দেবী চৌধুরাণী: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক অনন্য সৃষ্টি
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ইংরেজি ১৮৮৪ সনে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবী চৌধুরাণী’ (১৮৮৪ সনের প্রথম প্রকাশিত) একটি যুগান্তকারী উপন্যাস হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই উপন্যাসটি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন যে এটি কোন ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, যদিও এর মধ্যে কিছু ঐতিহাসিক উপাদান বিদ্যমান। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে এই উপন্যাসে ভবানী পাঠক, গুডল্যাড সাহেব, লেফটেন্যান্ট ব্রেনান প্রমুখ ঐতিহাসিক চরিত্র থাকলেও তাদের সাথে উপন্যাসের ঘটনাবলীর সম্পর্ক খুবই সামান্য। বঙ্কিমচন্দ্রের এই স্পষ্ট ঘোষণা সত্ত্বেও ‘দেবী চৌধুরাণী’ বাংলা সাহিত্যে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে তার গভীর দার্শনিক ভাবনা, চরিত্রচিত্রণ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্য।
“ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা আমার উদ্দেশ্য ছিল না, সুতরাং ঐতিহাসিকতার ভাণ করি নাই। …দেবী চৌধুরাণীরও ঐরূপ অর্থাৎ ‘আনন্দমঠে’র মত একটু ঐতিহাসিক মূল আছে।…‘দেবী চৌধুরাণী’ গ্রন্থের সঙ্গে ঐতিহাসিক দেবী চৌধুরাণীর সম্বন্ধ বড় অল্প। দেবী চৌধুরাণী, ভবানী পাঠক, গুড্ল্যাড্ সাহেব, লেফ্টেনাণ্ট ব্রেনান্, এই নামগুলি ঐতিহাসিক।…দেবী চৌধুরাণীকে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ বিবেচনা না করিলে বড় বাধিত হইব।” …বঙ্কিমচন্দ্র
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসে ইতিহাসের কঠোর সত্যতা রক্ষা করেননি। প্রকৃত ইতিহাসে ভবানী পাঠক ছিলেন বিহারের আরা জেলার একজন ব্রাহ্মণ, যার সহযোগী মজনুন সাহ ছিলেন মেওয়াতের (বর্তমান আলওয়ার রাজ্য) বাসিন্দা। তারা বা তাদের অনুচররা কেউই বাঙালি ছিলেন না – সরকারি রিপোর্টে (ইংরেজি ১৭৭৬ এবং ১৭৮৭ সনের ) তাদেরকে “ভালোভাবে সজ্জিত রাজপুত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবানী পাঠক ১৭৮৭ সালের জুলাই মাসে ইংরেজ সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে নিহত হন, স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে দ্বীপান্তরে যাননি। ওয়ারেন হেস্টিংসের পদত্যাগের কয়েক বছর পর এই ‘ডাকাত’ দলগুলি দমন করা হয় এবং দেবী চৌধুরাণীও ১৭৮৭ সাল থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। সম্ভবত তিনি বারাণসীর বাঙালিটোলা এলাকায় গোপনে থাকতেন। বাঙালিটোলার প্রবেশপথে তাঁর কালী মন্দিরটি এখনও দৃশ্যমান। গুডল্যাড রঙ্গপুর ছাড়ার কয়েক বছর আগেই দেবী চৌধুরাণী তার দল ভেঙে দিয়েছিলেন।
মীর জাফরের শাসনকালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে বাংলার প্রশাসনে এক বৃহৎ ভূমিকা গ্রহণ করে এবং কোম্পানিই বাংলার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব কার্যত গ্রহণ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মীর জাফরের শাসনক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে; বয়সজনিত কারণে তার প্রশাসনিক দক্ষতাও হ্রাস পায়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানির সৈন্যরা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং তার পরিবর্তে মীর কাসিমকে বাংলার সিংহাসনে বসানো হয়। হেস্টিংস (১৭৩২ – ১৮১৮) এই পদক্ষেপের বিষয়ে কলকাতায় সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং মত দেন যে, কোম্পানির উচিত ছিল মীর জাফরের প্রতি তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। কিন্তু হেস্টিংসের সেই মতামত উপেক্ষিত হয়। হেস্টিংসের প্রথম বড় পরিবর্তন ছিল মুর্শিদাবাদ থেকে সমস্ত প্রশাসনিক কার্যকলাপ কলকাতায় স্থানান্তরিত করা।
দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে চিত্রিত সামাজিক প্রেক্ষাপট একেবারে বাস্তবসম্মত। বাংলার খাঁটি বাঙালিরাও ডাকাতি করত, রাজশাহী-পাবনা অঞ্চলে একটি বিখ্যাত বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ বংশের লোকেরা নৌকাযোগে ডাকাতি করতে গিয়ে নিজেদের নতুন জামাইকে হত্যা করার ঘটনা লোকমুখে প্রচলিত ছিল। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর হওয়ার পর বাংলার যে করুণ দশা হয়েছিল, বঙ্কিমচন্দ্র তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। ১৭৭৩ সাল জুড়ে হেস্টিংস মুদ্রাব্যবস্থাকে একীভূত করেন, হিন্দু আইনের সংহিতা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন এবং মুসলিম আইনসংগ্রহের সারসংক্ষেপ রচনার উদ্যোগ নেন। কর ও শুল্ক ব্যবস্থার সংস্কার করেন, ভূমিরাজস্ব নির্দিষ্ট করেন এবং বেসরকারি বণিকদের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত দেশীয় দালালদের মাধ্যমে যে চরম শোষণ চলছিল, তা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসের জন্য বঙ্কিমচন্দ্র সময় ও স্থান দুটিকেই বিশেষভাবে বেছে নিয়েছিলেন। এটি ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্যবর্তী সেই সন্ধিক্ষণ যখন দেশে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়েছিল। আর স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সীমান্ত অঞ্চল রঙ্গপুরকে, যা ঐতিহাসিকভাবে অশান্ত অঞ্চল ছিল। মুঘল যুগে কোচ ও আহোম রাজ্যগুলো রঙ্গপুরের উত্তর ও পূর্ব অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল, ফলে যুদ্ধ ও লুটতরাজ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বাংলার মতো শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা এখানে ছিল না, যা বিদ্রোহীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, ১৭৭৭ সাল ছিল, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৭৭৫–১৭৮৩) সময় ।
দেবী চৌধুরায়ের গল্পটি আসলে সত্য এবং বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে এর সম্পূর্ণ তথ্য ছিল। ইংরেজ অফিসাররা বাংলা ও বিহারের কৃষকদের লুট করত এবং দেবী চৌধুরানীর দস্যুরা ইংরেজদের ধন লুট করত। লুটের মাল কৃষকদের কাছে ফিরে আসত। যেহেতু তিনি একজন ইংরেজ সরকারি কর্মচারী ছিলেন, তাই বঙ্কিমচন্দ্র কখনও সত্য ঘটনাটি প্রকাশ করতে চাননি।
তৎকালীন বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থাও অরাজকতাকে উৎসাহিত করেছিল। টোডরমলের (১৫২৪ – ১৫৮৯) জমি জরিপ পদ্ধতি বাংলায় পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, জমিদারদের কাছ থেকে এককালীন টাকা নিয়ে দিল্লির বাদশাহ সন্তুষ্ট থাকতেন। মানসিংহের (১৫৫০ – ১৬১৪) বাংলা বিজয়ের পর শুধু রাঢ় অঞ্চলে নিয়মিত রাজস্ব আদায় হতো। ১৫৯৫ সালের ৭ নভেম্বর মান সিং আকবরনগর নামে বাংলার একটি নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিজয়ের পর মান সিং ঢাকার দিকে যাত্রা করেন এবং ভূষণার জমিদার কেদার রায়কে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন।
তখন বাংলার রাজস্ব বন্দোবস্তেও একরকম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। টোডরমলের যে নিয়ম ছিল—জমি মেপে প্রজার কাছ থেকে সরাসরি খাজনা নির্ধারণ করে তোলা, যাকে বলে ‘জব্তী’ পদ্ধতি—তা বাংলার কোনো এলাকাতেই ঠিকঠাক চালু হবার সুযোগ পায়নি। অধিকাংশ জায়গাতেই জমিদারদের থেকে একরকম জোড় করে টাকা নিয়ে বাংলার সুবেদার বা দিল্লির বাদশাহকে সন্তুষ্ট রাখতেই হতো। তাও আবার সব জেলায় না। মানসিংহ যখন বাংলা জয় করেন, তখন শুধু রাঢ় অঞ্চলে নিয়মমাফিক ও নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব তোলা শুরু হয়।
এরপর ইসলাম খাঁর সময়ে রাজশাহী অঞ্চল—মানে আজকের রাজশাহী, পাবনা আর বগুড়ার দক্ষিণ অংশ—পুরোদমে মুঘল শাসনের অধীনে আসে, আর তার কিছু পরে ঘোড়াঘাট—মানে বগুড়া, দিনাজপুর আর রংপুরের সীমান্ত অঞ্চল ধরে একটা বৃত্ত কল্পনা করলে যে এলাকাটা পড়ে—সেটাও নিয়ম করে সরকারকে খাজনা দিতে শুরু করে। ময়মনসিংহ তো আরও পরে, প্রায় একশো বছর পর, মুর্শিদ কুলী খাঁর শক্ত শাসনে নিয়মিত খাজনা প্রদানকারী জেলা হয়ে ওঠে, আর সেটা সম্ভব হয় তাঁর গড়া নতুন বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদারদের পরিশ্রমে।
এইভাবে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও শাসনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সুবা বাংলার মোট রাজস্বও বাড়তে থাকে। মুর্শিদ কুলী খাঁ প্রথমেই আকবর আমলের রাজস্বের নির্ধারিত অঙ্ক ছাড়িয়ে যান, আলীবর্দি খান তার উপরে কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব বাড়িয়ে দেন, আর সবশেষে মির কাসিম, যিনি দুর্ভাগ্যবশত ইংরেজদের হাতে চরমভাবে শোষিত হন, তিনি সমস্ত অঞ্চলের খাজনার অঙ্ক এতটাই বাড়িয়ে দেন যে সেটা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে ওঠে।
ইসলাম খাঁর সময় রাজশাহী এবং পরে ঘোড়াঘাট অঞ্চল নিয়মিত খাজনা দিতে শুরু করে। মুর্শিদকুলী খাঁর (১৬৬০ – ১৭২৭) সময় ময়মনসিংহ নিয়মিত রাজস্ব প্রদানকারী জেলায় পরিণত হয়। কিন্তু পলাশী ও উদয়নালার যুদ্ধের পর নবাবি শাসন ভেঙে পড়লে, ইংরেজরা যখন দেশ শাসনের দায়িত্ব নিতে ইতস্তত করছিলেন, তখন সীমান্ত অঞ্চলে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। মীর কাসিমের সময় রাজস্বের হার অসম্ভব রকম বেড়ে গিয়েছিল, যা আদায় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ফলে সরকারি কর্মচারীরা প্রজাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে।
‘দেবী চৌধুরাণী’তে বর্ণিত সময়ে ইংরেজরা জমির অস্থায়ী বন্দোবস্ত করতেন, নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতাকে এক বা পাঁচ বছরের জন্য জমিদারি ইজারা দিতেন। এই ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) যখন আসে, তখন দেবী চৌধুরাণীর সময় শেষ হয়ে গেছে – প্রফুল্ল (দেবী চৌধুরাণীর ডেপুটি) তখন একজন সাধারণ গৃহিণীর জীবনযাপন করছে।
উপন্যাসে বর্ণিত একটি বিশেষ দৃশ্য হলো নিরস্ত্র বজরা কীভাবে ইংরেজ সৈন্যদের ঠেলে দিয়ে লেফটেন্যান্ট ব্রেনানকে বন্দী করে। এটি অসম্ভব মনে হলেও ঐতিহাসিকভাবে এর নজির রয়েছে। ১৬৭৯ সালে খান্দেরী দ্বীপে ইংরেজ লেফটেন্যান্ট থর্প এবং আরও দুই ইংরেজ সৈন্য মারাঠাদের হাতে নিহত হয়। ১৭৪৮ সালে কাসিমবাজার থেকে কলকাতায় যাওয়ার পথে কাটোয়ার কাছে এক ইংরেজ কর্মচারীর সমস্ত মালামাল মারাঠারা লুট করে নেয়। জল ও ডাঙার সন্ধিস্থলে লাঠিয়াল বাহিনীর কাছে সুশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্যদের পরাজয়ের এমন উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে।
সরকারি নথিপত্র থেকে রঙ্গপুরের ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো – ১৭৮৭ সালের জুনে লেফটেন্যান্ট ব্রেনান কুখ্যাত ‘ডাকাত’ নেতা ভবানী পাঠকের বিরুদ্ধে নিয়োজিত হন। পাঠক ও তার ৬০ অনুচরকে নৌকায় ঘেরাও করা হয়, যুদ্ধে পাঠক ও তার তিন সেনাপতি নিহত হন, ৪২ জন বন্দী হয়। ব্রেনানের রিপোর্টে দেবী চৌধুরাণী নামে এক নারী ডাকাতের উল্লেখ আছে, যিনি একটা বড় বজরায় বাস করতেন, বড় সংখ্যক বরকন্দাজ রাখতেন এবং ভবানী পাঠকের সাথে মিলে ডাকাতি করতেন। চৌধুরাণী উপাধি থেকে বোঝা যায় তিনি একজন ছোট জমিদার ছিলেন। ১২ই জুলাই রঙ্গপুরের কালেক্টর ব্রেনানকে লিখেন যে দেবী চৌধুরাণীকে গ্রেফতারের পর্যাপ্ত কারণ না থাকায় তিনি কোনো নির্দেশ দিতে পারছেন না। ইংরেজ পক্ষ থেকে কেউ কখনও জানতই না যে সে দেখতে কেমন ছিল।
এই হলো ‘দেবী চৌধুরাণী’র ঐতিহাসিক পটভূমি।
তবে বঙ্কিমচন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাস রচনা নয়, বরং মানব হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করা। উপন্যাসের প্রথমেই তিনি মেনে নিয়েছেন – “ধর্মের সারবস্তু হলো সংস্কৃতি; এর ফল হলো উচ্চতর জীবন।” অর্থাৎ স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যে সম্বন্ধ রক্ষা করাই মানবজীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধি, যা সংযম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। উপন্যাসের প্রফুল্লের চরিত্র এই আদর্শের প্রতীক।
‘দেবী চৌধুরাণী’ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন তত্ত্ব’ (ভগবদ গীতার কর্ম যোগ, যে সংগ্রাম করতে হবে, ফলাফলের অপেক্ষা না করে।) প্রচারের একটি মাধ্যম ছিল। ১৮৭৮ সালে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রকাশের পর একটি পারিবারিক দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনে পরিবর্তন আসে। ১৮৮২ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি মাত্র তিনটি উপন্যাস রচনা করেন – ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২), ‘দেবী চৌধুরাণী’ (১৮৮৪) এবং ‘সীতারাম’ (১৮৮৭), যা একত্রে ‘ত্রয়ী’ নামে পরিচিত। এই উপন্যাসগুলিতে তিনি বাঙালিকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। ‘আনন্দমঠে’ সমষ্টির, ‘দেবী চৌধুরাণীতে’ ব্যক্তির এবং ‘সীতারামে’ সমাজ ও ব্যক্তির সমন্বয়ের চিত্র রয়েছে।
‘দেবী চৌধুরাণী’ রচনার সময় বঙ্কিমচন্দ্র হাওড়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। জাজপুরে থাকাকালীন তিনি একটি ডাকাতির অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যা এই উপন্যাসে কাজে লাগান। হাওড়ার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়েস্টম্যাকটের সাথে তাঁর বিরোধের কারণে বঙ্কিমচন্দ্র কলকাতার বউবাজার স্ট্রিটে বাসা ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন সেখান থেকে হাওড়া যাতায়াত করতেন। এবং সেখানেই ‘দেবী চৌধুরাণী’ রচনা শুরু করেন। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে বৈশাখে ‘দেবী চৌধুরাণী’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়, যেখানে বঙ্কিমচন্দ্র দ্বিতীয় খণ্ডের অনেক পরিবর্তন সাধন করেন।
‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘অনুশীলন’ তত্ত্ব ব্যবহার করে একজন আদর্শ নারীচরিত্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এখানে শুধু চরিত্র নয়, সেই চরিত্রের চারপাশে একটা দৃশ্যপট—একটা সামগ্রিক সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত—গড়ে তোলার চেষ্টাও স্পষ্ট। উপন্যাসের চিত্রপট নিখুঁত না হলেও একধরনের আকর্ষণ আছে তাতে। দেবী চৌধুরাণী যেন এক বৈষ্ণব ভক্তের গড়া মূর্তি—তিনি কমলার মতো কোমল নন, কালী বা ভৈরবীর মতো ভয়ংকরও নন, কিন্তু এই তিন রূপের মিলনে তৈরি এক অনন্য নারী, যার মধ্যে শক্তি ও স্নেহ দুই-ই আছে।
প্রফুল্ল শক্তির প্রতীক, পুরুষ ব্রজেশ্বর তাঁর সামনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে—কখনো পিতৃশাসনের সামনে, কখনো প্রফুল্লের রূপে। সাগর বৌ, নয়ান বৌ, আর প্রফুল্ল—এই তিন নারীতে যেন পুরুষের চরিত্রগুলো তৃপ্তি, বিরক্তি আর আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ আছে। কিন্তু প্রফুল্লকে এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে তোলার সময় বঙ্কিম যেন কোথাও আটকে গিয়েছেন। প্রফুল্লকে স্বামীর (ব্রজেশ্বর) সঙ্গে একরাত্রির জন্য সুখী করে তিনি তাঁর ঐশ্বর্যপথে একরকম কাঁটা বসিয়ে দেন। তার ফল হয় এই, দেবী চৌধুরাণীর উত্তরসূরী প্রফুল্লকে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ব্রজেশ্বরের ঘরে বাসন মাজতে, সংসারের ঝামেলা সামলাতে।
প্রফুল্ল একজন শিক্ষিতা, লড়াকু, জ্ঞানী নারী—যাঁকে ভবানী পাঠক তৈরি করেছিলেন দেশের কাজে, সমাজের কাজে লাগার জন্য—তিনি শেষমেশ হয়ে যান একজন গৃহিণী, যাঁর ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ঘরের মধ্যে। প্রফুল্লর তার নারীত্বকে একটা সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নেন, আর পুরুষ তার ফল ভোগ করে।
এই ছোট্ট উদ্দেশ্য পূরণ করতে প্রফুল্লকে শিখতে হয় সংস্কৃত, দর্শন, বিজ্ঞান, অলঙ্কার, খেলাধুলা, অস্ত্রচালনা—সবকিছু! তাঁকে ডাকাতদের সর্দার হতে হয়, দল চালাতে হয়, আবার শেষে গিয়ে ঘরের বাসন মাজতেও হয়। ভবানী পাঠকের আচার্যত্ত্ব শেষ হয় একদম সাধারণ গৃহস্থালি জীবনে। বঙ্কিম তাঁর আদিরসের মোহ ত্যাগ করতে পারেননি, সংসারের টান ছাড়তে পারেননি। এত শিক্ষার পরেও প্রফুল্ল না হতে পারলেন বৈষ্ণবী, না হতে পারলেন শাক্ত ভৈরবী।
আমরা অন্যভাবে বলতে পারি যে, বঙ্কিম বাঙালি নারীকে ‘দেবী চৌধুরাণী’র রূপে দেখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।
তবু প্রফুল্ল চরিত্রটা একেবারে অনন্য। এটা তখন বাংলা সমাজে ছিল না। কিন্তু চরিত্রটিতে একটা ঘরের গন্ধ আছে, যেন পরিচিত, যেন নিজের মতো করে চেনা। প্রফুল্লর ভেতর বাঙালিয়ানার ছাপ অদ্ভুতভাবে মিশে গেছে। একজন সাধারণ বাঙালি গৃহবধূ থেকে কীভাবে তিনি একজন দৃঢ়চেতা নেতায় পরিণত হন, তার এই রূপান্তর বঙ্কিম অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রফুল্লের জীবনের প্রথম দিকের কান্না থামলো যখন সে নিশ্চিত হয় যে শ্বশুরবাড়িতে তার স্থান হবে না, …এখন সে আর কাঁদে না, বরং চুপ করে থাকে। দশ বছরের কঠোর ব্রহ্মচর্য ও আত্মসংযমের পর সে যখন তার স্বামী ব্রজেশ্বরকে আবার দেখে, তখন তার সমস্ত আবেগ উথলে ওঠে। বৈদিক ব্রাহ্মণ ভবানী পাঠক এবং শিষ্য দেবী চৌধুরাণী প্রফুল্লকে অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, প্রফুল্ল শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরে আসে, কারণ বঙ্কিমের সমাজে (১৮৩৮-১৮৯৪) গৃহস্থালিই নারীর প্রকৃত ধর্ম।
দেবী চৌধুরাণী উপন্যাস…… বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন কীভাবে একজন পল্লী নারী সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। প্রফুল্লের চরিত্রে নারীজীবনের বিকাশ দেখানো হয়েছে, যা ‘আনন্দমঠের’ শান্তি ও ‘সীতারামের’ শ্রীর চেয়ে ভিন্ন। শান্তি শেষ পর্যন্ত বনে চলে যায়, শ্রী অন্ধকারে মিশে যায়, কিন্তু প্রফুল্ল ঘরে ফিরে আসে – কারণ বঙ্কিমের মতে, “এই ধর্মই স্ত্রীলোকের ধর্ম… এই সংসারধর্মের চেয়ে কঠিন কোনো যোগ নেই।”
বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫
Read More
- আনন্দমঠ-এর বিজ্ঞাপনের ভাষ্য: এক সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
- পল্লীগ্রামস্থ চৌকীদার নিয়মের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষীয় সভার আবেদন (1851)
