প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য: শ্রী অরবিন্দ (১৯১০)

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য: শ্রী অরবিন্দ

মূল প্রকাশের তারিখ: ২২ জানুয়ারী ১৯১০

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য

আমাদের দেশে ও য়ুরােপে মুখ্য প্রভেদ এই যে, আমাদের জীবন অন্তর্মুখী, য়ুরােপের জীবন বহির্মুখী ৷ আমরা ভাবকে আশ্রয় করিয়া পাপপুণ্য ইত্যাদি বিচার করি, য়ুরােপ কৰ্ম্মকে আশ্রয় করিয়া পাপপুণ্য ইত্যাদি বিচার করে ৷ আমরা ভগবানকে অন্তর্যামী ও আত্মস্থ বুঝিয়া অন্তরে তাঁহাকে অন্বেষণ করি, য়ুরােপ ভগবানকে জগতের রাজা বুঝিয়া বাহিরে তাহাকে দেখে ও উপাসনা করে ৷ য়ুরােপের স্বর্গ স্থলজগতে, পৃথিবীর ঐশ্বৰ্য্য, সৌন্দৰ্য্য, ভােগ-বিলাস তাহাদের আদরণীয় ও মৃগ্য; যদি অন্য স্বর্গ কল্পনা করেন, তাহা এই পার্থিব ঐশ্বৰ্য্য, সৌন্দৰ্য্য ভােগ-বিলাসের প্রতিকৃতি, তাহাদের ভগবান আমাদের ইন্দ্রের সমান, পার্থিব রাজার ন্যায় রত্নময় সিংহাসনে আসীন হইয়া সহস্র বন্দনাকারী দ্বারা স্তবস্তুতিতে স্ফীত হইয়া বিশ্বসাম্রাজ্য চালান ৷

আমাদের শিব পরমেশ্বর, অথচ ভিক্ষুক, পাগল, ভােলানাথ, আমাদের কৃষ্ণ বালক, হাস্যপ্রিয়, রঙ্গময়, প্রেমময়, ক্রীড়া করা তাহার ধর্ম ৷ য়ুরােপের ভগবান কখন হাসেন না, ক্রীড়া করেন না, তাহাতে তাহার গৌরব নষ্ট হয়, তাহার ঈশ্বরত্ব আর থাকে না ৷ সেই বহির্মুখী ভাব ইহার কারণ – ঐশ্বর্য্যের চিহ্ন তাহাদের ঐশ্বর্যের প্রতিষ্ঠা, চিহ্ন না দেখিলে তাহারা জিনিষটী দেখিতে পান না, তাহাদের দিব্যচক্ষু নাই, সূক্ষ্মদৃষ্টি নাই, সবই স্থূল ৷ আমাদের শিব ভিক্ষুক, কিন্তু ত্রিলােকের সমস্ত ধন ও ঐশ্বৰ্য্য অল্পেতে সাধককে দান করেন ভােলানাথ, কিন্তু জ্ঞানীর অপ্রাপ্য জ্ঞান তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ সম্পত্তি ৷ আমাদের প্রেমময় রঙ্গপ্রিয় শ্যামসুন্দর কুরুক্ষেত্রের নায়ক, জগতের পাতা, অখিল ব্রহ্মাণ্ডের সখা ও সুহৃদ ৷ ভারতের বিরাট জ্ঞান, তীক্ষ সূক্ষ্মদৃষ্টি, অপ্রতিহত দিব্যচক্ষু স্থূল আবরণ ভেদ করিয়া আত্মস্থ ভাব, আসল সত্য, অন্তর্নিহিত গুঢ়তত্ত্ব বাহির করিয়া আনে ৷

পাপপুণ্য সম্বন্ধেও সেই ক্রম লক্ষিত হয় ৷ আমরা অন্তরের ভাব দেখি ৷ নিন্দিত কর্মের মধ্যে পবিত্র ভাব, বাহ্যিক পুণ্যের মধ্যে পাপিষ্ঠের স্বার্থ লুক্কায়িত থাকিতে পারে; পাপপুণ্য, সুখদুঃখ মনের ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম আবরণ মাত্র ৷ আমরা ইহা জানি; সামাজিক সুশৃঙ্খলার জন্য আমরা বাহ্যিক পাপপুণ্যকে কর্মের প্রমাণ বলিয়া মান্য করি, কিন্তু অন্তরের ভাবই আমাদের আদরণীয় ৷ যে সন্ন্যাসী আচার-বিচার, কর্তব্য-অকর্তব্য, পাপপুণ্যের অতীত, মদোন্নত্ত-পিশাচবৎ আচরণ করেন, সেই সৰ্ব্বধৰ্ম্মত্যাগী পুরুষকে আমরা শ্রেষ্ঠ বলি ৷ পাশ্চাত্য বুদ্ধি এই তত্ত্বগ্রহণে অসমর্থ; যে জড়বৎ আচরণ করে, তাহাকে জড় বুঝে, যে উন্মত্তবৎ আচরণ করে, তাহাকে বিকৃতমস্তিষ্ক বুঝে, যে পিশাচবৎ আচরণ করে, তাহাকে ঘৃণ্য অনাচারী পিশাচ বুঝে; কেননা সূক্ষ্মদৃষ্টি নাই, তাহারা অন্তরের ভাব দেখিতে অসমর্থ ৷

সেইরূপ বাহ্যদৃষ্টিপরবশ হইয়া য়ুরােপীয় পণ্ডিতগণ বলেন, ভারতে প্রজা-তন্ত্র কোনও যুগে ছিল না ৷ প্রজাতন্ত্রসূচক কোনও কথা সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায় না, আধুনিক পার্লামেন্টের ন্যায় কোন আইন-ব্যবস্থাপক সভাও ছিল না, প্রজাতন্ত্রের বাহ্যচিহ্নের অভাবে প্রজাতন্ত্রের অভাব প্রতিপন্ন হয় ৷ আমরাও এই পাশ্চাত্য যুক্তি যথার্থ বলিয়া গ্রহণ করিয়া আসিয়াছি ৷ আমাদের প্রাচীন আৰ্য্যরাজ্যে প্রজাতন্ত্রের অভাব ছিল না; প্রজাতন্ত্রের বাহ্যিক উপকরণ অসম্পূর্ণ ছিল বটে, কিন্তু প্রজাতন্ত্রের ভাব আমাদের সমস্ত সমাজ ও শাসনতন্ত্রের অন্তরে ব্যাপ্ত হইয়া প্রজার সুখ ও দেশের উন্নতি রক্ষা করিত ৷

প্রথমতঃ, প্রত্যেক গ্রামে সম্পূর্ণ প্রজাতন্ত্র ছিল, গ্রামের লােক সম্মিলিত হইয়া সৰ্ব্বসাধারণের পরামর্শে বৃদ্ধ ও নেতৃস্থানীয় পুরুষদের অধীনে গ্রামের ব্যবস্থা, সমাজের ব্যবস্থা করিতেন; এই গ্রাম্য প্রজাতন্ত্র মুসলমানদের আমলে অক্ষুন্ন রহিল, বৃটিশ শাসনতন্ত্রের নিষ্পেষণে সেইদিন নষ্ট হয় ৷

দ্বিতীয়তঃ, প্রত্যেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যেও, যেখানে সর্বসাধারণকে সম্মিলিত করিবার সুবিধা ছিল, সেইরূপ প্রথা বিদ্যমান ছিল; বৌদ্ধ সাহিত্যে, গ্রীক ইতিহাসে, মহাভারতে ইহার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ৷

তৃতীয়তঃ, বড় বড় রাজ্যে, যেখানে এইরূপ বাহ্যিক উপকরণ থাকা অসম্ভব, প্রজাতন্ত্রের ভাব রাজ-তন্ত্রকে পরিচালিত করিত ৷ প্রজার আইন-ব্যবস্থাপক সভা ছিল না, কিন্তু রাজারও আইন করিবার বা প্রবর্তিত আইন পরিবর্তন করিবার লেশমাত্র অধিকার ছিল না ৷ প্রজারা যে আচারব্যবহার রীতিনীতি আইনকানুন মানিয়া আসিতেছিল, তাহার রক্ষাকর্তা রাজা ৷ ব্রাহ্মণগণ আধুনিক উকিল ও জজদের ন্যায় সেই প্রজা-অনুষ্ঠিত নিয়মসকল রাজাকে বুঝাইনে, সংশয়স্থলে নির্ণয় করিতেন, ক্রমে ক্রমে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করিতেন, তাহা লিখিতশাস্ত্রে লিপিবদ্ধ করিতেন ৷ শাসনের ভার রাজারই ছিল, কিন্তু সেই ক্ষমতাও আইনের কঠিন নিগড়ে নিবদ্ধ; তাহা ভিন্ন রাজা প্রজার অনুমােদিত কাৰ্য্যই করিবেন, প্রজার অসন্তোষ যাহাতে হয়, তাহা কখন করিবেন না, এই রাজনীতিক নিয়ম সকলেই মানিয়া চলিত ৷ রাজা তাহার ব্যতিক্রম করিলে, প্রজারা আর রাজাকে মান্য করিতে বাধ্য ছিল না ৷

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একীকরণ এই যুগের ধর্ম ৷ কিন্তু এই একীকরণে পাশ্চাত্যকে প্রতিষ্ঠা বা মুখ্য অঙ্গ যদি করি, আমরা বিষম ভ্রমে পতিত হইব ৷ প্রাচ্যই প্রতিষ্ঠা, প্রাচ্যই মুখ্য অঙ্গ ৷ বহির্জগৎ অন্তর্জগতে প্রতিষ্ঠিত, অন্তর্জগৎ বহির্জগতে প্রতিষ্ঠিত নহে ৷ ভাব ও শ্রদ্ধা শক্তি ও কর্মের উৎস, ভাব ও শ্রদ্ধা রক্ষা করিতে হয়, কিন্তু শক্তিপ্রয়ােগে ও কর্মের বাহ্যিক আকারে ও উপকরণে আসক্ত হইতে নাই ৷ পাশ্চাত্যেরা প্রজাতন্ত্রের বাহ্যিক আকার ও উপকরণ লইয়া ব্যস্ত ৷ ভাবকে পরিস্ফুট করিবার জন্য বাহ্যিক আকার ও উপকরণ; ভাব আকারকে গঠন করে, শ্রদ্ধা উপকরণ সৃজন করে ৷ কিন্তু পাশ্চাত্যেরা আকারে ও উপকরণে এমন ৷ আসক্ত যে, সেই বহিঃপ্রকাশের মধ্যে ভাব ও শ্রদ্ধা মরিয়া যাইতেছে, তাহা লক্ষ্য করিতে পারেন না ৷ আজকাল প্রাচ্য দেশে প্রজাতন্ত্রের ভাব ও শ্রদ্ধা প্রবলবেগে পরিস্ফট হইয়া বাহ্য উপকরণ সুজন করিতেছে, বাহ্য আকার গঠন করিতেছে, কিন্তু পাশ্চাত্য দেশে সেই ভাব ম্লান হইতেছে, সেই শ্রদ্ধা ক্ষীণ হইতেছে ৷ প্রাচ্য প্রভাতােনুখ, আলােকের দিকে ধাবিত – পাশ্চাত্য তিমিরগামী রাত্রির দিকে ফিরিয়া যাইতেছে ৷

ইহার কারণ, সেই বাহ্য আকার ও উপকরণে আসক্তির ফলে প্রজাতন্ত্রের দুস্পরিণাম ৷ প্রজাতন্ত্রের সম্পূর্ণ অনুকূল শাসনতন্ত্র সৃজন করিয়া আমেরিকা এতদিন গর্ব করিতেছিল যে আমেরিকার তুল্য স্বাধীন দেশ জগতে আর নাই ৷ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রেসিডেন্ট ও কর্মচারীগণ কংগ্রেসের সাহায্যে স্বেচ্ছায় শাসন করেন, ধনীর অন্যায়, অবিচার ও সর্বগ্রাসী লােভকে আশ্রয় দেন, নিজেরাও ক্ষমতার অপব্যবহারে ধনী হন ৷ একমাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের সময়ে প্রজারা স্বাধীন, তখনও ধনীসকল প্রচুর অর্থব্যয়ে নিজ ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখেন, পরেও প্রজার প্রতিনিধিগণকে কিনিয়া স্বেচ্ছায় অর্থশােষণ করেন, আধিপত্য করেন ৷

ফ্রান্স প্রজাতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্মভূমি, কিন্তু যে কর্মচারীবর্গ ও পুলিস প্রজার ইচ্ছায় প্রত্যেক শাসনকার্য চালাইবার যন্ত্রস্বরূপ বলিয়া সৃষ্ট হইয়াছিল, তাহারা এখন বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র স্বেচ্ছাচারী রাজা হইয়া বসিয়াছে, প্রজারা তাহাদের ভয়ে কাতর ৷ ইংলণ্ডে এইরূপ বিভ্রাট ঘটে নাই বটে, কিন্তু প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য বিপদ পরিস্ফুট হইতেছে ৷ চঞ্চলমতি অর্ধশিক্ষিত প্রজার প্রত্যেক মতপরিবর্তনে শাসনকাৰ্য্য ও রাজনীতি আলােড়িত হয় বলিয়া বৃটিশজাতি পুরা রাজনীতিক কুশলতা হারাইয়া বাহিরে অন্তরে বিপদগ্রস্ত হইয়াছে ৷ শাসনকর্তাগণ কর্তব্যজ্ঞানরহিত, নিজ স্বার্থ ও প্রতিপত্তি রক্ষা করিবার জন্য নির্বাচকবর্গকে প্রলােভন দেখাইয়া, ভয় দেখাইয়া, ভুল বুঝাইয়া বৃটিশজাতির বুদ্ধি বিকৃত করিতেছেন, মতির অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যবর্ধন করিতেছেন ৷ এই সকল কারণবশতঃ একদিকে প্রজাতন্ত্রবাদ ভ্রান্ত বলিয়া একদল স্বাধীনতার বিরুদ্ধে খঙ্গহস্ত হইয়া উঠিতেছে, অপরদিকে আনার্কিষ্ট, সােশালিষ্ট, বিপ্লবকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি হইতেছে ৷ এই দুই পক্ষের সংঘর্ষ ইংলণ্ডে চলিতেছে – রাজনীতিক্ষেত্রে; আমেরিকায় – শ্রমজীবী ও লক্ষপতির বিরােধে; জৰ্ম্মণীতে – মত-সংগঠনে; ফ্রান্সে – সৈন্যে ও নৌ-সৈন্যে; রুশে – পুলিস ও হত্যাকারীর সংগ্রামে —সর্বত্র গণ্ডগােল, চঞ্চলতা, অশান্তি ৷

বহির্মুখী দৃষ্টির এই পরিণাম অবশ্যম্ভাবী ৷ কয়েকদিন রাজসিক তেজে তেজস্বী হইয়া অসুর মহান্ শ্রীসম্পন্ন, অজেয় হয়, তাহার পরে অন্তর্নিহিত দোষ বাহির হয়, সব ভাঙ্গিয়া চুরমার হয় ৷ ভাব ও শ্রদ্ধা, সজ্ঞান কৰ্ম্ম, অনাসক্ত কৰ্ম্ম যে দেশে শিক্ষার মূলমন্ত্র, সেই দেশেই অন্তর ও বাহির, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একীকরণে সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতির সকল সমস্যার সন্তোষজনক মীমাংসা কাৰ্যতঃ হইতে পারে ৷ কিন্তু পাশ্চাত্য জ্ঞান ও শিক্ষার বশবর্তী হইয়া সেই মীমাংসা ৷ করিতে পারিব না ৷ প্রাচ্যের উপর দণ্ডায়মান হইয়া পাশ্চাত্যকে আয়ত্ত করিতে হইবে ৷ অন্তরে প্রতিষ্ঠা, বাহিরে প্রকাশ ৷ ভাবের পাশ্চাত্য উপকরণ অবলম্বন করিলে বিপদগ্রস্ত হইব, নিজ স্বভাব ও প্রাচ্যবুদ্ধির উপযুক্ত উপকরণ সৃজন করিতে হইবে ৷

শ্রী অরবিন্দের সম্পূর্ণ রচনাবলী


Leave a Reply