ঋগ্বেদের ‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্ত ও তার বৈদিক প্রয়োগ

ঋগ্বেদের ‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্ত ও তার বৈদিক প্রয়োগ.... Sahitya Samrat

‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্ত ও তার বৈদিক প্রয়োগ : এক বিশ্লেষণ

‘অগ্নিম ইরে পুরোহিতম’ হল ঋগ্বেদ শাকল সংহিতার প্রথম মন্ত্র, বিশ্বামিত্রের কন্যা মেধাতিথি দ্বারা কল্পনা করা হয়েছে। অগ্নিকে হিতকর্তা ও পুরোহিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার উদ্দেশ্যে ঋক্ গীত হয়েছে…..

রত্নাধাতা, মহাহোতা, দেব-ঋত্বিক, যজ্ঞ কর্তা
মহাপুরোহিত, মহাঅগ্নি, এস এস হে, বিশ্ববিধাতা,
পুজিয়াছে যারে নবীন-পুরানে ;
সেই তো ডাকিছে দেবতা গনে ।

ঔঁ অগ্নিমীঢ়ে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজং।
হোতারং রত্নধাতমম্॥

অগ্নিঃ পূর্বেভিরৃষিভীরীড্যো নূতনৈরুত।
স দেবাঁ এহ বক্ষতি॥ ২॥

অগ্নিনা রযিমশ্নবৎ পোষমেব দিবেদিভে।
যশসং বীরবত্তমম্॥ ৩॥

অগ্নে যং যজ্ঞমধ্বরং বিশ্বतः পরিভূরসি।
স ইদ্‌দেভেষু গচ্ছতি॥ ৪॥

অগ্নির্‌হোতা কবিক্রতুঃ সত্যশ্চিত্রশ্রवস্তমঃ।
দেবো দেভেভিরা গমৎ॥ ৫॥

যদঙ্গ দাশুষে ত্বমগ্নে ভদ্রং করিষ্যসি।
তভেত্‌ তত্‌ সত্যমঙ্গিরঃ॥ ৬॥

উপ ত্বাগ্নে দিবেদিভে দোষাবস্তর্ধিয়া য়ম্।
নমো ভরন্ত এমসি॥ ৭॥

রাজন্তমধ্বরাণাং গোপামৃতস্য দীদিভিম্।
বর্ধমানং স্বে দমে॥ ৮॥

স নঃ পিতেভ সূনবেऽগ্নে সুপায়নো ভব।
সচস্বা নঃ স্বস্তয়ে॥ ৯॥

সূক্ত-বিনিয়োগ ও সূত্র-সংজ্ঞা:

ঋগ্বেদের প্রথম সূক্ত, ‘অগ্নিমীঢ়ে’, প্রাতঃস্মরণীয় অনুবাক্যরূপে ‘আগ্নেয়’ ক্রিয়ায় নিযুক্ত হয়েছে। এই নিযুক্তির সংজ্ঞা আমরা আশ্বলায়ন শ্রৌতসূত্র (৪.১৩) তে পাই—

“অবা নো অগ্ন ইতি ষট্‌ অগ্নিমীঢ়ে অগ্নিং দূতম্”।

এখানে ‘হীনপাদগ্রহণ’ হওয়ায় সূক্ত নির্ণয় সম্ভবপর হয়েছে, কারণ আশ্বলায়ন সূত্র (১.১) অনুসারে—

“সূক্তং সূক্তাদৌ হীনে পাদে” — অর্থাৎ সূক্তের সূচনায় যদি হীনপাদ থাকে, তবে তা সূক্ত হিসেবে গণ্য।

এই সূক্তে প্রথম ঋকের দ্বিতীয় পংক্তির ‘পবমান ইষ্টি’-তে ‘স্বিষ্টকৃত্’ নামক যজ্ঞের অঙ্গ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যাকে আবার দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডে সূত্ররূপে উল্লেখ করা হয়েছে:

“সাহ্বান্ বিশ্বা অভিযুজো অগ্নিমীঢ়ে পুরোহিতম্” ইতি সংযাজ্যে

এখানে কৃত্স্নপদগ্রহণে ‘ঋক্’ বোঝা যায়, কারণ—

“ঋচং পাদগ্রহণে” (আশ্ব. শ্রৌ. ১.১)।

এছাড়া সংযাজ্য-নির্দেশ থাকায় স্বিষ্টকৃতের সংশ্লেষ নির্দিষ্ট হয়:

“সংযাজ্যে ইত্যুক্তে সৌবিশ্টকৃতী প্রতীয়াত্” (আশ্ব. শ্রৌ. ২.১)।

উক্ত পদ সেখানে দ্বিতীয় মন্ত্ররূপে দৃষ্ট হওয়ায়, এটি যাজ্যরূপে গৃহীত।

যদিও “সাহ্বান্” নামক ঋক পুরোনুবাক্যরূপে দেবতার অনুস্মরণরূপ সংস্কার নির্দেশ করে, তথাপি যাজ্য ও পুরোনুবাক্য উভয়ের সমুচ্চয় বা বিকল্পতা দ্বাদশ অধ্যায়ের চতুর্থ পাদে মীমাংসিত হয়েছে—

“পুরোনুবাক্যয়া যাজ্যা বিকল্প্যা বা সমুচ্চিতা।”
“বিকল্প্যান্যতরেণৈব দেবতায়াঃ প্রকাশনাত্।”
“পুরোনুবাক্যসমাখ্যানাদ্বচনাচ্চ সমুচ্চয়ঃ।”

অর্থাৎ দেবতা-প্রকাশের কাজ এক হওয়ায় দুই অনুবাক্যের সমুচ্চয় সংগত।

‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্ত ও তার রচয়িতা:

এই সূক্তটি ঋগ্বেদের অনুক্রমণী অনুসারে “নব ঋচবিশিষ্ট”, যার ঋষি ‘মধুচ্ছন্দা বিশ্বামিত্র’।

“অগ্নিং নৱ মধুচ্ছন্দা বৈশ্বামিত্রঃ” (অনু. ১.১)।

‘ঋষি’ শব্দটি “ঋষ্ গতৌ” ধাতু থেকে উৎপন্ন; যিনি যোগতপস্যার দ্বারা শ্রুতিবাচ্য বাণী প্রত্যক্ষ করেন।
তৈত্তিরীয় আরণ্যকে বলা হয়েছে—

“অজান্ হ বৈ পৃষ্ণীন্ তপস্যমানান্ ব্রহ্মা স্বয়ম্ভূর্বভানর্ষত্, তে ঋষয়ো অভবন্।” (তৈ. আ. ২.৯)। “এবং এই কথাও শ্রবণযোগ্য যে— যখন অজ এবং পৃষ্ণি তপস্যায় নিযুক্ত ছিলেন, তখন ব্রহ্মা (স্বয়ম্ভূ) তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। সেই অনুগ্রহপ্রাপ্তরাই পরে ঋষি হয়ে ওঠেন।”

এবং স্মৃতিতে রয়েছে—

“অবিদিত্ত্বা ঋষিং ছন্দো দবতং যোগমেব চ।
যোধ্যাপয়েজ্জপেদ্বাপি পাপীয়াঞ্জায়তে তু সঃ।”

এ কারণে ‘ঋষি’, ‘ছন্দ’, ও ‘দেবতা’ জানার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

প্রাচীন ঋষিরা পূজিতেছে যারে,
নতুন ঋষিরাও স্তুতি করে
তারে।
দেবলোক হতে, আনিয়াছে দেবতা,
যজ্ঞ বেদিতে তারে করো সেবা
! (1.2)

ছন্দ ও তার আচ্ছাদক তত্ত্ব:

যদিও ‘অগ্নিমীঢ়ে’ সূক্তের ছন্দ অনুক্রমণীতে উল্লেখ নেই, তথাপি পরিভাষায় বলা হয়েছে—

“আদৌ গায়ত্রং প্রাগ্ হিরণ্যস্তূপাত্” (অনু. ১২.১৪)।

গায়ত্রী ছন্দই প্রাচীনতম বলে এখানে অনুমেয়। ছন্দের মূলার্থ হচ্ছে পাপরূপ অশুভকে আচ্ছাদন করা; যেমন বলা হয়েছে—

“ছাদয়ন্তি হ वा এনং ছন্দাংসি পাপকর্মণঃ।” (ঐ. আ. ২.৫)
“…ছন্দোভিরাত্মানমছাদয়ন্।” (ছা.উ. ১.৪.২)।

হোতা তুমি, কবিসম জ্ঞানী,
সত্যবাণীধারী, শ্রুতির সুরধ্বনি।
দেবতার সাথে তোমারই সঙ্গ,
তার ই সাথে করো
আনন্দরঙ্গ। (1.5)

‘দেব’ শব্দ ও ‘অগ্নি’র ধর্ম:

‘দেব’ শব্দটি “দ্যুতি”-ধাতু থেকে উৎপন্ন—যিনি দীপ্ত, যিনি উজ্জ্বলতা বা প্রভা দেন। এখানে যেহেতু অগ্নিকে প্রশস্ত করা হচ্ছে, তাই ‘অগ্নি’ ‘দেবতা’ বলে পরিচিত।

অনুক্রমণীতে বলা হয়েছে—

“মণ্ডলাদিষু আগ্নেয়মৈন্দ্রাৎ।” (অনু. ১২.১২)

অতএব, প্রথম ঋক—

“অগ্নিমীঢ়ে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজং।
হোতারং রত্নধাতমং॥”

প্রভাতে সন্ধ্যায় নিবেদন করি,
জ্ঞানে উদ্ভাসিত, নমস্কার ধরি।
তোমাকেই বলি শ্রদ্ধাভরে,
এসো হে অগ্নি, সদা মোর ঘরে।
(1.7)

মূল পদার্থ ও ব্যাখ্যা:

  • অগ্নিম্ — অগ্নিদেবকে
  • ঈঢ়ে — আমি স্তব করি (‘ঈড্ স্তুতৌ’)
  • পুরঃ’হিতম্ — যজ্ঞের পূর্বে স্থাপিত
  • যজ্ঞস্য — যজ্ঞের
  • দেবম্ — দেবতা
  • ঋত্বিজম্ — বিশিষ্ট যাজক
  • হোতারম্ — আহ্বায়ক
  • রত্ন’ধাতমম্ — রত্নদানকারী, যজ্ঞফলদানকারী

নিরুক্ত-ভাষ্য (যাস্কাচার্য):

“অগ্নিমীঢ়ে’ অগ্নিং যাচামি। ঈঢ়িরধ্যেষণাকর্মা পূজাকর্মা বা।
পুরোহিতঃ — পুর এনং দধতি।
যজ্ঞস্য দেবঃ — দানাদ্ দীপনাদ্ দ্যোতনাদ্ দ্যুস্থানো।
হোতারং — আহ্বায়ক।
রত্নধাতমং — রমণীয় রত্নদাতা।”
 (নিরু. ৭.১৫)

যজ্ঞের তুমি রাজা দীপ্তমান,
অমৃতের রক্ষক, ধ্রুব অবিচল জ্ঞান।
নিজ গৃহে তুমি হও উন্নতিশীল,
তোমার তেজে জ্বলুক শুভশীল। (1.8)

অগ্নিকে তাই ‘দাতা’, ‘পূজ্য’, ‘আহ্বায়ক’, এবং ‘যজ্ঞের পুরোহিত’ রূপে উপলব্ধি করা হয়েছে।

ইন্দ্রিয়-অতীত (অতীন্দ্রিয়) যে বেদ, তা পরমেশ্বরের অনুগ্রহে প্রথমে দর্শন করার ফলে যারা বেদের ঋষি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, তাদেরকে ‘ঋষি’ বলা হয় — এই মর্মেই স্মৃতিতে স্মরণ করা হয়েছে।

“যুগান্তে অন্তর্হিত বেদ ও ইতিহাসসমূহ মহর্ষিগণ তপস্যার দ্বারা আবার লাভ করেন; এবং তা ছিল স্বয়ম্ভূ (ব্রহ্মা)-এর পূর্বানুমোদনক্রমে।” এখানে বোঝানো হয়েছে, যুগের শেষে বেদ লুপ্ত হয়ে যায়, তখন তপস্যার মাধ্যমে ঋষিরা সেই জ্ঞান পুনরাবিষ্কার করেন।

“যে ব্যক্তি ঋষি, ছন্দ, দৈবতা এবং যোগ না জেনে মন্ত্র পাঠ করে বা অন্যকে শেখায়, সে পাপী হয়।”

অর্থাৎ, বেদপাঠ বা জপ করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট ঋষি (যিনি মন্ত্রটি দর্শন করেছেন), ছন্দ (যে ছন্দে রচিত), দৈবতা (যাকে উদ্দেশ করে উচ্চারিত), ও যোগ (সাংখ্যিক সম্পর্ক বা কার্যের অর্থ) জানা আবশ্যক।

আরো বলা হয়েছে —
“ঋষি, ছন্দ, দৈবতা, ব্রাহ্মণার্থ ও স্বর ইত্যাদি না জেনে যে ব্যক্তি মন্ত্র প্রয়োগ করে, সে ‘মন্ত্রকণ্টক’ বা মন্ত্রে বাধা সৃষ্টিকারী নামে পরিচিত হয়।” অর্থাৎ এরা শাস্ত্রদৃষ্টিতে বিপথগামী বা বিকৃতিবাদী।

“বেদের প্রত্যেক পদের মধ্যে স্বর (উচ্চারণভঙ্গি), বর্ণ (অক্ষর), অক্ষর, মাত্রা (সময়সীমা), বিনিয়োগ (ব্যবহার), অর্থ—সব জানা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি মন্ত্র জিজ্ঞাসা করে বা অধ্যয়ন করতে চায়, তাকে এগুলো প্রতিটি পদের ক্ষেত্রে জানতে হবে।”

অর্থাৎ, বেদ অধ্যয়নে শুধুমাত্র শব্দ নয়, তার সঠিক স্বর (উচ্চারণ), মাত্রা, প্রয়োগ এবং তা দিয়ে কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে — সবই গভীরভাবে জানা জরুরি।

ऋग्वेदः (Rigveda) – मण्डल १
सूक्तं १.१
मधुच्छन्दा वैश्वामित्रः, दे. अग्निः, गायत्री ।

ॐ अग्निमीळे पुरोहितं यज्ञस्य देवमृत्विजम्।
होतारं रत्नधातमम्॥
अग्निः पूर्वेभिरृषिभिरीड्यो नूतनैरुत ।
स देवाँ एह वक्षति ॥२॥
अग्निना रयिमश्नवत् पोषमेव दिवेदिवे ।
यशसं वीरवत्तमम् ॥३॥
अग्ने यं यज्ञमध्वरं विश्वतः परिभूरसि ।
स इद्देवेषु गच्छति ॥४॥
अग्निर्होता कविक्रतुः सत्यश्चित्रश्रवस्तमः ।
देवो देवेभिरा गमत् ॥५॥
यदङ्ग दाशुषे त्वमग्ने भद्रं करिष्यसि ।
तवेत् तत् सत्यमङ्गिरः ॥६॥
उप त्वाग्ने दिवेदिवे दोषावस्तर्धिया वयम् ।
नमो भरन्त एमसि ॥७॥
राजन्तमध्वराणां गोपामृतस्य दीदिविम् ।
वर्धमानं स्वे दमे ॥८॥
स नः पितेव सूनवेऽग्ने सूपायनो भव ।
सचस्वा नः स्वस्तये ॥९॥

ঋগ্বেদ ১.১ – সহজ বাংলা অনুবাদ

১. আমি অগ্নিদেবকে আহ্বান করছি— যিনি যজ্ঞের পুরোহিত, দেবতাদের ঋত্বিক (যজ্ঞ পরিচালনাকারী),
যিনি যজ্ঞের হোতা, রত্নসম ধন দানকারী।

২. এই অগ্নি, প্রাচীন ঋষিদের দ্বারা পূজিত হয়েছেন, এবং এখনো নতুন ঋষিদের দ্বারাও পূজিত হচ্ছেন।
এই অগ্নিই দেবতাদের এখানে নিয়ে আসেন।

৩. এই অগ্নির মাধ্যমে আমরা প্রতিদিন ধন ও পুষ্টি লাভ করি—
যা খ্যাতি ও বীরত্বে পরিপূর্ণ।

৪. হে অগ্নি! তুমি চারদিকে থেকে যজ্ঞকে রক্ষা করো—
এই যজ্ঞই দেবতাদের কাছে পৌঁছায়।

৫. অগ্নিই হোতা (যজ্ঞকারী), যিনি কবিসম বুদ্ধিমান, সত্যবাদী এবং মহাশ্রুতিমান।
এই দেবতা অন্যান্য দেবতাদের সঙ্গে আসেন।

৬. হে অগ্নি! তুমি যদ্দিন ভক্তকে কল্যাণ দান করো—
তা নিশ্চিতভাবে সত্য হয়, তাই বলে গেছেন অঙ্গিরস

৭. হে অগ্নি! আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় এবং প্রাতে জ্ঞানে পরিপূর্ণ হয়ে
তোমাকে নমস্কার ও শ্রদ্ধা সহকারে আহ্বান করি।

৮. তুমি যজ্ঞের রাজা, অমৃতের রক্ষক, দীপ্তিমান।
তুমি নিজের ঘরে ক্রমে উন্নতি করো।

৯. তাই হে অগ্নি! তুমি যেন পিতার মতো সন্তানের প্রতি সদয় হও।
আমাদের কল্যাণের জন্য আমাদের সহচর হও।

হে অগ্নি! সন্তানের প্রতি যেমনি পিতা,
তেমনি তুমি হও করুণাময় নেতা।
কল্যাণের পথে সাথী হও সবার,
শান্তি বয়ে আনো, প্রভু তুমি বারংবার
(1.9)

Rigveda (1.1): Agnim ire

Date: 6th April 2025


Leave a Reply

সাহিত্য সম্রাট জার্নাল