শ্রীশ্রী হরিনামামৃত ব্যাকরণ

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিশ্বকোষ (Encyclopedia of Bengali Language and Literature)

তন্ময় ভট্টাচার্য (অ্যাডভোকেট)

শ্রীজীবে গোস্বামী (১৫১৩–১৬০৮ খ্রিস্টাব্দ প্রায়) ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ষড়গোস্বামীর একজন, যিনি ভাগবততত্ত্ব, দর্শন ও সংস্কৃত ব্যাকরণে অদ্বিতীয় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। বৃন্দাবনে অবস্থানকালে তিনি এই ব্যাকরণটি রচনা করেন, উদ্দেশ্য ছিল— ভাষার মাধ্যমে হরিনাম-তত্ত্বের উপলব্ধি ঘটানো এবং শাস্ত্রীয় শিক্ষার পথকে ভক্তিমার্গে সমন্বিত করা। এখানে ব্যাকরণের প্রতিটি সূত্র ও উদাহরণ হরিনামময়, অর্থাৎ ঈশ্বরের নামেই ভরা। এটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ব্যাকরণচর্চার প্রধান ভিত্তি এবং ভক্তি ও ভাষাবিজ্ঞানের এক অনন্য সংমিশ্রণ।

এই গ্রন্থে মোট সাতটি অধ্যায় আছে, প্রায় তিন হাজারেরও বেশি সূত্র নিয়ে। প্রথম অধ্যায়ে সংজ্ঞা ও সন্ধি আলোচনা করা হয়েছে, পরে নাম, ধাতু, প্রত্যয়, কারক, সমাস ও তদ্ধিত প্রভৃতি বিষয় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রতিটি সূত্রই মঙ্গলশ্লোক দিয়ে শুরু, যেখানে ব্যাকরণের অর্থ ও ভক্তির ভাব একত্রিত হয়েছে।

  • এই ব্যাকরণে পাণিনির সূত্রপদ্ধতি রক্ষা করেও প্রতিটি সূত্রের নামকরণ ও উদাহরণে শ্রীহরিনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
  • পাণিনির সংক্ষিপ্ততার পরিবর্তে জীবে গোস্বামী “অর্থপূর্ণতা”-কে প্রাধান্য দিয়েছেন।
  • এখানে “উণাদি সূত্র” সংক্ষিপ্তভাবে ব্যবহৃত, তবে প্রক্রিয়া-কৌমুদী ও সারস্বত ব্যাকরণ-এর ভ্রান্তি নির্দেশ করে সংশোধন করা হয়েছে।
  • প্রত্যেক সূত্রে উদাহরণ হিসাবে ভাগবতগীতাভাগপুরাণরসশাস্ত্র ও কাব্যশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।

পাণিনির ব্যাকরণের মতো সূত্রপদ্ধতি ব্যবহার করা হলেও জীবে গোস্বামী তা আরও অর্থপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি ব্যাকরণের প্রতিটি উদাহরণে ভাগবত, গীতা, পুরাণ ও রসশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাঁর মতে ব্যাকরণচর্চা মানেই হরিনামস্মরণ, তাই এই গ্রন্থ পাঠ ভক্তির এক রূপ।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে শব্দ বা নাদ-ব্রহ্মকে পরমাত্মার প্রকাশরূপে দেখা হয়। এই দর্শনের ভিত্তিতেই শ্রীজীবে গোস্বামী প্রচলিত পাণিনীয় ধারা থেকে ভিন্ন একটি “ঈশ্বরনামময়” ব্যাকরণ সৃষ্টি করেন।
তিনি বলেন— প্রত্যেক অক্ষর, ধ্বনি ও শব্দই শ্রীকৃষ্ণেরই রূপ। তাই শব্দবিজ্ঞান কেবল ভাষার নিয়ম নয়, ভক্তির সাধনাও বটে।

গ্রন্থটির প্রতিটি সূত্র ও প্রারম্ভিক মঙ্গলাচরণ দ্ব্যর্থবোধক— একদিকে ব্যাকরণের নিরপেক্ষ নিয়ম, অন্যদিকে ভক্তিরার্থে শ্রীহরিনামস্মরণ।

এই গ্রন্থটি তিনি তাঁর শিষ্য শ্রীগোপাল দাসকে উদ্দেশ্য করে রচনা করেন। পরে একাধিক ভাষ্য ও টীকা লেখা হয়, যেমন হরেকৃষ্ণ আচার্যের ‘বালতোষণী’ ও গোপীচরণ দাস বেদান্তভূষণের ‘তদ্ধিত-উদ্দীপিনী’। কিছু বাংলা ভাষ্যপাণ্ডুলিপিও আজও জয়পুরের গোবিন্দদেব মন্দিরগ্রন্থাগারে সংরক্ষিত।

হরিনামামৃত ব্যাকরণ মোট ৩১৯২টি সূত্র সম্বলিত।

১. উদ্বোধিকা (প্রথম অধ্যায়) — সংজ্ঞা ও সন্ধি।
২. বিষ্ণুপদ-প্রকরণ — নাম, বিশেষণ, লিঙ্গ, সর্বনাম ও অব্যয়।
৩. আখ্যাত-প্রকরণ — ধাতু, উপসর্গ, প্রত্যয় প্রভৃতি।
৪. কারক-প্রকরণ — কারক, বিভক্তি, আত্মনেপদ ও পরস্মৈপদ।
৫. কৃতন্ত-প্রকরণ — কৃত ও উণাদি প্রত্যয়।
৬. সমাস-প্রকরণ — বিভিন্ন সমাস ও তার নিয়মাবলি।
৭. তদ্ধিত-প্রকরণ — তদ্ধিত ও স্ত্রীপ্রত্যয়।

এই গ্রন্থের দুটি প্রধান টীকা পাওয়া যায়, উভয়ই মুর্শিদাবাদ- বহরমপুর থেকে প্রকাশিতঃ

১. বালতোষণী — শ্রী হরেকৃষ্ণ আচার্য (সুবর্ণমুখী গ্রাম), ২৬০তম সূত্র পর্যন্ত; লেখক বৃন্দাবনে পরলোকগমন করেন।
২. তদ্ধিত-উদ্দীপিনী — শ্রী গোপীচরণ দাস বেদান্তভূষণ (কেন্দুবিল্ব), বঙ্গাব্দ ১২৫৩ (খ্রিঃ ১৭৭৬)।

চৈতন্যোত্তর গৌড়-বাংলায় বৈষ্ণব আচার্যরা পাণিনীয় ধারা অনুসরণ করেও ভক্তিমূলক ব্যাকরণচর্চা চালু করেন। যেমন সনাতন গোস্বামীর সংক্ষিপ্ত হরিনামামৃত ব্যাকরণ, রূপ গোস্বামীর আখ্যাতচন্দ্রিকা, জীবে গোস্বামীর ধাতুসংগ্রহ, বলদেব বিদ্যাভূষণের ব্যাকরণকৌমুদী, এবং আরও বহু আঞ্চলিক বৈষ্ণব ব্যাকরণ।এই ধারায় রচিত প্রধান গ্রন্থসমূহঃ

১. সংক্ষিপ্ত (লঘু) হরিনামামৃত ব্যাকরণ — শ্রী সনাতন গোস্বামী (কেহ কেহ রূপ গোস্বামী বলিয়া মত দেন)।
২. প্রযুক্ত আখ্যাত চন্দ্রিকা — শ্রী রূপ গোস্বামী।
৩. হরিনামামৃত ধাতুসংগ্রহ — শ্রীজীবে গোস্বামী।
৪. সূত্রমালিকা — শ্রীজীবে গোস্বামী (অদ্যাপি অনাবিষ্কৃত)।
৫. ব্যাকরণকৌমুদী ও পদকৌস্তুভ — শ্রী বলদেব বিদ্যাভূষণ।
৬. সূত্রসার ব্যাকরণশিশুবোধশব্দরত্নাকরজুমরাকৌমুদীশ্রীচৈতন্যামৃত ব্যাকরণগোবিন্দ ব্যাকরণকারক-উল্লাস প্রভৃতি — অন্যান্য বৈষ্ণব আচার্য প্রণীত।

এই সমস্ত ব্যাকরণই মূলত গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্বের ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপন করে এবং “শব্দই ব্রহ্ম” — এই ধারণাকে প্রমাণিত করে।

হরিনামামৃত ব্যাকরণ তাই শুধু এক ব্যাকরণগ্রন্থ নয়, এটি ভক্তিশাস্ত্রও বটে। এখানে শব্দের নিয়ম শেখার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তি ও হরিনামস্মরণের অনুশীলন ঘটে। ভাষার প্রতিটি ধ্বনিতে ঈশ্বরস্মরণ— এই ভাবই এই গ্রন্থের আত্মা।

Read More


Leave a Reply