বৈষ্ণব ও শাক্ত-পদাবলী, আউল-বাউল-মারফতী-মুর্শিদা গানের প্রবাহ বহিয়া চলিয়াছে।…বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

চর্যাপদ: ভাষা, প্রকৃতি ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ সালে নেপাল রয়েল কোর্ট লাইব্রেরিতে আবিষ্কৃত পুঁথিটি “চর্যাপদ” নামে পরিচিত। এটি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে অনেকে গ্রহণ করলেও, প্রকৃতপক্ষে এর ভাষা আদৌ বাংলা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। “সন্ধ্যা ভাষা” নামে একটি কাল্পনিক নাম ব্যবহার করে একে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কারণ এটি সহজবোধ্য নয় এবং এতে গূঢ় তাত্ত্বিক বার্তা লুকানো থাকতে পারে। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা এতে ‘গভীর’ দার্শনিক তত্ত্ব সংযুক্ত করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

চর্যাগীতির ভাষা: বাংলা নাকি অন্য কিছু?

চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি না, তা নির্ধারণের জন্য আমরা চৈতন্যচরিতামৃত (১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দ) কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। চর্যাপদ ও চৈতন্যচরিতামৃতের ভাষাগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার পূর্বসূরী হলেও সরাসরি বাংলা নয়। বরং এটি পূর্বী প্রাকৃত ও মৈথিলি ভাষার সংমিশ্রণে গঠিত। দশম শতাব্দীতে বাংলার সাহিত্যিক বা ভাষাগত অবস্থান সম্পর্কে মন্তব্য করার জন্য চর্যাপদের অপর্যাপ্ত উপাদান গ্রহণ করা যাবে না। সেই সময়ের আরও উপকরণ আবিষ্কারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

চর্যাপদের সঙ্গীত ও রাগ

চর্যাগীতিতে বিভিন্ন রাগ ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন—

  • লুইপাদ ব্যবহার করেছিলেন রাগ পাটমনজরী।
  • চট্টিলপাদ পঞ্চম গানে ব্যবহার করেছেন গুজ্জর নামক এক প্রাচীন রাগ।

এই সঙ্গীতরীতির উৎস কোথায়? অনেক গবেষক মনে করেন, এগুলোর ছায়া পাওয়া যায় প্রাকৃত ভাষায় রচিত “গাথাসপ্তশতী” গ্রন্থে। এটি নির্দেশ করে যে চর্যাগীতি বাংলা লোকসংগীতের মূল ভিত্তি ছিল না, বরং প্রাকৃত ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

পাল যুগের ভাষা ও সংস্কৃতি

৯৫০-১০৫০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গ অঞ্চলের নাম ছিল গৌড়, যেখানে পাল রাজবংশের শাসন চলছিল। পাল যুগে—

  • রাজদরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত।
  • সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল মৈথিলি ও পূর্বী প্রাকৃত।
  • চর্যাপদ যে ভাষায় লেখা, তা গৌড়ভূমির প্রচলিত ভাষা ছিল না।

চৈতন্যচরিতামৃত ও প্রামাণ্য বাংলা ভাষা

১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত” বাংলা ভাষার একটি প্রামাণ্য রূপ উপস্থাপন করে। কাব্যে ব্যবহৃত ভাষা আধুনিক বাংলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা চর্যাপদের ভাষার তুলনায় অনেক বেশি পরিশীলিত।

চর্যাপদ: গৌড়ের না তিব্বতের?

চর্যাপদের কবিদের নাম বিচার করলে দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই তিব্বতীয় অথবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। এটি ইঙ্গিত করে যে চর্যাগীতির উৎপত্তিস্থল গৌড় রাজ্যের(Gouda) বাইরে ছিল এবং এটি এক প্রকার তান্ত্রিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের গীতসংকলন।

ধর্মীয় ও ভাষাগত দৃষ্টিকোণ

সনাতন ধর্ম (Sanatan Dharma) হাজার বছর ধরে অব্যাহত থেকেছে, এবং চর্যাপদের মত একটি বিচ্ছিন্ন সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষার প্রাথমিক নিদর্শন হতে পারে না। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য সংস্কৃত-প্রভাবিত, যা কাব্যগুরু জয়দেবের ভাষায় প্রতিফলিত হয়। দশম শতাব্দীতে বর্ণ আশ্রমের অধীনে বাঙালি সমাজ সুশৃঙ্খল ছিল। যদিও সংস্কৃত প্রকৃত উপভাষার একটি সাধারণ রূপ ছিল, যা বাজার এলাকায় সাধারণ লেনদেনের জন্য দৃশ্যমান ছিল, তবুও ব্রাহ্মণ শিক্ষিত শ্রেণী, রাজনৈতিক শ্রেণী, ব্যবসায়ী এবং সেবা প্রদানকারীদের ভাষা অনুশীলনের অবশ্যই একটি পরিশীলিত রূপ ছিল, যা চর্যাপদের খুব সংকীর্ণ পরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।

চর্যাপদের ভাষা: বিকৃত প্রাকৃত ভাষা?

ভাষাগত বিতর্ক: চর্যাপদের বাংলা হওয়া সম্ভব?

চর্যাপদের ভাষাকে বাংলার প্রাচীনতম রূপ বলা হলেও, ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, চর্যাপদের শব্দতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও বাক্যগঠনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বাংলা ভাষার পরিণত রূপের সঙ্গে মেলে না। বরং এটি পূর্ব ভারতের এক বিশেষ ধরণের প্রাকৃত ভাষা, যা সময়ের সাথে বিকশিত হয়ে বাংলার দিকে ধাবিত হয়েছে।

চর্যাপদের অনেক শব্দ আজকের বাংলা ভাষায় খুঁজে পাওয়া গেলেও, এর বাক্যগঠন ও ধ্বনিগত প্রকৃতি বাংলার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। এই ভাষায় সংস্কৃত শব্দের উপস্থিতি থাকলেও তা আধুনিক বাংলা বা এমনকি মধ্যযুগীয় বাংলার রূপ থেকে পৃথক।

সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই।… হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

ভাষার বিবর্তন ও পাল যুগের বাস্তবতা

পাল সাম্রাজ্যের শাসনামলে (৮ম-১২শ শতক) বাংলা ভাষার বিকাশ শুরু হলেও, এটি তখনও স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। পাল রাজাদের দরবারে সংস্কৃতই ছিল প্রধান ভাষা, এবং ধর্মীয়-দার্শনিক রচনাগুলিও মূলত সংস্কৃতেই রচিত হত। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষা ছিল মৈথিলি, প্রাকৃত এবং পূর্বাঞ্চলীয় অপভ্রংশ ভাষার মিশ্রণ।

চর্যাপদের ভাষা এই সময়কার পূর্বাঞ্চলীয় প্রাকৃত ভাষাগুলোর সংমিশ্রণ। তবে এটি খাঁটি বাংলা ছিল না, বরং বাংলা ভাষার একটি আদি রূপ বা তার পূর্ববর্তী ধাপ বলা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা যখন পরিণত ও শৃঙ্খলিত রূপ লাভ করে, তখন চর্যাপদের ভাষার চেয়ে অনেক বেশি সুস্পষ্ট ও সরলতর হয়ে ওঠে।

চর্যাপদের প্রভাব ও বাংলার সাহিত্য

যদিও চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এটি বাংলার মূলধারার সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলেনি। পরবর্তীতে কৃত্তিবাস, বড়ু চণ্ডীদাস বা বিদ্যাপতি যেসব ভাষায় লিখেছেন, তার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন।

চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়ে (১৫শ-১৬শ শতক) বাংলা ভাষা একটি সুসংগঠিত ও পরিশীলিত রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর অনুসারী কবিরাজ কৃষ্ণদাস রচিত “চৈতন্যচরিতামৃত” বাংলা ভাষার একটি মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। এই ভাষা চর্যাপদের ভাষার তুলনায় অনেক বেশি গঠনগতভাবে শক্তিশালী, মাধুর্যময় ও সংহত।

চর্যাপদ বাংলার উৎস নয়

চর্যাপদের ভাষা বাংলার উৎস কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা ও সাহিত্য বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাথমিক রূপ নয়, বরং এক প্রকার পূর্বাঞ্চলীয় প্রাকৃতের রূপান্তরিত সংস্করণ। এটি বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের এক ‘মূল্যবান’ নিদর্শন হলেও, বাংলার প্রাচীনতম ভাষা হিসেবে একে চিহ্নিত করা বোধহয় অতিরঞ্জিত হবে।

আমরা মনে করি যে চর্যাপদে ব্যবহৃত ভাষাটি বিচ্ছিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছিল, কোনও সময়েই এর কোনও জনসামাজিক গুরুত্ব ছিল না, এবং তুলনা করার জন্য বা উপসংহারের জন্য কোনও অনুরূপ ভাষাও পাওয়া যায়নি।

বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশের নিরিখে চর্যাপদকে একটি সংযোগসূত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু এটি বাংলার মূলধারার ভাষার প্রতিফলন নয়। এর ভাষা মৈথিলি, অপভ্রংশ ও পূর্ব প্রাকৃতের (Prakrit) মিশ্রণে গঠিত, যা পরবর্তী বাংলার আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে সরাসরি বাংলা বলা যাবে না।

পরামর্শকৃত সূত্র

  • হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩২৩
  • চর্যাগীতি পদাবলী, সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯৫
  • নব চর্যাপদ, শশিভূষণ দাশগুপ্ত সংগৃহীত ও অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৮৯

বিভিন্ন গবেষকের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি পাওয়া যায়—

১. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৯১৬) চর্যাগীতিকোষ :

“এই চর্যাগানগুলি যে ভাষায় রচিত, তাহাকে বাংলা বলা চলে না, ইহা একপ্রকার প্রাকৃত, যাহা সংস্কৃত হইতে অপভ্রংশ হইয়া বঙ্গ, উড়িয়া ও আসামিয়া ভাষার নিকটতর হইয়াছে।”

২. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬) “অভিজ্ঞানচিন্তামণি”

“চর্যাপদের ভাষা পূর্বভারতের এক প্রকার প্রাকৃতের অপভ্রংশ। বাংলার সঙ্গে মিল থাকলেও, ইহা স্বতন্ত্র রূপে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বলা যায় না।”

৩. মোহিতলাল মজুমদার (১৯৩৬) “বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত”

“চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার আদি রূপ কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এর ধ্বনিগত ও রূপগত বৈশিষ্ট্য আধুনিক বাংলা ভাষার মতো নয়। তবে বাংলা ভাষার উৎস-অন্বেষণে ইহা এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”

৪. সুকুমার সেন (১৯৫৪) “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস”

“চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বলা হয়েছে, কারণ এটি সম্পূর্ণরূপে বাংলা নয়, আবার সংস্কৃতও নয়। এটি এক বিশেষ ধরণের প্রাকৃত ভাষা, যা বাংলা ভাষার জন্মের পূর্ববর্তী স্তর।”

৫. হুমায়ুন আজাদ (১৯৮৪) “বাংলা ভাষা ও সাহিত্য”

“চর্যাপদের ভাষা যদি খাঁটি বাংলা হতো, তাহলে চর্যাপদের পরবর্তী বাংলার সাহিত্যেও এর ধ্বনিগত ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যের প্রবল উপস্থিতি পাওয়া যেত। কিন্তু মধ্যযুগের বাংলা ভাষার সাহিত্য চর্যাপদের ভাষার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

এই উদ্ধৃতিগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, চর্যাপদের ভাষা সরাসরি বাংলা বলা সম্ভব নয়, বরং এটি পূর্বী প্রাকৃতের একটি বিবর্তিত রূপ, যার বাংলা ভাষার জন্ম ও বিকাশের (১০ম শতাব্দীর) সাথে কোন সম্পর্ক নেই।

Date: 7th March 2025


গ্রন্থাগার: Advocatetanmoy


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল