Date: 15th March 2025
নিলরতন সরকার ও বিধানচন্দ্র রায়ের সার্জারি কি কবির মৃত্যুর জন্য দায়ী?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, তাঁর শেষ অপারেশন কি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি চিকিৎসকদের ভুল ও অবহেলা তাঁর মৃত্যু তরান্বিত করেছিল—এটি এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতা ও চিকিৎসা: এক ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
১৯৪০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কবি কালিম্পং গিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে। কিন্তু সপ্তাহখানেক পর মূত্রাশয়ের সংক্রমণের কারণে তিনি পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তৎকালীন বিশিষ্ট চিকিৎসক ড. প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের পরামর্শে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে জোড়াসাঁকোতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তিনি শান্তিনিকেতনে পৌষ উৎসবে অংশ নেন, যা কিছুদিনের জন্য তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে কিছুটা উন্নত করেছিল।
তবে তাঁর রোগ নিরামিত হয়নি। ১৯৪১ সালের ১৬ জুলাই চিকিৎসকরা—ড. প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ, ড. সত্যসখা মিত্র ও ড. অমিয় বসু—পরামর্শ দেন যে, তাঁকে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কবির মূত্রত্যাগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। চিকিৎসকরা ইউরেমিয়া ও অন্যান্য জটিলতা (প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন) শনাক্ত করেন এবং অপারেশন জরুরি বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অপারেশনের বিতর্ক: সিদ্ধান্তহীনতা ও চিকিৎসাগত দোষ
কবির দীর্ঘদিনের চিকিৎসক ড. নিলরতন সরকার তখন গিরিডিহে ছিলেন, কিন্তু ড. বিধানচন্দ্র রায় আশ্বাস দেন যে অপারেশনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও কয়েক বছর সুস্থ থাকতে পারবেন। অপারেশন ৩০ জুলাই নির্ধারিত হয়, কিন্তু কবিকে এ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। অবশেষে অপারেশনের ঠিক আগে তাঁকে জানানো হলে তিনি মর্মাহত হন।
অপারেশনটি জোড়াসাঁকোর বাড়ির বারান্দায় একটি অস্থায়ী জীবাণুমুক্ত অপারেশন থিয়েটারে সম্পন্ন করা হয়। সার্জারি করেন ড. ললিত বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁকে সহায়তা করেন ড. সত্যসখা মৈত্র ও ড. অমিয় সেন। অপারেশনে মূত্রাশয়ে একটি নল প্রবেশ করানো হয়, যা মূত্রত্যাগের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এর পরেই তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে।
অপারেশন কি ভুল ছিল? চিকিৎসকদের ব্যর্থতা নাকি নিয়তির বিধান?
৪ আগস্ট থেকে কবির কিডনি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, ৫ আগস্ট ইউরেমিয়া মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। চিকিৎসকরা তাঁকে ফের বাঁচানোর চেষ্টা করেন—ড. নিলরতন সরকার গিরিডিহ থেকে ফিরে এসে ড. বিধানচন্দ্র রায় ও ড. ললিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিলে পুনরায় চিকিৎসা দেন। কিন্তু ৭ আগস্ট বেলা ১২টা ১০ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই চিকিৎসা ও সার্জারি নিয়ে বিতর্ক আজও বিদ্যমান। প্রথমত, কবিকে আগে থেকেই তাঁর রোগ সম্পর্কে পুরোপুরি জানানো হয়নি, যা একধরনের চিকিৎসাগত নীতিগত ত্রুটি। দ্বিতীয়ত, তাঁর বয়স ও দুর্বল স্বাস্থ্য বিবেচনা না করেই চিকিৎসকরা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, অপারেশনের পর যথাযথ চিকিৎসা ও পরবর্তী জটিলতা সামলানোর ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছেন।
চিকিৎসকদের দোষ নাকি অনিবার্য পরিণতি?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে চিকিৎসকদের ভুলের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক বিতর্কিত দিক ছিল। বিশেষত, সার্জারির বিকল্প চিকিৎসা সম্ভব ছিল কি না, সেটি আজও গবেষণার দাবি রাখে। তবে এটিও সত্য যে, সে সময়কার চিকিৎসা বিজ্ঞান আজকের মতো উন্নত ছিল না এবং তাঁর ক্যান্সারের প্রকৃত অবস্থা তখন সম্পূর্ণরূপে জানা যায়নি।
অতএব, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নিয়ে বিতর্কটি চিকিৎসাগত ত্রুটি ও নিয়তির সংমিশ্রণ হতে পারে, যা বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রয়ে গেছে।
